পাঁচ রাজ্যের ভোটে মানুষের জয়

পূর্ণেন্দু বসু

সাধারণ মানুষকে যারা ‘নির্বোধ’ ভাবেন, পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন থেকে তারা কী শিখলেন কিছু? ঔদ্ধত্য, বিভেদপন্থা, অত্যাচার- এর বিরুদ্ধে মানুষ কেমন করে পতাকাকে উর্ধ্বে তুলে ধরেন তা আর একবার প্রমাণিত হল৷ ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যে শাসক দল বিজেপির পরাজয় একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ে দীর্ঘ ১৫ বছর পর ক্ষমতার পরিবর্তন হল৷ রাজনৈতিক দিক থেকে এই ঘটনার একটা আলাদা তাৎপর্য রয়েছে৷ এই তিন রাজ্যে লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে বিজেপির ৬৫টা আসন ছিল৷ বিধানসভা নির্বাচনের পর কয়েক মাস পর লোকসভা নির্বাচন৷ আজ যাঁরা বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিলেন আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে তারা বিজেপির পক্ষে চলে আসবেন, এমন মনে করার কোনও কারণ নেই৷ স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠবে, গোটা হিন্দিবলয়৷ উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর ও কৈরানার উপনির্বাচনের ফলাফল নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি৷ উত্তর ভারত বিজেপির পুরোপুরি অনুকূলে নেই৷ দক্ষিণ ভারতে বিজেপির বিস্তারের সুযোগ নেই বললেই চলে৷ কর্নাটক হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বেরেলির মতো বিজেপির গড়ে তাদের হারতে হয়েছে৷ তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা, কেরলেও দলের অবস্থা উদ্বেগজন৷ এই নির্বাচন নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তিতে জোরালো আঘাত হেনেছে৷ মোদি-অমিত জুটিকে ‘হারানো যায় না’-এই বিশ্বাস জোর ধাক্কা খেয়েছে৷ দেশের বেশিরভাগ রাজ্যে একক বা জোটসঙ্গীদের নিয়ে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। কিন্তু, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে বিজ্ঞেপির পরাজয় দেশের রাজনৈতিক আবহকেই রাতারাতি অনেকটা বদলে দিয়েছে৷ ২০১৪ সালে ক্ষমতা দখল করার পর থেকে তথাকথিত মোদি- ম্যাজিকে ভর করে বিজেপি প্রায় সমগ্র উত্তর ভারত, পশ্চিম ভারত দখলে আনে৷ দেশের বাকি অংশে ক্রমশই বিজেপি তার জয়যাত্রায় অগ্রসর হচ্ছিল৷ জম্মু-কাশ্মীরের মতো রাজ্যে জোট সরকার গড়ে বিজেপির বিশেষ বার্তা দিতে পেরেছিল৷ বামশাসিত ত্রিপুরা দখল করে বিজেপি তার জয়ের ধারা অব্যাহত রেখেছিল৷ দেশের সর্ববৃহৎ রাজ্য উত্তরপ্রদেশে ২০১৪-র লোকসভা ভোটে মোট ৮০টি আসনের ৭২টিই দখল করে গেরুয়া শিবির৷

নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে তাঁর ‘উন্নয়নমুখী ফাজের মানুষ’ হিসেবে যে জনসমর্থন পেয়েছিলেন, তার ফলেই বিজেপি ২৭২-এর গণ্ডি পেরিয়ে লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়৷ অনেকেই ‘মোদি- ম্যাজিকের’ কথা বলেছিলেন৷ পাঁচ রাজ্যে মোদি-ম্যাজিক কাজ করল না৷ ভোটের ফলাফল বলে দিচ্ছে, মোদি জমানার অপশাসন নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ও ক্ষোভ ভোটের বাস্কে প্রভাব ফেলেছে৷ মানুষের ক্ষোভ ছিল, ডিমনিটাইজেশন, তড়িঘড়ি জিএসটি চালু, তেল ও গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, জমা টাকার উপর সুদের হার কমে যাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামছাড়া দাম, আধার এবং আয়কর আদার নিয়ে বাড়াবাড়ি, কালো টাকা উদ্ধার ও চাকরির নামে ভাঁওতা-ইত্যাদি নিয়ে৷

২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে প্রতিটি জনসভায় নরেন্দ্র মোদি আলাদা গুরুত্ব দিয়ে বেকারদের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন৷ সেই কর্মহীন বেকাররা বুঝে গিয়েছেন যে, এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি মোদি৷ তাই বেকাররা মোদি সরকার সম্পর্কে কোনও ইতিবাচক ভাবনা ধরে রাখতে পারেননি৷ এর বড় প্রভাব পড়েছে এই ভোটে৷ অন্যদিকে, কৃষকেরর আত্মহত্যা-সহ কৃষিক্ষেত্রে নানা বিপর্যয় মোকাবিলায় ক্ষেত্রে সরকারের নীরব থাকার বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি কৃষক সমাজ৷ তার ফলেই হিন্দিবলয়ের তিনটি কৃষিপ্রধান রাজ্যে বিজেপির এই হাল৷ মোদি জমানার প্রথম তিন বছর কৃষক নিয়ে সরকায় নিশ্চুপ ছিল৷ একের পর এক কৃষক আন্দোলন উত্তর ও পশ্চিম ভারতে আছড়ে পড়েছে৷ কৃষকরা সরকারের নেতিবাচক ভূমিকায় একেবারেই খুশি থাকতে পারেনি৷ কৃষক থেকে শ্রমিক, বেকার যুবক-যুবর্তী থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ভাবনায় মোদির স্থান পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে৷ অর্থাৎ তার সম্পর্কে যে ধারণা ছিল, সেই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে৷ জন-মানসিকতার এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে হলেও তা ক্রমশই মোদির গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিতভাবেই নেতিবাচক দিকে নিয়ে যাচ্ছে৷ সংসদীয় গণতন্ত্রে জনমানসিকতা একটা নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়৷ সেই বিষয়ে এবারের নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী প্রচার, রামজন্মভূমি, গোরক্ষা-ইত্যাদি ইস্যুগুলি জনমানসিকতায় বিশেষ গুরুত্ব পায়নি৷ বরং নোটবন্দি, জিএসটি, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি সমস্যা ইত্যাদি ইস্যুগুলি মানুষের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ এসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতা মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল৷ সেই ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা গেল ভোটে৷ পাঁচ রাজ্যে ভোট হলেও নজর ছিল হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যের দিকেই৷ দেশের রাজনৈতিক শক্তিবিন্যাস নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই রাজ্যগুলিই মূখ্যভূমিকা নেয়৷ প্রাথমিকভাবে ভাল চোট পেয়েছে বিজেপ৷ ২০১৪ সালে দিল্লির গদিতে বসার পর থেকে সংঘ পরিবারের আশীর্বাদপুষ্ট মোদি-শাহ জুটি বেশ কয়েকটি নির্বাচনে হারলেও এই তিন রাজ্যে পরাজয়ের জাতীয় তাৎপর্য অনেক বেশি৷

তিন রাজ্যেই ক্ষমতায় ছিল বিজেপিত৷ দলের ভিত্তিও বেশ শক্ত ছিল৷ সেখানেও ধরল বড় ফাট৷ বিজেপির এই জনভিত্তি অবশ্য আচমকাই হারায়নি৷ একের পর এক লোকসভা এবং বিধানসভার উপনির্বাচনে বিজেপি হারছিলই৷ একবছর ধরেই মোদি সরকার এবং বিজেপির রাজ্য সরকারগুলির বিরুদ্ধে জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ টের পাওয়া যাচ্ছিল৷ তিন রাজ্যে পরাজয় ২০১৪-এর পর থেকে বিজেপির বৃহত্তম পরাজয়৷ এতে মোদিশাহ জুটি সব ভোট জিতিয়ে দিতে পারে এমন ভাবমূর্তি জোর ধাক্কা খেয়েছে৷ তিন রাজ্যেই সামনে এসেছে কৃষক সমস্যা৷ ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ার সমস্যা৷ কৃষিঋণ মকুব না করার সমস্যা ক্ষুব্ধ কৃষক তাই প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে ভোটকেই বেছে নিয়েছেন৷ তাই এই নির্বাচনের ফলাফলের বিচারে যতটা কংগ্রেসের জয় বলা যাবে, তার চেয়ে বেশি বলতে হবে বিজেপির পরাজয়ের কথা৷ নোটবন্দি, জিএসটি, বেকারত্ব, কৃষকদের বঞ্চনা, দলিত ও সংখ্যালঘু নিগ্রহ–এইসব মিলিয়েই বিজেপির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন মানুষ৷ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দুর্গতি ও ধারাবাহিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিজেপির বিরুদ্ধে সবথেকে বড় অস্ত্র নোটবন্দির জন্য শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন৷ কয়েক লক্ষ মানুষ বে- রোজগার হয়েছেন৷ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিপর্যয় নেমে এসেছে৷ বছরে ২ কোটি কর্মংসস্থানের কথা বলেছিলেন মোদি৷ ২ শতাংশও হয়নি৷ কৃষকদের দুর্গতি বাড়তে বাড়তে সহ্যের সীমা ছাড়িযজগা৷ বিদেশে গচ্ছিত ‘কালা ধন’ ফিরিয়ে এনে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা এনে দেওয়ার ক্ষমতা মোদির হয়নি৷ দলিত, সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক অত্যাচার বিজেপির বিরুদ্ধে গিয়েছে৷ তিন রাজ্যে বিজেপির যে বা যারা বিরোধী ছিল তারাই জিতেছে। পাঁচ রাজ্যে কোথাও জেতেনি বিজেপি৷ তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম আলাদা লড়ে একটি করে আসন পেয়েছে৷ মিজোরামে জয়ী হয়েছে আঞ্চলিক দল এমএনএফ৷ তেলেঙ্গানায় জিতেছে আঞ্চলিক দল টিআরএস৷ অথচ কংগ্রেস নেতাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, কংগ্রেস যেন একাই বিজেপিকে হারিয়ে দিচ্ছে৷ কিন্তু আসলে তা নয়, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দেশজুড়ে বিজেপি বিরোধী যে হাওয়া উঠেছে তা ওই রাজ্যে বিরোধী শক্তির পালে গিয়ে ধাক্কা দিয়েছে৷ প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, ২০১৯ সালে দিল্লি থেকে বিদায় নিচ্ছে বিজেপি। মনে রাখা দরকার, রাজস্থানে ম্যাজিক ফিগায় পায়নি কংগ্রেস। মধ্যপ্রদেশে তো সমর্থন নিতে হল মায়াবতীর। আগে বোঝাপড়া থাকলে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশে আরও ভাল ফল হত৷ দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে যে-যেখানে শক্তিশালী, তার ভিত্তিতে একের বিরুদ্ধে এক–মমতার এই ফরমুলাই এখন সবথেকে বেশি কার্যকরী।

পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে মোদি ফ্যাক্টর উধাও। কাজ করছে না তার ক্যারিশ্মা। মুখ থুবড়ে পড়েছে রামমন্দির ইস্যু। সামনে চলে এসেছে রুটি, কাপড়া, মকানের দাবি৷ উত্তরপ্রদেশে বিজেপির রামমন্দির নিয়ে উগ্রপ্রচার আশা জাগিয়েছিল যে, এতে হিন্দু ভোটাররা প্রভাবিত হবে৷ এখানেই বিজেপির বড় ভুল হয়ে গিয়েছ৷ যোগী আমিত্যনাথের ভয়ংকর হিন্দুত্ববাদী বক্তব্য কাজে দেয়নি৷ বরং তাতে ফল হয়েছে উল্টো৷ মোদির উন্নয়নের ভাবমূর্তি নিয়ে সেদিন প্রশ্ন উঠেছিল, যেদিন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে হিন্দুত্বের ‘পোস্টারবয়’ যোগী আদিত্যনাথকে বসানো হয়৷ যোগীর উগ্র হিন্দুত্বের ভাবনা ও কার্যকলাপ প্রশাসনকে গ্রাস করেছে৷ নিজের মর্জিমতো তিনি ইতিহাসের পরিবর্তন করছেন৷ নাম বদলাচ্ছেন৷ উন্নয়নে তাঁর মন নেই৷ গো-রক্ষকদের তাণ্ডব বেড়েছে৷ সংখ্যালঘু ও দলিতরা এই নিগ্রহের বিরুদ্ধে মোদির নীরবতাকে দায়ী করছেন৷ তার প্রতিফলন পড়েছে ভোটে৷ মানুষের হাতে টাকা নেই৷ কাজের বাজারে কাজ (চাকরি) নেই৷ ব্যবসা-বাণিজ্য-চাষবাস-শিল্প-কারখানা-কোনও কিছুই ভাল চলছে না৷ মানুষ হাঁসফাঁস করছেন৷ এই অবস্থায় ‘রামরাজ্যের’ কথা শুনবে কেন মানুষ৷ মোদির “বিকাশ” ম্যাজিক কাজে এল না৷ কাজে এল না যোগীর রাম-হনূমান ম্যাজজ৷ এককথায় বলা যায়–রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে সাড়ে চারবছরে হিন্দুত্ব হিন্দুত্ব করে ভোট এল না বিজেপির৷ এই নির্বাচনের শিক্ষা হল-হিন্দুত্ববাদের বিকৃত ব্যাখ্যা এবং কিছু ফাঁপা শ্লোগান দিয়ে মানুষের মন জিতে নেওয়া যাবে না৷ বিজেপি নেতারা এটা বোঝেননি৷ যে রাজস্থানে গো-হত্যার অভিযোগে একের পর এক মানুষ খুন হয়েছেন, সেই খুনি-হিন্দুত্বের জয়গান গাওয়া হয়েছে ভোটে৷ আলোচ্য বিধানসভা ভোট বিজেপিকে বিপদ সংকেত দেখিয়েছে৷ কংগ্রেসকে কিন্তু এখন পুরোপুরি সবুজ সংকেত দেয়নি ভোটাররা৷ আর তেলেঙ্গানা এটাও দেখিয়ে দিয়েছে যে, ২০১৯-এ শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে৷ এর থেকে বলা যায় যে, বিরোধী দলগুলির সম্মিলিত প্রয়াস তখনই সফল হতে পারে, যখন সকলে মিলে একটা বাস্তবসম্মত নির্বাচনী রণনীতি গ্রহণের পথে অগ্রসর হবে৷ ২০১৯-এর নির্বাচন একেবারে দোরগোড়ায়। মানুষ ইতিবাচক ভূমিকায়৷ ১৯ জানুয়ারি ব্রিগেডে বিরোধীরা আসছেন৷ এই জনমানসিকতাই নির্ণায়ক হয়ে উঠবে৷ বিরোধী দলগুলির কাছে এটাই বড় চ্যালেঞ্জ৷ মানুষ দেখিয়ে দিয়েছেন— মোদি-শাহ জুটিকে পরাজিত করা সম্ভব৷

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers