ধিক্কার জানানোর ভাষা নেই

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

কিছুদিন আগে বাংলার সন্তান কিন্তু বর্তমানে একটি রাজ্যের রাজ্যপাল বাংলার মানুষের আবেগকে হত্যা করার জন্য একটি টুইট করেন। এই ভদ্রলোক ডিগ্রির সাপেক্ষে একজন শিক্ষিত মানুষ কিন্তু সবসময়ই বিতর্কিত মন্তব্য করে সংবাদে আসার চেষ্টা করেন। প্রথম প্রশ্ন, একজন রাজ্যপাল দেশের আইনে সরাসরি রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করতে পারেন কি না সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সংবিধানের ১৫৩ ধারা থেকে ১৬৬ ধারা পর্যন্ত রাজ্যপালের নিয়োগ থেকে তার অধিকার ক্ষমতা ইত্যাদি বলা হয়েছে। রাজ্যপাল ভারতবর্ষের সংসদ (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) বিধানসভা অর্থাৎ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কোনও ক্ষেত্রেই থাকতে পারবেন না। ওটার অর্থই হল কোনও রাজ্যপাল রাজ্যের রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ অথবা মন্তব্য করতে পারবেন না এবং তিনি যে রাজ্যের রাজ্যপাল শুধু সেই রাজ্যের বিশেষ কতকগুলি দায়িত্ব পালন করবেন। অথচ আমরা প্রায়শই দেখি মেঘালয়ের রাজ্যপাল নানা ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য করছেন। যা তাঁর অধিকারের বাইরে।

বাংলার মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই আবেগপ্রবণ এবং বাংলার সাহিত্য, দর্শন, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, আধ্যাত্মিকতা, দেশপ্রেম সর্বজনবিদিত। মেঘালয়ের বঙ্গসন্তান রাজ্যপাল তৃণমূল কংগ্রেসের আবেগমথিত একটি স্লোগান “জয় বাংলা” নিয়ে একটি টুইট করেন। তিনি লিখলেন, “I am distressed at some members shouting ‘Joy Bangla’ in the Lok Sabha. It Is the slogan of a Sovereign Country Bangladesh. Those members might as well shouted ‘God save The Queen’ or ‘Pakistan Zindabad’. Is this the thin end of a wedge to promote Bengali sub-nationalism.“ উপরেই এই টুইটের মাধ্যমে একটি কুৎসিত ইঙ্গিত করেছেন যা কোনও রাজ্যপালকে মানায় না।

বাংলার গণ-জাগরণের যে ইতিহাস তার অন্তর্নিহিত আবেগই হল বাংলার প্রতি সাহিত্যিক, কবি, বিপ্লবী, দেশপ্রেমিক-সহ সকলের ভালবাসা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালবাসি’ একান্তই বাংলা মায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা যাকে জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আমরা ছোট বয়স থেকেই শুনে এসেছি ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী”। জননী জন্মের পর তার স্তনের দুধ খাইয়ে বড় করেন সন্তানকে আর জন্মভূমি তার শস্যে, পানীয়ে, ভূমিতে ও বাতাসে বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে । তাই জন্মভূমি সম্পর্কে কবি লিখেছেন, “তুমি অন্ন মুখে তুলে দিলে/তুমি শীতল জলে জুড়াইলে/তুমি যে সকল সহা সকল বহা মাতার মাতা”।

ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার তার ‘History of Modern Bengal’-এ লিখেছেন যে বাংলার মানুষের মনে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের পর থেকে গণজাগরণের প্রভাব লক্ষ করা যায় যার মূলে ছিল বিদেশী শাসকের অযোগ্যতা, অত্যাচার, শোষণ। উনিশ শতকের শুরু থেকেই বাংলায় জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক সচেতনতা শুরু হয়। সমগ্র ভারতে যখন জাতীয়তাবোধের সূচনা হয়নি তখন বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান একই রাজনৈতিক ব্যবস্থা, একই ভাষা, ধর্ম, সাহিত্য এবং সামাজিক জীবনই জাতীয়তাবোধের জন্ম দিয়েছিল বাংলার মাটিতে। স্বদেশপ্রেম অর্থাৎ জন্মভূমির প্রতি ভালবাসা গড়ে ওঠে কতকগুলি প্রাকশর্তের উপর। যখন দেশবাসীর স্বাধীন অধিকার খর্ব হয়, আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন হয় তখনই স্বদেশপ্রেম প্রবলভাবে জাগ্রত হয়। আমরা তার প্রতিফলন দেখতে পাই বাংলার সাহিত্যিক, কবি, সংগীতকার-সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক জগতের মানুষের মধ্যে। একটি ভূখণ্ডের জলবায়ুগত প্রাকৃতিক, নৈসর্গিক, রাজনৈতিক-সহ নানা কারণে সেই ভূখন্ডের ভাষা-সংস্কৃতি। শিল্প-দর্শন প্রভৃতি বিকাশের একটি নিজস্ব প্রকৃতি গড়ে ওঠে । বাংলার গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনায় যাদের রাষ্ট্রচিন্তা সমগ্র দেশবাসীকে প্রভাবিত করেছিল তাঁরা হলেন রাজা রামমোহন  রায়, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, কেশবচন্দ্র সেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী অরবিন্দ, চিত্তরঞ্জন দাশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষচন্দ্র বসু, মানবেন্দ্রনাথ রায় প্রমুখ। বাংলার নবজাগরণের পথিকৃত যাঁরা তাঁরা সকলেই বাংলার এই মাটিতে জন্মগ্রহণ করে জন্মভূমির প্রতি তাদের ভালোবাসা অকৃপণভাবে প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন প্রমুখ কবি ও সাহিত্যিকরা বাংলার মাকে জন্মদাত্রী মায়ের মতোই ভালবেসেছেন। ডি এল রায় লিখেছিলে “বঙ্গ আমার জননী আমার/ ধাত্রী আমার আমাদের দেশ এবং ধনধান্য পুষ্পেভরা/ আমাদের এই বসুন্ধরা/ তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা। কবিগুরু লিখেছিলেন,“বাংলার মাটি, বাংলার জল/ বাংলার বাযু, বাংলার ফল/পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান। রজনীকান্ত সেন বাংলার মায়ের সন্তানদের দুঃখ দারিদ্রে কাতর হয়ে লিখেছিলেন, মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়/ মাথায় তুলে নে রে ভাই/ দীন দুঃখিনী মা যে মোদের/ তার বেশি আর সাধ্য নেই’। এই মা তো বঙ্গ জননী।

অতুলপ্রসাদ সেন লিখলেন, “মোদের গরব মোদের আশা/ আমরি বাংলা ভাষা”। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন, “খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি, আমার দেশের মাটি। বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক জীবনকে রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক সীমারেখায় আলাদা করা গেলেও জীবনবোধ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, পোশাক, খাদ্যাভ্যাসকে আলাদা করা যায় না।

বাংলার মানুষ হয়েও, সম্ভবত ইতিহাস ও রাজনৈতিক সচেতন হয়েও শ্রী তথাগত রায় কীভাবে বললেন “জয় বাংলা” বলার পিছনে বৃহত্তর বাংলার হাতছানি আছে। “জয় বাংলা” শব্দ দু’টি প্রথম যার লেখায় ফুটে ওঠে তিনি বাংলার কবি, বাঙালির কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২২ সালে তাঁর “ভাঙার গান” কাব্যগ্রন্থে ‘পূর্ণ অভিনন্দন কবিতায় “জয় বাংলা? শব্দ দু’টি ব্যবহার করেন। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান পরে বাংলাদেশ সৃষ্টির অনেক আগেই বাঙালি “জয় বাংলা” শব্দ দু’টির সঙ্গে পরিচিত। নিজের জন্মভূমিকে নিয়ে যারা গৌরব বোধ করে না, যারা দলীয় রাজনীতিকে জন্মভূমির গৌরবের উর্ধ্বে স্থান দেয় তারা আর যাইহোক বাঙালি বলে পরিচয় দিতে পারে না। যে মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন অসংখ্য ক্ষণজন্মা মানুষ যাঁরা দেশকে পথ নির্দেশ করেছেন, যাঁরা দেশকে বিশ্বের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সাহিত্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিল্পে, সংগীতে, দেশপ্রেমে ও আত্মবলিদানে সেই দেশের একজন মানুষ হয়ে “জয় বাংলা” বলায় আপনার এত জ্বালা কেন তা বোধগম্য হয় না। পাকিস্তানে পাঞ্জাব নামে রাজ্য আছে আবার ভারতেও পাঞ্জাব নামে রাজ্য আছে। উভয় দেশের মানুষই তাঁদের নিজ নিজ রাজ্যের নামে জয়ধবনি করতে পারেন, এর মধ্যে দোষের কিছু দেখি না। আপনি বাংলাকে, বাঙালিকে নিয়ে যা লিখেছেন তাতে বাংলার মানুষ যত অসম্মানিত হয়েছে তার থেকে বেশি হয়েছেন আপনি। আপনি বলেছেন, বাংলার গর্ব ধুলিসাৎ হয়েছে কারণ বাংলা ছেলেরা ও মেয়েরা অন্য রাজ্যে অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করে। চুরি, দুর্নীতি, ঠকানো অপরাধ কিন্তু মনে রাখতে হবে সৎভাবে যেকোনও কাজই গর্বের। যে ধারণা আপনার নেই, যার জন্য আপনার প্রতি করুণা হয়। আপনি দিকভ্রান্ত রাজনীতিসর্বস্ব মানুষ এবং রাজনীতির সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ। তাই আপনাকে ধিক্কার জানানোর ভাষা জানা নেই।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial