দেশ-বিদেশে রমেশচন্দ্র

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

রাজ চক্রবর্তী

বাঙালিকে সচেতনভাবে “ইতিহাসে অসচেতন জাতি” বলেছিলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। হয়তো সেটা মর্মান্তিক সত্য। অথচ বাংলার গৌরবের সিংহভাগ তো ইতিহাসের গর্ভেই নিহিত। ফেলে আসা উনিশ শতক, নবজাগরণের কাল, একরাশ বাঙালি মনীষীর দাপট, স্বাধীনতার যুদ্ধ ইত্যাদিকে ভুলে গেলে বাংলার গৌরবের ভাঁড়ার তো অনেকটা ফিকে হয়ে যায়।

যে জ্যোতিষ্কমণ্ডলী বাংলার আকাশকে আজও উজ্জ্বল করে রেখেছে তারই এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের নাম রমেশচন্দ্র দত্ত। একাধারে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মী, ঐতিহাসিক ও ঔপন্যাসিক হিসাবে তাঁর কীর্তি আজও অম্লান। ১৮৪৮ সালে কুষ্টিয়ায় জন্ম। ডেপুটি কালেক্টর বাবার চেয়ে তাঁর জীবনে বেশি অবদান ছিল রায়বাহাদুর কাকার। উচ্চশিক্ষিত পরিবার, আভিজাত্যের সুবাতাস, এরই মধ্যে রমেশের বেড়ে ওঠা। কলকাতায় এলেন হেয়ার স্কুলে পড়তে। তারপর প্রেসিডেন্সি। সেটা ১৮৬৮। দু’বছর পর বিলেতযাত্রা। রমেশের লক্ষ্য ছিল, প্রথম ভারতীয় আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথের কৃতিত্বকে ছাপিয়ে যাওয়া। অবশেষে তৃতীয় স্থান দখল করে আইসিএস হলেন রমেশচন্দ্র। দেশে ফিরে বাংলা ও ওড়িশায় অনেকগুলি সরকারি উচ্চপদে প্রথম ভারতীয় হিসাবে নিযুক্ত হন।

১৮৯৭ সালে রমেশ সরকারি কর্ম থেকে অবসর নিলেন ওড়িশার বিভাগীয় কমিশনার হিসাবে। আবার চলে গেলেন ইংল্যান্ড। লন্ডনের লেকচারার পদে যোগ দিলেন ইতিহাসবিদ রমেশচন্ত্র। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্র রচনার কাজ এই সময়েই করেন। ভারত থেকে ডাক এল বরোদার দেওয়ান পদে যোগ দেওয়ার জন্য। দেশের ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে এলেন। মাত্র ৬১ বছর বয়সে এখানেই কর্মরত অবস্থায় প্রয়াত হলেন বাংলা তথা ভারতের অন্যতম সুসন্তান রমেশ দত্ত। তারিখটা ছিল ৩০ নভেম্বর, ১৯০৯। দিক মাত্র। বাংলার সাহিত্যে তার অবদান যথেষ্ট। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সমসাময়িক রমেশচন্দ্র তাঁরই মতো ইতিহাস আশ্রিত সাহিত্যসৃষ্টি করে গিয়েছেন নিপুণ দক্ষতায়। সেকালের গড়পড়তা উচ্চশিক্ষিত বাঙালির মতো তিনি বাংলা ভাষা ও তৃপ্তিলাভ করেছেন।

রমেশচন্দ্রের সাহিত্যচর্চার মধ্যে মূলত উপন্যাস, কিছু অনুবাদ এবং বিশ্লোষণমূলক রচনা উল্লেখযোগ্য। ইতিহাসনিষ্ঠ রমেশচন্দ্র এখানেও ইতিহাসকে অস্বীকার করতে পারেননি। তাঁর “বঙ্গবিজেতা” (১৮৭৪), “মাধবীকঙ্কণ’ (১৮৭৭), “মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত (১৮৭৮) এবং “রাজপুত জীবনসন্ধ্যা’ (১৮৭৯)-এই চারটি উপন্যাস মূলত যথাক্রমে আকবর, শাজাহান, আওরঙ্গজেব ও জাহাঙ্গিরের সমকালীন ঘটনা অবলম্বনে রচিত। মুঘল সাম্রাজ্যের শতবর্ষের ইতিহাস নিয়ে রচিত হওয়ায় এগুলি একত্রে ১৮৭৯ সালে ‘শতবর্ষ’ নামে একটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সুকুমার সেন রমেশচন্দ্রের ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির চেয়ে তার সামাজিক উপন্যাসগুলিকে উৎকৃষ্টতর বলে উল্লেখ করেছেন। এগুলি হল– “সংসার (১৮৮৬) ও “সমাজ’ (১৮৯৩)। রামায়ণ ও মহাভারতের অনুবাদ করেছিলেন রমেশচন্দ্র । ১৮৯৩ সাল। বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ। প্রথম সভাপতি হলেন রমেশচন্দ্র, সহ-সভাপতি রবীন্দ্রনাথ। রাজপুত রাজাদের শৌর্য, বীরত্ব, সাহস ও মর্যাদার দিকগুলি তাঁর উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে। “দি লিটারেচার অব বেঙ্গল” বইতে রমেশচন্দ্র জয়দেবের সংস্কৃত কাব্য থেকে শুরু করে ষোড়শ শতাব্দীর চৈতন্য-রেনেসাস, তার পর রঘুনাথ শিরোমণি এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের সমকালীন সাহিত্যসৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক বিজয়ের ধারাটিকে বিশ্লেষণ করেছেন।

রাজনীতিতে উগ্রতার সমর্থক ছিলেন না রমেশচন্দ্র। মোটামুটি নরমপন্থী জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবেই তিনি পরিচিত ছিলেন। ১৯৮৮ সালে জীবনের উপান্তে পৌঁছে তিনি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। মূলত বিদ্ব মহলের প্রতিষ্ঠাই তাঁকে রাজনৈতিক জগতে প্রতিষ্ঠা করেছিল। তবে রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্য বা শিক্ষাকে তিনি কখনওই গুলিয়ে ফেলেননি। আর নিষ্ঠা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা এই দুটি গুণই জীবনের একাধিক ক্ষেত্রে তাঁকে সিদ্ধি এনে দিয়েছিল। রমেশচন্দ্র একসময় বঙ্গীয় আইনসভার সদস্যও হন। রমেশচন্দ্রের মতো কৃতী বাঙালিরা আজও আমাদের প্রেরণা দিয়ে চলেছেন। বাংলার সুবর্ণযুগের এইসব জ্যোতিষ্ক শুধুই কালের পুতুল নয়, তাঁরা যুগ যুগ ধরে চলে আসা ভারতীয় মনীষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর ১১১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের প্রণাম। অতীতের এইসব ধ্বজাধারীরা বাংলার ভবিষ্যৎকে আলোকিত করুন।

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial