দেশে লগ্নির দেখা নেই, বিল্পগ্নীকরণে মেতেছে কেন্দ্রের সরকার 

পূর্ণেন্দু বসু

মোদি সরকার অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন এবারের বাজেট ভাষণে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, বিলগ্নীর মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সরকারি শেয়ারের পরিমাণ ৫১ শতাংশেরও নিচে নামিয়ে আনা হবে।

ইতিমধ্যে শেয়ার বিক্রির জন্য ৫০টিরও বেশি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার তালিকা তৈরি করা হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পুরোপুরি বিক্রি করে দেওয়া হবে। যেমন, রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান পরিষেবা সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া। গত বছর এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রির লক্ষ্যে দরপত্র চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতে কেউ সাড়া না দেওয়ায় তা বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। এই বছর তা বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। এই এয়ার ইন্ডিয়ার জমি বিক্রি কেন্দ্রের অগ্রাধিকারে রয়েছে।

মোদি সরকারের প্রথম জমানা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রিতে রেকর্ড করেছে। মালিকানা বিক্রির সঙ্গে সম্পন্তি-সহ পরিকাঠামো বিক্রির এই নয়া উদ্যোগ নিতে চলেছে কেন্দ্র। তাতে ভবিষ্যতে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ছিটেফোঁটা বলেই আর বিশেষ কিছু থাকবে না। সবই চলে যাবে বেসরকারি হাতে। চলে যাবে যথেষ্ট ধনী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের হাতে।

রাষ্ট্রায়ত্ত কোনও সংস্থা কখনই শেয়ার বিক্রি করে ধনী শিল্পপতিদের হাতে যাবে না– এমন কথা আমরা বলছি না। প্রশ্ন উঠছে, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা গুলির বিলগ্নিকরণ নিয়ে। কেন, কোন যুক্তিতে লাভজনক পিএসইউগুলির শেয়ার বেচে বিলগ্নিকরণের পথ নেওয়া হচ্ছে? আরও প্রশ্ন হল, অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করা হবেনা কেন? এই সংস্থাগুলিতে কর্মরত শ্রমিক কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টিকে এতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার কারণ কি? এক্ষেত্রে কেন ‘শিল্প বাচাও-শ্রমিক বাঁচাও’-নীতি গ্রহণ করা হবে না?

কোথাও এটা দেখা যাচ্ছে না যে, এক জায়গায় শেয়ার বিক্রি করে, অন্য জায়গায় লগ্নি করা হচ্ছে। কেন তা হবে না? একে দেশে লগ্মির অভাব। লগ্মির অভাব মানে শিল্প হবে না। শিল্প না হলে উৎপাদন হবে না, নতুন কর্মসংস্থান হবে না। মোট জাতীয় উৎপাদন কমতে থাকবে। বেকার সংখ্যা নিত্যনতুন রেকর্ড করবে।

বেঙ্গল কেমিক্যাল

বরেণ্য বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যাল একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। দীর্ঘদিনের রুগ্‌নতা কাটিয়ে এই সংস্থাটি কয়েক বছর ধরে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। কেবল ঘুরে দাড়ানোই নয়, দু’-তিন বছর ধরে সংস্থাটি বছরে দু’কোটিরও বোশি মুনাফা করছে। এহেন একটা লাভজনক রাষ্টায়ত্ত সংস্থাকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিষয়টি হাই কোর্ট বিচারাধীন থাকা সত্বেও বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার বেঙ্গল কেমিক্যালের বিলগ্নিকরণের জন্য উঠে পড়ে লাগল কেন? প্রশ্ন এখানেই।

শুধু বেঙ্গল কেমিক্যাল নয়, ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বহু রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কেন্দ্র সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১ লক্ষ ৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করবে। এতে দেশের কোনও মঙ্গল সাধিত হবে? কর্মনিরাপত্তা বিনষ্ট হবে। আর এতে লাভ হবে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির। বেঙ্গল কেমিক্যালে বেশ কিছু ঠিকা শ্রমিক ছিলেন। তাঁদের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তিন বছর আগে লাভজনকভাবে চলা বেঙ্গল কেমিক্যালের জমি বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। এর বিরুদ্ধে সংস্থার কর্মীরা সম্মিলিতভাবে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা করেন। কোর্টের রায় যায় শ্রমিক কর্মচারীদের পক্ষে। কেন্দ্র সরকার জমি বিক্রি করতে বদ্ধপরিকর। তাই সরকার পুনরায় ডিভিশন বেঞ্চে মামলার আবেদন করে। অন্যদিকে, লাভে চলা বেঙ্গল কেমিক্যালের উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে সংস্থাটিকে পুনরায় রুগ্‌ণতার দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্র সরকার।

কেন্দ্রীয় সরকারের এই বিলগ্নিকরণ পদক্ষেপ নিয়ে একটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে গেছে। প্রশ্নটি হল এর মাধ্যমে কি দেশের মিশ্র অথর্নীতির বুনিয়াদটিকেই ধ্বংস করা হচ্ছে না? দেশে বিদেশে ভারতের মিশ্র অথর্নীতি সমাদৃত। নির্বিচারে সেই অর্থনীতিকে বেসরকারিকরণের দিকে ঠেলে দিলে কার লাভ হবে? নীতি নির্ধারকরা এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে না। দেশের অর্থনীতি যখন ভয়ংকর সংকটে ভূগছে, তখন লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিই অর্থনীতির জীবনরেখা হতে পারে।

শুধু শেয়ার নয়, এবার জমিজমা সব কিছুই বিক্রি করা হবে

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মালিকানা বা শেয়ার বিক্রির পাশাপাশি তার জমি, বাড়ি, শিল্প পরিকাঠামো পর্যন্ত ঢালাও বিক্রির তালিকা তৈরি করেছে নীতি আয়োগ। বিক্রিবাটা এমনভাবে সারা হবে যে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার অবশেষ বলে আর কিছু থাকবে না। জমি, বাড়ি, শিল্প পরিকাঠামো নিয়ে এক একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার যা সম্পত্তি রয়েছে, তার হিসেব সেরে ফেলেছে নীতি আয়োগ। এসব প্রায় ৩ লক্ষ কোটি টাকায় বিক্রি করে ফেলা যাবে বলে নীতি আয়োগের প্রস্তাবে কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে। এই বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার ও মালিকানা বিক্রি করে ১ লক্ষ ৫ হাজার টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। এই বিক্রয়পর্ব সেরে ফেলার পর আলাদাভাবে সম্পন্তি বিক্রির কাজ শুরু করে ফেলা উচিত বলেই জানিয়েছে নীতি আয়োগ। যে-সব মন্ত্রকের অধীনে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই সম্পত্তির দরদাম কতটা হতে পারে, তার প্রাথমিক হিসেব ঠিক করে নিয়েছে নীতি আয়োগ।

শেয়ার ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির যেসব সম্পদ বিক্রি করার কথা ভাবা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে পাওয়ার গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন, বিএসএনএল এবং এমটিএনএলের টেলিফোন টাওয়ার, গেইলের গ্যাস পাইপ লাইন, কিছু শহরের বিমানবন্দর, কিছু সংস্থার বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জমি। সেই জমিও নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে। ন্যাশনাল টেক্সটাইল কর্পোরেশন, হিন্দৃস্থান আ্যান্টিবায়োটিকস, এনটিপিসি এবং এয়ার ইন্ডিয়ার জমি বিক্রির লক্ষ্যে দরদাম কত হতে পারে, তা ভাবা হয়েছে। নীতি আয়োগ সূত্রে জানা গিয়েছে যে, বিএসএনএল এবং এমটিএনএলের সমস্ত ট্রলিফোন টোয়ার বেসরকারি টেলিকম সংস্থাগুলির কাছে বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিএসএনএলের ১৩ হাজার ৫১টি টাওয়ার ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে নানা বেসরকারি সংস্থাকে। এইসব টাওয়ার এবার পুরো বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গেইলের পাইপলাইন বেসরকারি সংস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি লিজে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। বর্তমানে গেইলের ১১ হাজার ৫০০ কিমি গ্যাসের পাইপ লাইন রয়েছে। গেইলের গ্যাস পাইপলাইন বন্ধ করে তার পুরোটাই লিজে বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাওয়ার গ্রিডের ১ লক্ষ ৪৫ হাজার কিমি দীর্ঘ বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের সার্কিট রয়েছে। তাও বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হবে দীর্ঘমেয়াদি লিজে।

এদিকে, কেন্দ্রের ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট দফতর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে পরামর্শদাতা নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এনিয়েও বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছে। জমি বিক্রির দরদাম স্থির করার ক্ষেত্রে আগ্রহ প্রকাশ করে দফতরে আবেদন জানিয়েছে বস্টিং কনসাল্টিং গ্রুপ এবং কুশম্যান ওয়াক ফিল্ড কুলিয়ার্স ইন্টারন্যাশনাল। জমির দালালির কারবার রয়েছে এইসব সংস্থার। তাদের মাধ্যমে জমির দরদাম ঠিক করেই বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। নীতি আয়োগ সুত্রে খবর, বিলগ্নি ছাড়াও বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন, গ্যাস পাইপলাইনের মতো পরিকাঠামো বিক্রি করে পৃথকভাবে ৩ লক্ষ কোটি টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব। প্রথম দফায় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগগ্নির মাধ্যমে অর্থসংগ্রহের পর সম্পন্তি বিক্রির কাজ শুরু করে দেওয়া সম্ভব বলে কেন্দ্রকে জানিয়েছে নীতি আয়োগ।

গোটা দেশের অর্থনীতির পক্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির শেয়ার ও জমিবাড়ি বিক্রির এই উদ্যোগ কার্যত জনগণের সম্পত্তি বেচে দেওয়ার শামিল। এই উদ্যোগকে থামাতে গেলে দেশজুড়ে এক বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রমিক শাখা আইএনটিটিইউসি লড়াইয়ের পথ গ্রহণ করেছে। আগামী দিনগুলিতে বোঝা যাবে, শ্রমিক-কর্মচারীরা এই লড়াইকে কতদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial