নোটবন্দির তিন বছর : বেহাল ও বিপর্যস্ত দেশের অর্থনীতি এবং দিশাহীন রাজনীতি

পূর্ণেন্দু বসু

নোটবন্দির তিন বছর পূর্ণ হল। এতে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়নি। বরং আর্থিক বৃদ্ধির হার কমে গিয়েছে। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে গোটা দেশে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন। সেদিনই প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, “নোটবন্দি মোদি সরকারের ভয়ংকরতম সিদ্ধান্ত।” নোটবন্দির ফলে দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থা আমরা তিন বছর ধরে দেখছি। তিন বছর পর আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অর্থনীতির বিপর্যয় শুরু হয়েছিল। আর আজ দেখুন কী পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। ব্যাঙ্ক সংকটে, অর্থনীতি মন্দায়। সকলে ভুক্তভোগী। কৃষক থেকে মজদুর, ছাত্র থেকে যুব, ব্যবসায়ী থেকে গৃহবধূ-সকলে।” উল্লেখ্য যে, নোটবন্দির বিরুদ্ধে মমতা দেশজুড়ে প্রতিবাদে নেমেছিলেন। ছোট ব্যবসায়ী থেকে কৃষক, শ্রমিক প্রত্যেকের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন। এবং রাজ্যের মানুষের স্বার্থে কাজও করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা যে সঠিক তা প্রমাণিত হয়েছিল। বিরোধিতার মুখে পড়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন পরে বলেছিলেন, তাঁকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দিলেও তিনি থামবেন না। দেশ শুধু তাঁকে ৫০ দিন দিক। তারপরে তাঁর কোনও গলদ বা অসৎ উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া গেলে যে কোনও সাজা মাথা পেতে নেবেন দেশের যে কোনও চৌরাস্তার মোড়ে।

নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুতি ছিল, নোটবন্দির ফলে কালো টাকা, জাল নোট, সন্ত্রাস ও মাওবাদ শেষ হবে। সুপ্রিম কোর্টকে সরকার বলেছিল, ৩ লক্ষ কোটি টাকা ফিরে আসবে। নগদের বদলে অর্থনীতি ডিজিটাল হবে। সবক্ষেত্রে ব্যর্থ মোদি। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বলছে, ৯৯.৩ শতাংশ নোট ফিরে এসেছে। জাল টাকাও ধরা পড়েছে সামান্য। সন্ত্রাস ও মাওবাদী হানা বরং বেড়ে গিয়েছে। নগদ রাখার প্রবণতাও বাড়ছে।নোটবন্দি করে তাহলে কী হল, দেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ রোজগার হারাল। জিডিপি ২ শতাংশ কমে ৫ শতাংশ নেমেছে। বাজারে বাড়ি, গাড়ি থেকে ছোট বিস্কুটের প্যাকেটের চাহিদাও চলে গেছে তলানিতে। শেয়ার বাজারে ধস, ডলারের তুলনায় টাকার দাম রোজ কমছে। বেড়ে চলেছে পেট্রোল-ডিজেলের দাম। ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে উৎপাদন কমছে। বিভিন্ন সংস্থায় কাজ হারাচ্ছেন চুক্তিভিত্তিক এবং অসংগঠিত শ্রমিকরা। যাঁদের চাকরি আছে তাঁরাও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। রেল-সহ নানা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধ বা বিলগ্নীকরণের মাধ্যমে কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।

ভারতীয় অর্থনীতির হাল মোটেই ভাল নয়

নোট বাতিলের তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে অর্থনীতি নিয়ে মুডিজ-এর রিপোর্টে সরকারি দাবির অসারতা প্রকাশ করে দিয়েছে। দেশের অর্থনীতির হাল যে মোটেই ভাল নয়, তা স্পষ্ট করে দিয়ে ৮ নভেম্বর, ২০১৯-এ আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন সংস্থা মুডি’জ ভারতের অর্থনীতি সম্পর্কে “নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। এই সংস্থার মূল্যায়ন হল, ভারতের বৃদ্ধির হার অতীতের থেকেও কমে যাওয়ার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। অর্থনীতির ঝিমুনি বা ‘স্লো ডাউন’, আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

বেহাল-বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য মোদি সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছে। মুডি’জের ওই মূল্যায়নের পরেও মোদি সরকারের দাবি, সব তো ঠিকই রয়েছে। কিন্তু মুডিজ অর্থনীতি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা সামলাতে সরকার ও নীতির কার্যকারিতা কমে যাওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছে। এর ফলে ঋণের বোঝা আরও বাড়তে পারে। যা এখনই অনেক বেশি। ব্যবসায় লগ্নি বাড়াতে, আর্থিক বৃদ্ধির হারকে টেনে উপরে তুলতে এবং আয়করের উৎস বাড়াতে আর্থিক সংস্কারের সম্ভাবনাও যথেষ্ট কমে গিয়েছে। মুডি’জের সাবধানবাণী, বৃদ্ধির হার যদি না বাড়ে, তা হলে সরকার রাজকোষ ঘাটতি কমাতে বেশ চাপের মুখে পড়বে। চাপের মুখে পড়বে ঋণের বোঝা-বৃদ্ধি ঠেকাতে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে মোদি সরকার বিপুল রাজস্ব ক্ষতি মেনে নিয়েও কর্পোরেট কর কমিয়েছেন। মুডি’জের পূর্বাভাস, চলতি অর্থ বছরে রাজকোষ ঘাটতি ৩-৭ শতাংশ ছুঁতে পারে। বাজেটে রাজকোষ ঘাটতিকে ৩.৩ শতাংশে বেঁধে রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা দাবি তুলেছেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার আরও কমাক। কিন্ত অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সেক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির হার বেড়ে গিয়ে ‘স্ট্যাগফ্লেশ’-এর পরিস্থিতি তৈরি হবে। যার অর্থ, আর্থিক বৃদ্ধির হারের থেকেও মুদ্রাস্ফীতির হার বেশি হবে। শতাংশে বেঁধে রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা দাবি তুলেছেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার আরও কমাক। কিন্ত অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সেক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির হার বেড়ে গিয়ে ‘স্ট্যাগফ্লেশ’-এর পরিস্থিতি তৈরি হবে। যার অর্থ, আর্থিক বৃদ্ধির হারের থেকেও মুদ্রাস্ফীতির হার বেশি হবে। এমনিতেই ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের জোগানে টান পড়েছে। অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী এমনিতেই ঋণবৃদ্ধির হার দু-বছরে সর্বনিম্ন। মুডি’জের আশঙ্কা, ঋণের জোগান আরও কমতে পারে। ফলে লগ্নিও কমবে। মুডি’জের এই মূল্যায়নের পরে অর্থমন্ত্রক বিবৃতি দিয়ে দাবি করে, অর্থনীতির ভিত মজবুত রয়েছে। অর্থমন্ত্রকের দাবি, ভারত এখনও আর্থিক বৃদ্ধির নিরিখে প্রথম সারির দেশগুলির অন্যতম।

বাস্তব হল, গত এক বছরের বৃদ্ধির হার ধাপে ধাপে কমেছে। চলতি অর্থবছরে এপ্রিল-জুনে বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ নেমে এসেছে। গত ছয় বছরে বৃদ্ধির হার এতখানি নামেনি। বাস্তব হল, গত অর্থবর্ষে বৃদ্ধি প্রতিটি ব্রিমাসিকেই ধাপে ধাপে ৮ শতাংশ থেকে ৫.৮ শতাংশে নেমেছে। বাজারে কেনাকাটা কমে যাওয়ার ফলে অর্থনীতির ঝিমুনির ধাক্কায় জুলাই-সেপ্টেম্বরে বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থমন্ত্রক সূত্রের দাবি, মুডি’জ অর্থনীতি সম্পর্কে শুধু দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘আউটলুক’ বদলেছে। ভারতের অর্থনীতিতে লগ্নি সম্পর্কে মূল্যায়ন কমায়নি। কিন্তু বাস্তবে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া সেদিকে প্রথম পদক্ষেপ। এর ফলে ইতিমধ্যেই ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি লগ্নি বেরিয়ে যেতে পারে। অর্থমন্ত্রক বিবৃতি জারি করে যুক্তি দিয়েছে, বিশ্বজুড়েই অর্থনীতিতে ঝিমুনি এসেছে। এর জবাবে, কেন্দ্রীয় সরকার সক্রিয়তার সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে লগ্নি আসবে। আইএমএফ-সহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিও ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করেছে।

আসলে সমীক্ষাটি কেন্দ্রীয় নীতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার প্রশ্নগুলিকে গভীরভাবে বিচার করছে না। কেবল মুডি’জ নয়, বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন উন্নয়নী অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতরা পর্যন্ত করেছেন। অমর্ত্য সেন, রঘুরাম রাজন, কৌশিক বসু, উর্জিত প্যাটেল, অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়-প্রমুখ অর্থনীতির বিদ্বানদের সতর্কবার্তা শোনেনি কেন্দ্রীয় সরকার। এক ধরনের কট্টর মৌলবাদী ধারণার বশবর্তী হয়ে সরকার পক্ষ অবিচল ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছে -‘সব ঠিক আছে’। অথচ কিছুই প্রায় ঠিক নেই।

৪৫ বছরে সর্বোচ্চ বেকারত্বের দেশ বর্তমান ভারত। মোদির ভারত। ‘বিশ্ব ক্ষুধাসূচক’ ও ‘বিশ্ব স্বাচ্ছন্দ্য সূচক’-এর দিক থেকে ভারতের বর্তমান অবস্থা হাতে ভোগ্যপণ্য কেনার মতো পয়সা না থাকলে চাহিদা বাড়বে না। তাই মন নীতি নিতে হবে যাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু, কেন্দ্রীয় সরকার চলছে তার বিপরীত রাস্তায়। চাহিদা কমায় বেকার বাড়ছে।

সরকার সংকট কাটাতে শিল্পপতিদের একের পর এক ছাড় দিচ্ছে। আয়কর কমানো হচ্ছে। উৎপাদন শুল্ক কমানো হচ্ছে। কেউ আয়কর ফাঁকি দিলে তার প্রতি নরম মনোভাব দেখানোর কথা বলা হচ্ছে। বিপুল কর মকুবের ফলে সরকারের বিপুল রাজস্ব ঘাটতি হবে। ফলে ব্যয় সংকোচন করতেই হবে। ফলে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজের বরাদ্দ অর্থ কমাতে হবে। এতে সংকট আরও বাড়বে।

নতুন বিনিয়োগ না হলে, নতুন নতুন কর্মসংস্থান হবে না। ফলে অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির পথ খুলবে না। মনে রাখা দরকার, শুধু উগ্র জাতীয়তা- উগ্র দেশপ্রেম ও ধর্মীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের মোদি জমানায় মানুষের পেট ভরবে না। ভোটের রাজনীতিতে মানুষের মত বদলানো যায়, কিন্তু তা স্থায়ী হয় না। রাজনীতিতে ভোটদাতাদের আস্থা কমছে। আদর্শহীন সংকীর্ণতা বাড়ছে সে কারণেই।

জাতি-বর্ণ-ধর্ম-ভাষার ভিত্তিতে বা অন্যের প্রতি বিদ্বেষের ভিত্তিতে ভোট হলে সংসদীয় রাজনীতির অধঃপতন ঠেকাবে কে? আর এস এস বিজেপির ভোট রাজনীতির এটাই সম্বল। তাই মানুষের অবস্থা বিচার্য নয়, আজকের রাজনীতি মানুষকে ভূল বুঝিয়ে ক্ষমতা দখলের পথকে প্রশস্ত করছে। ২০১৯ সেকথাই বলে।
এর বিপরীতে এগোতে গেলে মানুষকে তথা ভোটদাতাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। এর জন্য দেশের সংবিধানকে ভিত্তি করে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর কেন্দ্রীভূত হবে। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial