প্রতিবাদের জনজোয়ারে জননেত্রীর ঘোষণা বাংলায় এনআরসি নয়

দেশভাগ করতে দেব না, ক্ষমতা থাকলে দু’জন মানুষের গায়ে হাত দিন : মমতা
মেঘাংশী দাস

ধর্মের নামে ভেদাভেদের রাজনীতি করতে চাওয়া নাগরিকপঞ্জি যে বাংলার মানুষ প্রত্যাখ্যান করছেন তার প্রমাণ মিলল জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে জনজোয়ারে ভেসে যাওয়া প্রতিবাদ মিছিলে। উত্তর শহরতলির সিঁথি থেকে শুরু হওয়া এই মিছিল প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে চলার পর শেষ হয় শ্যামবাজারে। মিছিলের মাথা যখন শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় অতিক্রম করছিল তখনও শেষ ভাগ পাইকপাড়ার মুখে। মিছিল থেকেই জননেত্রী তথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ডাক দিয়েছেন, “বাংলা তথা বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিজেপির সর্বনাশা নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে সবাই আন্দোলনে শামিল হন। যাঁরা বাংলায় এখন আছেন, তাঁরা সবাই বাংলার নাগরিক। একজন মানুষকেও অন্য কোথাও আমরা যেতে দেব না।”

বিজেপির এক নেতা দু’দিন আগেই বলেছেন, বাংলায় নাগরিকপঞ্জি চালু করে ২ কোটি মানুষকে রাজ্যের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। প্রতিবাদ মিছিল শেষে শ্যামবাজার মোড়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের সুরে জননেত্রী বলেছেন, “২ কোটি নয়, ক্ষমতা থাকলে দু’জন লোকের গায়ে হাত দিয়ে দেখো। একজন মানুষকেও বাংলা থেকে তাড়ানোর চক্রান্ত হলে আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই তার জবাব দেবে তৃণমূল।” এরপরই অসমে নাগরিকপঞ্জিতে যে ১৯ লক্ষ ৬ হাজার মানুষ বাদ পড়েছে সেখানে ১২ লক্ষের বেশি যেমন হিন্দু রয়েছেন, তেমনই এক লক্ষ গোর্খা রয়েছেন বলেও মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন। ওই বাদ পড়া তালিকায় হিন্দু ছাড়াও মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষও রয়েছেন বলে তথ্য তুলে ধরেন বাংলার অগ্নিকন্যা। তাঁর কথায়, “অসমের মানুষকে সেনা নামিয়ে কণ্ঠরোধ করে রাখা হয়েছে। তাঁরা প্রতিবাদ করতে ভয় পাচ্ছেন। কিন্তু বাংলাকে চমকে-ধমকে শায়েস্তা করা যাবে না। কোনওমতেই বাংলার মুখ বন্ধ করা যাবে না।” এরপরই মুখ্যমন্ত্রী আমজনতার উদ্দেশে ডাক দিয়ে বলেন, “তৈরি থাকুন, যখন ডাকব, সঙ্গে যা থাকবে সব নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসবেন। মনে রাখবেন, নিজেদের বাঁচানোর লড়াই নিজেদেরই লড়তে হবে। আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আত্মরক্ষার লড়াই করতে হবে আমাদের।” বক্তব্যের শুরুতেই মা-মাটি-মানুষের নেত্রী নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর জয়হিন্দ স্লোগানের উৎপত্তির ব্যাখ্যা দেন। নাম না করে বিজেপির শীর্ষনেতাদের তুলোধোনা করে বলেন, “নেতাজি জয়হিন্দ বলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশবাসীকে নিয়ে ব্রিটিশকে ভারতছাড়া করার ডাক দিয়েছিলেন। আজ নেতাজির সেই জয়হিন্দ স্লোগান উল্লেখ করে দেশের মানুষের মধ্যে ভাগাভাগি করার চেষ্টা করছে কয়েকজন মানুষ। এটা বাংলার মানুষ কোনওদিন হতে দেবে না। কারণ, আমরা জন্ম থেকে নেতাজির নামে উদ্দীপিত, রবীন্দ্রনাথের চেতনা আমাদের রক্তে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আমাদের মজ্জায়। যে বঙ্কিমচন্দ্র বন্দেমাতরম স্লোগান দিয়ে বৈচিত্রের মধো ঐক্যের সুর দিয়ে গোটা দেশকে একসুরে বেঁধে দিয়েছিলেন। তাই তো তাঁর কথাই এখন জাতীয় মন্ত্র হিসাবে উচ্চারিত হচ্ছে। অথচ সেই মন্ত্র উচ্চারণ করে দেশকে ভাগাভাগি করার চক্রান্ত করা হচ্ছে। এটা আমরা রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিমের মাটির মানুষ হিসাবে কিছুতেই মানব না। মনে রাখতে হবে, বাংলা কখনও মাথা নত করেনি, আগামী দিনেও করবে না। বাংলা নিজের আত্মিক শক্তিতে লড়াই করবে।”

নাগরিকপঞ্জির নামে হিন্দু-মুসলমান ভাগাভাগি করে নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক বিজেপি মজবুত করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন জননেত্রী। লোকসভা ভোটের সময় মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং ধর্মের নামে সুড়সুড়ি দিয়ে আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো সংগঠন বাংলার সরল সাদাসিধে মানুষকে বিভ্রান্ত করে গেরুয়া শিবিরে সমর্থন বাড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সেই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “যারা ধর্মের নামে উসকানি দিচ্ছে, তারা আগুন নিয়ে খেলছে। মানুষের মধ্যে এই ভাগাভাগির বীজ পুঁতে দিয়ে আগামী দিনে গোটা ভারতীয় সমাজকে ধ্বংস করার চেষ্টা করুছে। কিন্তু তৃণমূল কর্মীরা এখন দেশ ভাগ করার চক্রান্ত ধরে ফেলেছে। তাই কোনও মতেই আরও একবার ভারত ভাগের এই চক্রান্ত বাস্তবায়িত হতে দেবে না তৃণমূল কর্মীরা। আর একবার বঙ্গভঙ্গ হতে দেব না, বাংলা ভাগের চক্রান্ত বরদাস্ত করব না।” সিঁথি থেকে দলের এই পদযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন দুই সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌগত রায়, কলকাতার মেয়র তথা পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, ডাঃ শশী পাঁজা, তাপস রায়, বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, অতীন ঘোষ প্রমুখ। ছিলেন কলকাতা পুরসভার সমস্ত তৃণমূল কাউন্সিলর। এসেছিলেন কামারহাটি, দমদম, দক্ষিণ দমদম পুরসভার কাউন্সিলর এবং ওই এলাকার তৃণমূল নেতা-কর্মীরা।

মিছিলের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী নিজে থাকলেও রাস্তার দু’পাশে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ এলোমেলো ভাবে রাস্তায় নেমে এলে যানজট তৈরি না হয়। তবু রাস্তার দু’পাশে দুপুর থেকেই হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করছিলেন তাঁদের প্রিয় নেত্রীকে একবার কাছ থেকে দেখার। মিছিল যত এগিয়েছে, ততই শুধুমাত্র সংখ্যায় মানুষে ভিড় বাড়েনি, নানা বয়সের সমাজের নানা স্তরের মানুষ স্রোতের মতো মুখামন্ত্রীকে অনুসরণ করেছেন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আসতেই কয়েকজন মহিলা আচমকাই মুখ্যমন্ত্রীর পায়ের কাছে নিচু হয়ে প্রণাম করতে যান। জননেত্রী তাঁদের সরিয়ে দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মিছিল শেষে নাম না করে বিজেপির জাতীয় নেতাদের আক্রমণ করেন। বলেন, “আজ যদি বিহার থেকে বলা হয়, বিহারিরা থাকবে না অথবা উত্তর প্রদেশে গিয়ে বলা হয়, হিন্দিভাষীরা থাকবে না, তবে কেমন হবে? ঠিক তেমনই বাংলায় দাঁড়িয়ে বলা হচ্ছে, ২ কোটি বাঙালিকে বাংলার বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এটা বাংলাকে অপমান করা হচ্ছে। এটা শুধুমাত্র বাংলার অপমান নয়, গোটা দেশের অপমান। কারণ, গোটা দেশকে একসময় বাংলাই পথ দেখিয়েছিল। বাংলার সংস্কৃতি মানে গোটা দেশের সংস্কৃতি।” ধর্মীয় আচরণ ও নানা ধরনের পুজো নিয়েও গেরুরা শিবির যে ঘৃণ্য রাজনীতি করছে, তারও প্রতিবাদ করেন জননেত্রী। বলেন, আমাদের ধর্ম শিখিও না? তোমাদের থেকে আমাদের কাউকে ধর্ম শিখতে হবে না। আমাদের ধর্ম হল, মানবতার ধর্ম। ওম শব্দের অর্থ তোমাদের থেকে আমরা অনেক ভাল জানি!”

নাগরিকপঞ্জি ইস্যুতে প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হয়ে মুখ্যমন্ত্রী দেশজুড়ে ভয়ানক অর্থনৈতিক সংকটের উল্লেখ করেন। বলেন, বাংলা থেকে ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের সদর দফতর সরিয়ে নিয়ে যেতেই ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণ ঘোষণা করা হল। এত দিন পর্যন্ত এই ব্যাঙ্কগুলি বাংলা তথা বাঙালির নানা প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণে ঋণ দিত। শিল্প-বিনিয়োগকারীরাও সদর দফতর কলকাতায় হওয়ায় দ্রুত গিয়ে ব্যাঙ্কের শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে পারত। কিন্তু সেই ব্যাঙ্কগুলিকে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ব্যাঙ্কের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হল। এটা একটা বড়মাপের চক্রান্ত। সারা ভারত জুড়ে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে হাহাকার চলছে। অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিল এই গেরুয়া পার্টির সরকার। এয়ার ইন্ডিয়া, বিএসএনএল, সেল, রেল সবকিছুই বেচে দিতে চাইছে। দেশের জিডিপি পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের চেয়েও খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে। মানুষ না খেয়ে মরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial