পরিবেশ বাঁচাতে চাই গণ-আন্দোলন

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় প্রতিবছর এক সুন্দর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বনমহোৎসব পালিত হয়। এই অনুষ্ঠান গত ২০ বছর ধরে পালিত হচ্ছে বিধানসভায়। অনুষ্ঠানটি প্রতীকী অনুষ্ঠান কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সমগ্র পৃথিবী যদি উপলব্ধি করত বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তাহলে আজ হয়তো মানুষকে ভয়ংকর সংকটের সামনে দাঁড়াতে হত না। পৃথিবী আজ প্রবল দূষণে আক্রান্ত। ধ্বংসের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। সাগর জলাশয় দূষিত হয়ে যাচ্ছে। বনাঞ্চল কেটে জনপদ তৈরি হচ্ছে। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পোন্নয়ন হচ্ছে এবং দূষণের মাত্রা বেড়ে চলেছে। সমগ্র বিশ্বজুড়ে খামখেয়ালিপনা বেড়ে চলেছে। সমগ্র ইউরোপের মানুষ কখনও এমন উষ্ণতা অনুভব করেনি যা এইবছর হয়েছে। জলের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের বৃহৎ হিমবাহগুলি গলে যাচ্ছে এবং সমুদ্রের জলের স্তর বাড়ছে। এইমুহূর্তে যদি সমগ্র বিশ্বের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এই সংকটের মোকাবিলা না করে তাহলে মানব সভ্যতাই ধ্বংস হয়ে যাবে। পরিবেশকে রক্ষা করাই এখন সব দেশের সব মানুষের প্রধান কর্তব্য। নচেৎ সমাজ, সভ্যতা সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছু আছে তার সঙ্গে যোগ আছে পরিবেশের। পরি কথার অর্থ হল চারপাশ এবং বেশ কথার অর্থ হল ভাল অর্থাৎ চারপাশের ভাল। বনমহোৎসব সেই চারপাশের ভালর জন্যই করা হয়। সমগ্র বিশ্বের সকল বস্তুকে যা বেষ্টন করে আছে সেটাই পরিবেশ। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পৃথিবী একমাত্র গ্রহ যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে। এখনও অন্য কোনও গ্রহে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে অন্য গ্রহ বা উপগ্রহের পরিবেশ মানুষকে ভাবায় না কিন্তু বিশ্ব পরিবেশ নির্ভর করে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর। এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য বলতে বোঝায় জীবনধারণের জন্য অনুকূল তাপমাত্রা, বায়ু, জল, বায়ুর উপাদান (মূলত অক্সিজেন), মাটি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল “ওজোন স্তর” যা পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে। এই ওজোনের স্তর সূর্যের আলোয় যে অতি বেগুনি রশ্মি আছে তাকে শোষণ করে মানুষ ও পশুদের রক্ষা করে। প্রবল দূষণে পৃথিবীর ও আবহাওয়ার উত্তাপ বেড়ে যাওয়ার জন্য ওজোনের স্তর ভেঙে যাচ্ছে যার ফলে অতি বেগুনি রশ্মি মানুষ ও পশুপক্ষীর শরীরে প্রবেশ করে ভয়ংকর ক্ষতি করছে।

বনমহোৎসবের প্রয়োজন কী সে বিষয়ে আলোচনা করব কিন্তু তার আগে পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই। পরিবেশকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়। (১) অ্যাবায়োটিক (২) বায়োটিক। অ্যাবায়োটিকের মধ্যে পড়ে আলো, বাতাস, জল-মাটি, পাহাড়-পর্বত, সাগর মহাসাগর, নদ-নদী, হ্রদ, জলাশয়, ঝরনা, বনভূমি, তৃণভূমি, মরুভূমি, মেরু অঞ্চল, তৃণলতা, গুল্ম, বৃক্ষ প্রভৃতি। বায়োটিকের মধ্যে পড়ে মানুষ, পশুপক্ষী ও জলজ প্রাণী। প্রাকৃতিক পরিবেশ ছাড়াও আছে কৃত্রিম পরিবেশ যা মানুষ সৃষ্টি করে। যার মধ্যে আছে পারিবারিক, সামাজিক,  সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক-সহ বিভিন্ন পরিবেশ। সমস্ত জীবজন্তুর বেঁচে থাকার জন্য চাই অনুকূল পরিবেশ। যদি পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় অথবা যদি প্রবল শীত পড়ে ও দীর্ঘদিন ধরে চলে অথবা বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনোঅক্সাইড, নাইট্রাস-অক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, লেদ-অক্সাইডের মতো জীবনের পক্ষে হানিকর উপাদান বাতাসে বাড়তে থাকে তাহলে সব জীবজন্তু ও মানুষ তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। জীবজন্তুরা অ্যাবায়োটিক ও বায়োটিক পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে কিন্তু মানুষকে বাঁচাতে হলে কৃত্রিম পরিবেশের প্রয়োজন। যেমন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, উৎপাদন, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রভৃতি। কিন্তু সব ধরনের পরিবেশের সঙ্গে সমস্ত জীবনের প্রতিমুহূর্তে একটা পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া সংগঠিত হয়। এই নিয়মেই বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে আবার অনেক প্রাণী উন্নত হয়েছে। মানুষ অনন্তকাল ধরে প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব করে আসছে এবং তার ফলস্বরূপ যে প্রতিক্রিয়া হয়ে চলেছে তার পরিণামে ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে। তৃণভোজী বা গাছপাতা খেয়ে যারা জীবন ধারণ করে তারা বহু বছর ধরে গাছপাতা খেয়ে অরণ্য ধ্বংস করেনি কিন্তু মানুষ ক্রমাগত অরণ্য ধ্বংস করে চলেছে। যেখানে প্রতিটি দেশের মোট ভূখণ্ডের ৩৩ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন সেখানে আমাদের দেশে তার পরিমাণ মাত্র ২০ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে বনসৃজনের মাধ্যমে বনাঞ্চল বৃদ্ধি পেয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বনাঞ্চল কমে যাওয়ার জন্য ভূমিক্ষয়, নদীতে পলি জমা, নদীর পাড় ভাঙা, সমুদ্র তীরবর্তী জঙ্গল জলে তলিয়ে যাওয়া, নতুন দ্বীপের সৃষ্টি আবার অনেক দ্বীপের জলে তলিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে পুকুর বোজানো, জলাশয় বুজিয়ে  দেওয়া, নদী, নালা, খাল সংস্কার না করার জন্য খাদ্যশস্য চাষ ও মৎস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কলকারখানার কঠিন, তরল ও বায়বীয় বর্জ্য পরিবেশকে দ্রুত দূষিত করছে। মানুষকে বেঁচে থাকতে গেলে উৎপাদন করতে হবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। রাসায়নিক সার ব্যবহার করে কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে হবে ফলে দূষণ বাড়বে, মানুষ আজ এক উভয় সংকটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

গভীর পরিতাপের বিষয় হল, ১৯৭২ সালে প্রথম স্টকহোমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলন করেছিল যেখানে বিশ্বের ১১৩টি দেশ যোগদান করেছিল। এরপর পাঁচবার শীর্ষ সম্মেলন ও ১৮ বার বিশ্বের দূষণ হ্রাস ও উষ্ণায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। এই সন্মেলনগুলিতে অনেক বিষয় উঠে আসে যার অন্যতম হল– ১) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ২) দারিদ্র দূরীকরণ ৩) ভোগবাদ নিয়ন্ত্রণ ৪) আর্থিক অসাম্য হ্রাস ৫) উন্নততর প্রযুক্তির সাহায্যে বর্জ্য হ্রাস। প্রসঙ্গত, উল্লেখযোগ্য যে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে কিন্তু পুঁজিবাদী দেশগুলি যাদের জনসংখ্যা বিশ্বের জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ তারাই মূলত দূষণের জন্য দায়ী। দূষণ সম্পর্কিত ভাবনা প্রকৃতপক্ষে শুরু হয়েছে সাম্প্রতিককালে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে । ১৭৫০ সালের শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই বায়ুদূষণ, মৃত্তিকা দূষণ, জলদূষণ, শব্দদূষণ শুরু হয়। প্রকৃতির ভয়ংকর রূপও দূষণের কারণ হয় যখন ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস, ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টি, টর্নেডো, হ্যারিকেন বা সুনামি হয়। এর জন্য অবশ্য মানুষ দায়ী নয়। মূলত পৃথিবীর দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধি মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে গ্রিন হাউস গ্যাস যা অতিমাত্রায় কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাসের স্তর। এই গ্রিনহাউস গ্যাসই পৃথিবীর উত্তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে বাতাসে মেশার আগেই মাটির নিচে পাঠাতে হবে যা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে।

সাম্প্রতিককালে বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অনেকগুলি দ্বীপ ডুবে গিয়েছে। যে গাছগুলি সমুদ্র উপকূল রক্ষা করে সেগুলিও জলের তলায় চলে যাচ্ছে। এই বিষয়ে সাধারণ মানুষের কোনও অনুভূতি নেই। দক্ষিণবঙ্গে বর্ষার বৃষ্টি এতটাই কম যে চাষও করা যাচ্ছে না। বেশ কয়েকটি শহরে পানীয় জল সংকটের আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। মাটির নিচে যে জল তা তুলে নিয়ে চাষ ও অন্যান্য কাজে ব্যাবহারের ফলে জলের স্তর ক্রমশ নামছে ও জলশুন্য হচ্ছে। জলে আর্সেনিক বাড়ছে যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে এবং মানব শরীরে নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।

ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধিও দূষণের কারণ। পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেভাবে বাড়ছে তাতে ২০৭০ সালে এই জনসংখ্যা পৌঁছবে ১৪০০ কোটিতে। পৃথিবীর জনসংখ্যা ১২০০ কোটিতে পৌঁছলেই তা সংকটজনক বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই সংখ্যা অতিক্রম করলেই বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। খাদ্য সংকট, পানীয় জলের সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, মোবাইল ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ২০৫০ সালেই মানুষ হবে শহরমুখী, ফলে বিশ্বের প্রতিটি শহরেই খাদ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান, পানীয় জল-সহ অতি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। জীবনের মান দ্রুত নিম্নমুখী হবে, রোগের মাত্রা বাড়বে। পরিবেশ সংক্রান্ত সর্বশেষ সম্মেলন হয় প্যারিসে যেখানে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হয় বিশ্বজুড়ে বৃক্ষরোপণ করে দৃষণের মাত্রা কমানোর চেষ্টা হবে এবং ধনী দেশগুলি একটি তহবিল গঠন করে এই কাজে সহযোগিতা করবে। প্যারিসে ১৯০টি দেশের প্রতিনিধিরা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের বিরুদ্ধে সবক’টি দেশ সর্বতোভাবে চেষ্টা করবে।

ফিরে আসি বনমহোৎসব ও মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ‘সবুজ বাঁচাও – জীবন বাঁচাও’ কর্মসূচিতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কয়েকটি গাছ পুঁতে দায়িত্ব শেষ না করে দীর্ঘ ৬ কিলোমিটার পথ পরিক্রমা করে গাছ বিতরণ করেন। দীর্ঘ পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিই মূল উদ্দেশ্য ছিল। বনমহোৎসবের মধ্য দিয়ে একই বার্তা দেওয়া হয় বিধানসভার কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। আমরা মাতৃসমা পৃথিবীর কাছে সব কিছু নিয়েই বাঁচি কিন্তু প্রকৃতিকে কিছুই দিই না। যদিও মাতৃঋণ শোধ হয় না তবুও মাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রত্যেক নাগরিক যদি একটা গাছ রোপণ করেন তাহলে বাতাসে অক্সিজেন বাড়বে। দূষণ কমবে। পৃথিবী মানুষের বাসযোগ্য থাকবে। কবি সুকান্তর কথায়—“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি তারপর হবো ইতিহাস।”

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers