পঞ্চমী সুর

রাজ চক্রবর্তী

প্রায় চার দশক জুড়ে মুন্বই তথা সারা ভারতের ফিল্মি গানের গতি-প্রকৃতির লাগাম ছিল বাঙালির হাতে। সেই প্রতিভাবান বাঙালির নাম রাহুল দেব বর্মন। ভারতীয় সংগীত জগতের এই উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসাবে প্রায় ৩৩১টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন। আর সেই সব ছবির বেশিরভাগই ব্যবসায় উতরে গিয়েছে তাঁর সুরের জোরেই। তাঁর নিজের গাওয়া গানের সংখ্যাও কম নয়। স্বর্ণযুগে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় কিশোর কুমার, আশা ভোসলে, লতা মঙ্গেশকর, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মহম্মদ রফি, মহম্মদ আজিজ ও আরও নানা শিল্পীর গাওয়া যেসব অপূর্ব গান আমাদের আজও গুনগুন করে গাইতে ইচ্ছে করে সেগুলির সিংহভাগেরই সুরস্রষ্টা রাহুলদেব বর্মন।

আজ বেঁচে থাকলে এই কৃতী শিল্পীর বয়স হত আশি। রাহুলদেবের জন্ম কলকাতায়, ১৯৩৯-এর ২৭ জুন। খ্যাতনামা সংগীতজ্ঞ শচীনদেবের একমাত্র পুত্র। শচীনদেব গানের জগতে প্রসিদ্ধ ‘শচীন-কর্তা’ নামে। মা মীরা দেববর্মনও একজন শিল্পী। রাহুলের দাদামশাই প্রথমে নাতির ডাকনাম রেখেছিলেন টুবলু। কিন্তু পঞ্চম সুরে চিৎকারে বাড়ি ফাটানো ছেলের ডাকনাম অচিরেই হয়ে দাঁড়াল পঞ্চম। নামটা নাকি দিয়েছিলেন দিকপাল অভিনেতা অশোককুমার। সেই পঞ্চম নামেই পরবর্তীতে তিনি সংগীতের রসজ্ঞ সমাজে পরিচিত হয়ে রইলেন।

সুর রচনায় পঞ্চমের হাতেখড়ি হল, তখন বয়স মাত্র ৯। নানা বাদ্যযন্ত্রের তালিম চলছে তখন একইসঙ্গে। উস্তাদ আলি আকবর খানের কাছে সরোদের তালিম, পণ্ডিত শামতা প্রসাদের কাছে তবলা। বাজাতে শিখলেন মাউথ অরগ্যান। আবার ওই বয়সেই বাবার কাজের একজন সহকারী হিসাবেও প্রতিষ্ঠা ঘটে গেল। অনেক সময় হারমোনিকা বাজাতেন বাবার অর্কেস্ট্রার দলে। গুরু বলে মানতেন সলিল চৌধুরিকে।

১৯৫৯ সাল। রাহুলের কুড়ি। হিন্দি ছবি ‘রাজ’-এর জন্য প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটল সংগীত পরিচালক রাহুলদেবের। যদিও এর আগের বছর থেকেই সহকারী সংগীত পরিচালক হিসাবে কাজ করেছেন। ১৯৬১ সালে রিলিজ করল রাহুলের সংগীত পরিচালনায় প্রথম ছবি ‘ছোটে নবাব’। বিখ্যাত কমেডিয়ান মেহমুদের প্রযোজিত এই ছবিতে পিতা শচীনদেবের ব্যস্ততার জন্য সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন রাহুল। ১৯৬৬ সালে ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছবির মুক্তির পর সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে সাড়া ফেলে দিলেন ‘আর ডি’। এখান থেকেই তার ‘দাদাগিরি’-র শুরু। এ-ছবিতে তাঁর সুরে, মজরু সুলতানপুরির কথায় মহম্মদ রফির কণ্ঠে ছয়টি গান হিট করে গেল। ‘তিসরি মঞ্জিল’-এর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে পরিচালক নাসির হুসেন রাহুলদেব-মজরু সুলতানপুরি জুটির সঙ্গে তাঁর পরবর্তী ছ’টি ছবির জন্য চুক্তি করে নিলেন। ফলে পরপর এল ‘ইয়াদো কা বারাত’, ‘পড়োসন’, ‘পেয়ার কা মৌসম’। রাহুলদেবের ফাটাফাটি সব সুরে মেতে উঠল সমাজ। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পেল রাহুলের সুরে কিশোর কুমারের গাওয়া গান নিয়ে হিট ছবি ‘আরাধনা’।

১৯৮০ সালে রহুল বিয়ে করলেন আশা ভোঁসলেকে। যদিও রাহুলের প্রথম স্ত্রী ছিলেন রীতা প্যাটেল। তাদের বিয়ে হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। কিন্তু মাত্র ৫ বছরের মধ্যে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আশার সঙ্গে বিয়েটাও অবশ্য জীবনের শেষদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি রাহুলের।

আটের দশকটাই ‘আরডি’-র কর্মজীবনের সুবর্ণ যুগ। আশা, লতা, কিশোর ও রফি-এই চার কালজয়ী শিল্পীর সঙ্গে রাহুলের সুরের রসায়নটা খুব জমে গিয়েছিল। আর সিনেমার পর্দায় তাঁর গানগুলিকে জমিয়ে দিয়েছেন রাজেশ খান্নারা। এভাবেই চলল ছবি ‘কাটি পতঙ্গ’ (১৯৭০), ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ (১৯৭১), ‘অমরপ্রেম’, ‘ক্যারাভান’, ‘সীতা ঔর গীতা’, ‘ইয়াদো কি বারাত’ (১৯৭৩), ‘আপ কি কসম’ (১৯৭৪), ‘শোলে’ (১৯৭৫), ‘আঁধি’ (১৯৭৫), ‘মিলি’ (১৯৭৫), ‘কসমে ভাদে’ (১৯৭৮), ‘গোলমাল’ (১৯৭৯), ‘সনম তেরি কসম’ (১৯৮১), ‘রকি’, ‘সত্তে পে সত্তা’, ‘লাভ স্টোরি’, ‘পরিন্দা’ (১৯৮৯), ‘মেহবুবা’, ‘সাগর’ এবং আরও অনেক। ১৯৭২ সালে প্রথমবার ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারে সেরা সংগীত পরিচালক হিসাবে রাহুলদেব মনোনীত হয়েছিলেন ক্যারাভান’ ছবির জন্য।

রাজেশ খান্না-কিশোর কুমার-রাহুলদেব বর্মণ জুটি কাজ করেছেন মোট ৩২টি ছবিতে। রাহুলদেবের সুর দেওয়া মোট ৩৩১টি ছবির মধ্যে ২৯২টি হিন্দি, ৩টি বাংলা, ৩টি তেলুগু, একটি মারাঠি এবং তামিল ও ওড়িয়া ভাষার দুটি করে ছবি রয়েছে। নয়ের দশকে বাপি লাহিড়ী ও অন্য সুরকারদের আগমনে প্রতিযোগিতায় রাহুলদেবের সুর বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু তার আগে টানা প্রায় আড়াই দশকের সংগীত জগতে দাপট দেখিয়েছেন রাহুলদেব। ১৯৮৮ সালে হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরের বছর লন্ডনের প্রেস হাসপাতালে তার বাইপাস সার্জারি হয়। ১৯৯৪ সালের ৪ জানুয়ারি প্রয়াত হন এই কীর্তিমান বাঙালি শিল্পী।

বৈচিত্র আর চমৎকারিত্বই রাহুলদেবের সুরের রহস্য। সংগীত পরিচালক মিলিন্দ জানিয়েছেন, “পঞ্চমদার সাউন্ড ব্যালান্স করার একটা ইউনিক সেন্স ছিল। এরই জন্য তিনি সংগীত জগতে আজও একজন ট্রেন্ডসেটার হিসাবে পরিচিত।” তাই দেখা যায়, গানের মধ্যে গ্লাসের গায়ে চামচের আলতো টোকার শব্দ, পাখির কিচিরমিচির, ছাদর উপর বৃষ্টি পড়ার শব্দ, বাঁশের ঠোকাঠুকি কিংবা চিরুনি ঘষার শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন সার্থকভাবে। এই অনন্যতা নিয়েই বেঁচে থাকবেন তিনি। আমাদের সুখে-দুঃখে নানা অবসরে গুনগুনিয়ে উঠবেনই রাহুলদেব বর্মন।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers