নব আনন্দে জাগো

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

রাজ চক্রবর্তী

দেখতেই একখানা নবীন বছর এসে দাঁড়াল দোরগোড়ায়। এগোতে এগোতে যেমন দুরের লাইটপোস্টখানা কাছে চলে আসে তেমনই এসে দাঁড়াল বছরখানা। আমরা যখন ২০১৫ কিংবা ’১৬ কিংবা ’১৭ সালে ছিলাম তখন এই ২০২০ ছিল দূরের লাইটপোস্ট। আমাদের নিমাইদা সেদিন পয়লা তারিখের উদযাপনে বলে বসলেন, এটা টি-টোয়েন্টি বর্ষ। কথাটা ভুল নয়। আমাদের চালিয়ে খেলতে হবে এ-বছর। চালিয়ে খেলা বলতে সংগ্রামমুখর। নানা কারণে পরিস্থিতি খুব জটিল। দেখেশুনে ইনিংস গড়ার ম্যাচ নয়। বাজারে জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য। মানুষের গড়পড়তা রোজগার নিম্নমুখী। তদুপরি এনআরসি-র গুঁতো। ফলে মাথায় পাহাড়প্রমাণ চাপ আমজনতার। ফলে নতুন বছরের আনন্দ উপভোগের মতো অনুকূল নয় পরিবেশ। জনতার কাছে নতুন আর পুরনো বছর অনেকটা সমার্থক হয়ে গিয়েছে। যদিও এক হিসাবে সমার্থকই। কেননা, নতুন বছর, মাস– এসবই তো মানুষের তৈরি ক্যালেন্ডারের ভাষা। প্রকৃতির ভাষায় কাল তো অখণ্ড-মহাকাল। আমরা সকলে তারই অধীন, তারই অনুগত। তবে আমরা এগিয়ে যে চলেছি সেই ব্যাপারটা সিদ্ধ করে নববর্ষ। কারণ, না এগোলে তো ২০১৯ সাল থেকে ২০২০ সালে পদার্পণ ঘটত না। হক কথা বটে।

নতুন বছর এল। দেওয়ালে সবার নতুন ক্যালেন্ডার উঠল। ফেসবুকে, হোয়াটসআ্যাপে শুভেচ্ছা বিতরণ হল। ই-শুভেচ্ছা। মুখে মুখে বলা হল “হ্যাপি নিউ ইয়ার”। বাজারে অফার দিয়ে ক্রেতাদের উসকে দেওয়ার চেষ্টাও যথারীতি। তবু সকলের মুখের ভাষা পড়ে বলা যায়, কীসের যেন অপেক্ষায় মানুষ। অপেক্ষা একটু স্বস্তির। একটু শান্তির। দিনরাত এত উদ্বিগ্ন, উতলা হয়ে থাকতে হয়নি আর কখনও। রসিকতার দিন এটা নয়। তবু দুঃখের কথা বলব কী, নববর্ষ আসার ফাঁকে আমার-আপনার সকলের একবছর পরমায়ু ফিনিশ হয়ে গেল বেমালুম। চুপি চুপি বলে রাখি, রসিকতাটি মৎপ্রণীত নহে। ইহার স্বত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নামে উনিশ শতকীয় এক ভদ্রলোকের যিনি ‘বঙ্গদর্শনে’ একবার নববর্ষ উপলক্ষে পুরনো বছরের চুলচেরা হিসাবনিকাশ করতে গিয়ে লিখেছিলেন, “এই বৎসরে তিনশত পঁয়ষট্টি দিবস ছিল, একদিনও কম হয় নাই। প্রতি দিবসে ২৪টি করিয়া ঘণ্টা এবং প্রতি ঘণ্টায় ৬০টি করিয়া মিনিট ছিল। কোনওটির একটিও কম পাই নাই। রাজপুরুষগণ ইহাতে কোনও প্রকার হস্তক্ষেপণ করেন নাই। ইহাতে তাঁহাদিগের বিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায় বটে।”

নতুন বউয়ের মতো নতুন বছরের খাতির-যত্ন বেশি। খাতির-যত্ন বলতে মাতামাতি। জানুয়ারি মাসের কদর এইজন্য বেশি। আবার জানুয়ারিরও প্রথমার্ধ আরও দামি। কেননা এসময়টা সকলেরই পৌষমাস। বাংলা ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালে আমার কথাটা ফেলতে পারবেন না কেউই। বছরের অন্য সময়ে কিন্তু কারও পৌষমাস, কারও সর্বনাশ!

নতুন বছর উদযাপনটা ব্যক্তিবিশেষে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির হতেও বাধা নেই। নতুন বছরে স্বপ্ন দেখতে বাধা নেই। ব্যবসায়ীর স্বপ্ন লাভের, খেলোয়াড়ের স্বপ্ন পদক জয়ের। বিষয়ী লোকের স্বপ্ন ব্যাঙ্ক লোনের ইন্টারেস্ট কমা আর ডিপোজিটের ইন্টারেস্ট বাড়ায়। আর আমাদের মতো ছা-পোষা জনগণের স্বপ্ন বাজারদর কমা। তবে আমরা বাঙালিরা ভাগ্যবান আমাদের দু-দু’খানা নববর্ষ। তবে ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিনে একবার (১৮৮৬) কল্পতরু হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। এই দুনিয়ার ত্রিতাপদগ্ধ মানুষকে জ্বালা জুড়িয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের চৈতন্য হোক”। সেটা কাশীপুর বাগানবাড়ির ঘটনা। আরেকবার (১৮৮৩) দক্ষিণেশ্বরে ইংরেজি নববর্ষের দিনে তাঁর কথা রয়েছে ‘কথামৃতে’। সদানন্দময় পরমহংসদেব তাঁর ঘরটিতে মেঝেতে বসে কোনও ভক্তের আনা জিলিপি খেতে খেতে শিশুর মতো আনন্দে শ্যামপুকুরের ‘মোটা বামুন’ প্রাণকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়কে বলছেন আর হাসছেন, “দেখছো, আমি মায়ের নাম করি বলে এইসব জিনিস খেতে পাচ্ছি।”

পরক্ষণেই একটি ছোট ছেলেকে দেখে একেবারে ছেলেমানুষের মতো জিলিপির চ্যাঙারিটি হাত দিয়ে লুকোচ্ছেন। তাঁর কাছে কালাকাল সব একাকার হয়ে গিয়ে পড়ে আছে শুধু সার চৈতন্য। নতুন বছর মাস দিন-সবই তুচ্ছ বিষয়। সত্য শুধু সেই এক আনন্দ। দেখিয়ে গিয়েছেন তিনি সেই আনন্দের লীলা। তাই তো ঈশ্বরের কাছে তাঁর প্রার্থনা ছিল–“রসেবশে রাখিস মা”। আনন্দরূপমৃতম্‌ যদ্বিভাতি। সকলেই আনন্দে থাকুন ও রাখুন।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial