দেশের অর্থনীতির অবকাশে অভূতপূর্ব বেকারত্বের পূর্বাভাস

ডঃ দেবনারায়ণ সরকার

জর্জ বার্নাড’শ বলেছিলেন, “নীরবতা বা মুখে কুলুপ আঁটা অবজ্ঞার সবথেকে পরিপূর্ণ বহিঃপরকাশ” (“SILENCE IS THE MOST PERFECT EXPRESSION OF SCORN”)। অর্থনীতির ঝিমিয়ে পড়া নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। মন্ত্রকের কর্তাদেরও নির্দেশ দিয়েছেন কোনও প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার জন্য। বিরোধীদের অভিযোগ, দেশের অর্থনীতির আকাশে মন্দার আশঙ্কা ঘনাতে দেখেও মুখে কুলুপ এঁটে কার্যত দেশবাসীকে অবজ্ঞা করছে মোদি সরকার। কিন্ত ঘুরপথে হলেও শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির বেহাল দশার কথা স্বীকার করে নিল মোদি সরকারের এক শীর্ষ কর্তা নীতি আয়োগের সিইও অমিতাভ কাণ্ড। যদিও তাঁর দাবি অর্থনীতির গতি নাকি কমেছে একগুচ্ছ সংস্কারের কারণে। তাঁর মতে, জিএসটি, দেউলিয়া বিধি, আবাসন নিয়ন্ত্রণ আইনের মতো একগুচ্ছ সংস্কারের কারণেই গতি কমেছে অর্থনীতির চাকায়। যা শুনে বিরোধীরা বলছেন, এই প্রথম সরকারের কেউ অন্তত একথা স্বীকার করলেন। কার্যত মেনে নিতে বাধ্য হলেন নোট বাতিল, ক্রটিপূর্ণ জিএসটি ইত্যাদির মত ভুল সংস্কারের ফলেই আসলে ভুগতে হচ্ছে দেশের অর্থনীতিকে।

অর্থনীতির অবস্থা যে আরও খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে তাও প্রকাশ পেল দেশের স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমির (সিএসআইই) শেষোক্ত (জুলাইয়ের) রিপোর্টে। সিএসআইই শেষোক্ত রিপোর্ট বলছে, জুলাইয়ে দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ৭.৫১ শতাংশ। এখানে অবশ্যই উল্লেখ্য যে কেন্দ্রীয় সরকারের ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষের এনএসএসও-র রিপোর্টে বলা হয়েছিল ভারতে বেকারত্বের হার ৬.১ শতাংশ। যা গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। লোকসভা নির্বাচনের আগে এই রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়া হলেও লোকসভা নির্বাচনের পরে মোদি সরকার এই রিপোর্টও স্বীকার করে নিয়েছে। সিএসআইই-র রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে দেশের বেকারত্বের হার ক্রমশ আরও বেড়ে চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্টে ২০১৭-১৮ সালে যেখানে ছিল ৬.১ শতাংশ (৪৫ বছরে সর্বোচ্চ), ২০১৯-এর জুলাই মাসে অর্থাৎ গত মাসে সিএসআইই-র রিপোর্টে এটি আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৫১ শতাংশ। অর্থাৎ গত ১ বছরে বেকারত্ব আরও অতিরিক্ত দেড় শতাংশ বেড়েছে। দেশে বেকারত্ব যে আরও বাড়বে তার আভাস পাওয়া গিয়েছে রেলে কর্মী ছাঁটাই, গাড়ি শিল্পে কর্মী ছাঁটাই, তথ্য প্রযুক্তিতে কর্মী ছাঁটাই, বিএসএনএল, এমটিএনএলের কর্মী ছাঁটাইয়ের চরম পূর্বাভাস থেকে। গত ২৮ জুলাইয়ের ঘোষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, রেলের কোনও কর্মী ৩০ বছর ধরে চাকরি করেছেন অথবা তাঁর ৫৫ বছর বয়স হয়ে গিয়েছে-এমন কর্মীদের চাকরিতে টিকে থাকার আর নিশ্চয়তা রইল না। রেলে প্রায় সাড়ে বারো লক্ষ কর্মী কাজ করেন। কেন্দ্রের সাম্প্রতিক নির্দেশ কার্যকর হলে ৩ লক্ষ কর্মী কাজ হারাবেন। কেন্দ্রের বক্তব্য, শুধু রেল নয়, সমস্ত কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাকেই একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাঁরা ৩০ বছর ধরে চাকরি করছেন অথবা চাকরিতে ৫৫ বছর বয়স হয়েছে এমন সমস্ত কর্মীদের (সে রেল হোক অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও ব্যাঙ্ক হোক) ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় সংস্থায় অন্তত ৩ লক্ষের দ্বিগুণ কর্মচারী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় সরকার।

সামগ্রিক অর্থনীতির ছবিটা যে অতীব সংকটাপন্ন তা আরও স্পষ্ট হয়েছে চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে বিভিন্ন সংস্থার একে একে ফল প্রকাশের মাধ্যমে। অর্থনীতির অস্বস্তি বাড়িয়ে স্পষ্ট হচ্ছে চাহিদার পতনের ছবিটাও। চাহিদা কমায় উৎপাদন ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে বিভিন্ন সংস্থা। তাতে কর্মসংস্থানের উপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে তা স্পষ্ট। দেশের বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা মারুতি সুজুকির গাড়ির বিক্রি এক বছরের আগের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। বিপুল কমেছে নীট মুনাফাও। অন্যান্য গাড়ি সংস্থার বিক্রির হালও তখৈবচ। গাড়ি বিক্রি এবং উৎপাদন কমায় চাপ বাড়ছে যন্ত্রাংশ শিল্পে। যন্ত্রাংশের আমদানিও রেকর্ড কমেছে। তাই সার্বিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে শিল্পের বক্তব্য অবিলম্বে চাহিদার উন্নতি না হলে খুব তাড়াতাড়ি দশ লক্ষ কর্মী কাজ হারাতে পারেন। ইতিমধ্যেই চাহিদার পতনের জেরে ভারতে ১৭১০ জন কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাপানি গাড়ি নির্মাতা নিসান|

এতদিন অর্থনীতির শ্লথ গতি নিয়ে শিল্পমহল নীরব ছিল। কিন্তু হালে একে একে মুখ খুলতে শুরু করেছেন বিভিন্ন সংস্থার কর্ণধারেরা। একদিকে রাজস্ব আদায়ের গতি গত ৫ বছরের তুলনায় কম। অন্যদিকে বাজেটে খরচের টাকার সংকুলান কীভাবে ঘটবে তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না পরিকল্পনা রূপায়ণের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিক। সরকারি ঋণ কোথা থেকে জুটবে তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত প্রধানমন্ত্রী আর্থিক উপদেষ্টা থেকে শুরু করে প্রাক্তন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের। ডলারে ধারের সরকারি পরিকল্পনা যে দেশের আর্থিক সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে যে কত উদ্বেগের তা স্পষ্ট এদের বক্তব্যেই। তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এমন একটা দেশ দেখান যারা বিশ্বযুদ্ধের পরে বিদেশি মুদ্রায় সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত বন্ডে ঋণ নিয়েছে, কিন্তু তার মূল্য চোকায়নি। অন্যদিকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বাড়তি ভাঁড়ারে ভাগ বসানো নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নরের মতো অনেকেই। ফলে এবারে সমৃদ্ধির হার গত ৫ বছরের থেকেও আরও কমতে চলেছে তা অনেকেই পূর্বাভাস দিচ্ছেন। যার সামগ্রিক ফল দেশে অভূতপূর্ব বেকারত্বের পূর্বাভাস।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial