নিষ্ফলা প্রতিশ্রুতি নয়, দেশের মানুষ চায় বাংলার মতো উন্নয়ন

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

সাধারণতন্ত্র ও গণতন্ত্র শব্দ দু’টির মধ্যে উচ্চারণের পার্থক্য থাকলেও অভ্যন্তরীণ অর্থ হল জনগণের দ্বারা, অনগণের জন্য এবং জনগণের সমর্থনে যে সরকার বা প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে তার দায় ও দায়িত্ব থাকবে জনগণের সার্বিক কল্যাণ সাধন এবং তাদের বাকস্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতা, অভিব্যক্তির স্বাধীনতা, সংগঠন বা দল তৈরির স্বাধীনতা রক্ষা করা স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, স্বাধীনভাবে ভারতীয় সীমানার মধ্যে যাওয়া ও বসবাস করা এবং নিজ ইচ্ছায় ব্যবসা, বাণিজ্য বা চাকরি করার অধিকার থাকবে।

সাধারণতন্ত্র দিবস সম্পর্কে কয়েকটি ঘটনা বলা প্রয়োজন৷ সম্প্রতি আমরা দেশের ৭০তম সাধারণতন্ত্র দিবস পালন করলাম। সাধারণতন্ত্র দিবস সেই দিনই পালিত হয় যেদিন দেশের সংবিধান কার্যকর হয়েছিল অর্থাৎ ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সাল৷ সাধারণতন্ত্র দিবস একটি দেশের নাগরিকদের কাছে স্বাধীনতা দিবসের সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২৬ জানুয়ারি দিনটি সাধারণতন্ত্র দিবস হিসাবে গ্রহণ করার পিছনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে যা হল ১৯৩০ সালে লাহোর কংগ্রেসের অধিবেশনে ব্রিটিশ রাজের কাছে পূর্ণ স্বরাজের দাবি গৃহীত হয়েছিল৷ ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে সকাল ১০টা ১৮ মিনিটের পর কার্যকর হয়েছিল৷ ভারতীয় সংবিধান বিশ্বের সর্ববৃহৎ লিখিত সংবিধান যার মধ্যে ৪৪৮টি ধারা ও উপধারা আছে, ১২টি শিডিউল আছে এবং ১০২ বার সংবিধান সংশোধিত হয়েছে ২০১৮ পর্যন্ত। ভারতের সংবিধানের মূল ধারাকে রেখে তার সংশোধন করা হয়েছে দেশের জনগণের স্বার্থে৷ ড. বি আর আস্বেদকরকে চেয়ারম্যান করে সংবিধান রচনা করার কমিটি গঠিত হয়েছিল (যাঁকে সংবিধানের পিতা বলা হয়)। বি আর ছাড়া পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, হরেন্দ্রনাথ মুখার্জি, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, রাজা গোপালাচারী, কৃষ্ণমাচারি, শরৎচন্দ্র বোস, কৃষ্ণ সিংহ, বিনোদানন্দ, শ্যামনন্দন মিশ্র, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, মধুরী সত্যনারায়ণ, রাজকুমারী অমৃত কাউর, হংস মেহেতা, এন জি রংগা, দীপনারায়ণ সিং, গোপীনাথ বরদোলুই, সৈয়দ মহম্মদ সাদুল্লা, কৈলাসনাথ কাঁটজু, স্বামী প্রমুখ৷ এই সংবিধান রচনা করতে সময় লেগেছিল ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন৷ সম্ভবত বিশ্বের বৃহত্তম এই সংবিধান রচনায় সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সময় লেগেছিল৷ অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হল সংবিধানের দু’টি কপি তৈরি হয়েছিল যা হাতে লেখা এবং একটি ইংরেজিতে অপরটি হিন্দিতে। যেগুলি আজও রক্ষিত আছে হিলিয়াম গ্যাস ভর্তি কাচের কক্ষে যা আজও পার্লামেন্টের লাইব্রেরিতে রাখা আছে। ৩০৮ জন সদস্য সই করেছিলেন যদিও কয়েকজন সদস্য সই থেকে বিরত থাকেন৷ যেহেতু ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি জাতীয় কংগ্রেস পূর্ণ স্বরাজ দাবি করেছিলেন সেইজন্য ১৯৫০ সালে ২৬ জানুয়ারিকে সাধারণতন্ত্র দিবস এবং স্বরাজ দিবস বলা হয়৷

সংক্ষেপে সাধারণতন্ত্র দিবস সম্পর্কে একটি চিত্র তুলে ধরা হল পাঠকদের কাছে নতুন করে, কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও প্রায় ভুলতে বসেছে যা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের পক্ষে কল্যাণকর নয়৷ দেশের মানুষ ধীরে ধীরে শিক্ষিত হচ্ছে কিন্ত তীব্র প্রতিযোগিতায় বেঁচে থাকার জন্য এবং ভালভাবে থাকার জন্য মানুষকে কিছু দিকে ঠেলে নিচ্ছে এবং তারা দেশ সম্পর্কে, দেশের জন্য যাঁরা শহিদ হয়েছেন তাদের সম্পর্কে, দেশের সংবিধান সম্পর্কে উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়৷ গণতন্ত্র বা সাধারণতন্ত্র সংখ্যাধিক্যের শাসনের কথা বলে, যাঁদের হাতে থাকবে দেশের আইন প্রয়োগ করা এবং জনগণের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করা। আইনের শাসন হল গণতন্ত্রের এক শক্তিশালী ভিত্তি৷ সংসদ, বিধানসভা, বিচারব্যবস্থা, স্বাধীন প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলির উপরোক্ত বিষয়গুলির প্রতি বিশ্বাস ও ভারসাম্য রক্ষিত হলে গণতন্ত্রের উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়্রর। ধর্ম, জাতি ও ভাষা যখন প্রাথমিক শর্তগুলিকে দুর্বল করে তখন গণতন্ত্র বিপথগামী হয় এবং মানুষের অধিকার খর্ব হয় এবং ক্ষুদ্র স্বার্থ বৃহত্তর স্বার্থকে অতিক্রম করে, দলের স্বার্থ প্রাধান্য পায়।

বিশ্বের সর্বত্র জাতীয়তাবাদী দেশে সাম্প্রতিককালে ধর্ম, জাতি ও আঞ্চলিকতাবাদ ক্রমশ মাথাচাড়া দিচ্ছে৷ যে কোনও দেশের পক্ষে ঐতিহাসিকভাবে যা সত্য তাকে অস্বীকার করলে সংকট সৃষ্টি হয় যার নিরসন সম্ভব একমাত্র যদি শাসক ও বিরোধী দল সকলেই গণতন্ত্র ও সংবিধানের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শন করে৷ গণতন্ত্র বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের আস্থা অর্জন করলেও বিশ্বের কোনও কোনও রাজ্যে নতুন করে উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রভাব দেখা যাচ্ছে যার ফলে ভিত্ত দূর্বল হচ্ছে৷ যাদের পক্ষে জনসমর্থন বেশি তারাই দেশ শাসন করবে এটাই বিধি কিন্তু দেখা যায় বিভিন্ন দলের মধ্যে সমর্থন ভাগাভাগির ফলে সংখ্যালঘু দলও ক্ষমতায় আসে সংযুক্তভাবে সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে৷ এক্ষেত্রে সরকার বিরোধীদের সংঘবদ্ধ শক্তির থেকে কম হয়েও সরকার পরিচালনা করে যা আজকের ভারতবর্ষের রাজনৈতিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য৷ বিজেপি পরিচালিত এনডিএ মোট ভোটের এক-তৃতীয়াংশ জনসমর্থন পেয়ে সরকারে আসীন৷ যিনি শাসন করবেন তিনি অভ্রান্ত যেহেতু সংখ্যাধিক্যের জোরে ক্ষমতায় রয়েছেন একথা বলা যাবে না৷ গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের কাছে তিনি প্রজানুরঞ্জন হিসাবে চিহ্নিত হন যিনি আব্রাহাম লিঙ্কনের ঐতিহাসিক বক্তব্য, ‘জনগণের গণতন্ত্র, জনগণের জন্য গণতন্ত্র এবং জনগণের দ্বারা পথ অবলম্বন করে দেশ পরিচালনা করেন৷ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ১৯৪১ সালে বলেছিলেন গণতন্ত্র বা চারটি ভিত্তি থাকবে৷ সেগুলি হল ১) কথা বলা বা ব্যাখ্যা ও অভিব্যক্তির স্বাধীনতা, ২) নিজ নিজ ধর্মাচরণের স্বাধীনতা, ৩) মানুষের প্রয়োজন বা বাসনার স্বাধীনতা, ৪) ভয় থেকে মুক্তি৷ উপরোক্ত শর্তগুলি যেহেতু গণতন্ত্রের ভিত্তি সেগুলি ভারতীয় সংবিধানেও স্বীকৃত কিন্তু সমস্ত অধিকারই লঙ্ঘিত হবে যদি না মানুষের মূল দাবিগুলি তারা অর্জন করে যেমন, ১) খাদ্যের অধিকার, ২) শিক্ষার অধিকার, ৩) চিকিৎসা, ৪) বাসস্থান, ৫) কর্মসংস্থান, ৬) বিশুদ্ধ পানীয় জল, ৭) রাস্তা ও পরিকাঠামো এবং ৮) কর্মসংস্থান৷ জনগণের মধ্যে যদি শিক্ষার প্রসার বাড়ে, সকলে দু’-বেলা পেট ভরে খেতে পায়, অথবা বিনামূল্যে চিকিৎসা পায়, রাস্তা ও উন্নয়ন এবং চাকরি অথবা উপার্জনক্ষম অর্থাৎ মানুষের উপার্জন করার ব্যবস্থা যদি না করা হয় তাহলে যুক্তি অসার হয়ে যাবে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে সেইজন্য জনগণ চায় সামগ্রিক উন্নয়ন মিথ্যা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়। গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করে যদি জনগণের জীবনের মান উন্নয়ন হয় এবং মাতৃভূমির  অগ্রগতির সঙ্গে তাদের জীবন সম্পৃক্ত হয়৷ রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য ১) রাষ্ট্রের নাগরিকরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুবিচার পাবে। ২) চিন্তা, প্রকাশভঙ্গি, আস্থা, বিশ্বাস ও ধর্মীয় ক্রিয়া স্বাধীনভাবে করার অধিকার কবে ভারতীয় নাগরিকদের। ৩) সকল নাগরিক মর্যাদা ও সুযোগ পাবে এবং তাদের সকলের জীবনের মান উন্নত করার দায়িত্ব গ্রহণ করবে রাষ্ট।

ভারতবর্ষের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে যে সকল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেগুলি পূরণ ব অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগ অংশ বাস্তবায়িত করার নৈতিক দায়িত্ব ছিল কিন্তু সেই দায়িত্ব পূরণ করতে তারা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দু’টি কথা বলছে ১) কোনও দুর্নীতিগ্রস্ত ছাড়া পাবে না, ২) বিরোধীরা ভয় পেয়ে অনৈতিক জোট করছে৷ যারা দুর্নীতি করেছে তারা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাল কীভাবে? সরকার সহযোগিতা ছাড়া এটা কীভাবে সম্ভব হল? দ্বিতীয়ত, নরেন্দ্র মোদী যে সরকার চালাচ্ছেন সেটিও একটি জোট সরকার যার নাম ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বা এনডিএ যা অনেকগুলি দলের সম্মিলিত শক্তি। অর্থাৎ মানুষকে আবার নতুন করে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করছেন নরেন্দ্র মোদী এবং তার দল৷ কালো টাকা উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে, জিএসটি করার জন্য হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ করার জন্য এক কোটির বেশি মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছে৷ সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘আমরা ভারতবর্ষের জনগণ সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি যে, ভারতবর্ষকে একটি স্বাধীন, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্টে পরিণত করব।’ অথচ বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ভয়ংকরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে৷ ধর্মকে কেন্দ্র করে হিংসা, অসহিষ্ণুতা বুদ্ধি পেয়েছে এবং ভারতবর্ষের যুগ-যুগান্তের বাণী উপেক্ষিত হয়েছে।

ভারতবর্ষ বহু জাতি, বহু ধর্ম ও ভাষার দেশ, যাকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব সরকারের যা প্রবলভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বর্তমান শাসক দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইন্ধনে। ধর্মান্ধতা বৃদ্ধি পেয়েছে সমগ্র দেশে। দেশের মানুষের কাছে ধর্ম রক্ষা নয় সরকারের প্রথম দায়িত্ব ছিল ক্ষুধার থেকে মুক্ত করা দেশকে। দুনীর্তিমুক্ত করে দেশকে আর্থিক সিক থেকে উন্নত করা কিন্তু কৃষক আজ রাজপথে, শ্রমিক আজ কর্মচ্যুত এবং সমাজ আজ ধর্মের নামে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে যা দেশের পক্ষে খুবই বিপজ্জনক। ঠিক এর বিপরীত ঘটনা ঘটছে পশ্চিমবঙ্গে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাত্র সাত বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূরদর্শিতায় দেশের গড় আর্থিক উন্নয়নের তুলনায় অনেক এগিয়ে গিয়েছে। আর্থিক স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে রাজ্যের আয় বৃদ্ধি করে, পরিকল্পিত ব্যয় বৃদ্ধি করে রাজ্যকে দ্রুত দেশের শ্রেষ্ঠ রাজ্যে পরিণত করার শুধু প্রয়াস নয়, সাফল্য লাভ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৪৭ টি প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজের সব স্তরের, জাতি ও ধর্মের মানুষকে পরিষেবা পৌঁছে দিতে পেরেছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে রাজ্যকে মডেল রাজ্যে পরিণত করেছেন যা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অনুকরণীয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের সংবিধানে লিখিত প্রতিটি শব্দকে প্রবল শ্রদ্ধায় বাস্তবায়িত করেছেন। প্রমাণ করেছেন, দেশের মানুষ সাধারণতন্ত্র চায়, চায় উন্নয়ন, নিষ্ফলা প্রতিশ্রুতি নয়।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers