দেশরক্ষা করতে মমতার পথ অনুসরণ করুন মোদি

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

অনুবন্ধং ক্ষয়ং হিংসামনবেক্ষ্য চ পৌরুষম।
মোহাদারভ্যতে কর্ম যত্তত্তামসমুচ্যতে।।

উপরোক্ত শ্লোকটির অর্থ হল “ভাবী শুভাশুভ ফল, ধনক্ষয়, শক্তিক্ষয়, পরপীড়া ও সামর্থ্যের বিচার না করে কেবল অবিবেক বশতঃ যে কর্ম করা হয়, তাকে তামস কর্ম বলা হয়। শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় ২৫ নং এই শ্লোকটি বর্তমান ভারতবর্ষে কতটা প্রাসঙ্গিক তা পড়লেই বোঝা যায়।

আমরা যদি আজকের ভারতবর্ষের বর্তমান রাষ্ট্রনায়কদের ক্রিয়াকলাপ পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব আজ কয়েক হাজার বছর আগে যে ধর্মগ্রন্থ লেখা হয়েছে এবং সেখানে যা লেখা হয়েছে তা আজকেও কত প্রাসঙ্গিক।

২০১৪ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ সরকার। দেশের প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়বেন এবং সকলের সঙ্গে সকলের উন্নতি হবে। আমরা দেখলাম ২৬ জন অসাধু ব্যবসায়ী এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি টাকা ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেল। বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি, মেহুল চোকসি-সহ যেসব দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী দেশ থেকে পালিয়ে গেল তারা সরকারের সাহায্য ছাড়া দেশত্যাগ করেছে, এটা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে চলে যাওয়ার ফলে ব্যাঙ্কগুলিও দুর্বল হয়ে পড়ল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির এনপিএ দ্রুত বৃদ্ধির ফলে সরকারকে তার তহবিল থেকে ব্যাঙ্কগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আর্থিক সাহায্য করতে বাধ্য হল। এর পরে ব্যাঙ্কগুলির সংযুক্তিকরণ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও আর্থিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। উন্নয়নের সূচক জিডিপি ক্রমশই কমতে থাকে যা আজকে শতকরা ৪.৫-এ নেমে গেছে। কালো টাকা বাতিল করে সরকার ভেবেছিল ইতিহাস তৈরি করবে কিন্তু কোনও প্রস্তুতি ছাড়া এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক ও এটিএমগুলি মানুষের প্রয়োজন মতো অর্থ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল যার ফলে অসংখ্য মানুষ বেকার হল। ব্যাঙ্ক ও এটিএম থেকে টাকা না পেয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হল। গীতার বচন কতখানি সত্য তা প্রমাণিত হল। উপরোক্ত শ্লোকে পরিষ্কারভাবে লেখা হয়েছে, “সামর্থের বিচার না করে কেবল অবিবেকবশত যে কর্ম করা হয়, তাকে তামস কর্ম বলা হয়।”

নরেন্দ্র মোদি হিন্দুদের রক্ষক বলে প্রচারের চেষ্টা করছেন কিন্তু হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ গীতা পড়েছেন বলে মনে হয় না, যদি পড়তেন তাহলে কালো টাকা বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত নেবার আগে কী কী সমস্যার উদ্ভব হতে পারে সেটা বোঝার চেষ্টা করতেন। অদূরদর্শিতা ও অবিবেচকের মতো কাছ দেশের আর্থিক বুনিয়াদকেই ধ্বংস করে দিল। এইরকম আর্থিকভাবে বেসামাল অবস্থায় জিএসটি চালু করে চরম সর্বনাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী। সব দেশের রাষ্ট্রনায়করা দেশ পরিচালনা করেন অর্থনীতিবিদ, প্রশাসন ও বিচক্ষণ বাক্তিদের মতামত নিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী কারও কোনও উপদেশ গ্রহণ করলেন না। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিএসটি চালু করার আগেই বলেছিলেন ধীরে ধীরে জিএসটি চালু করার জন্য কিন্তু অহংকারী প্রধানমন্ত্রী কারও কথায় গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য অসংখ্য কলকারখানা আবার বন্ধ হয়ে গেল। জিএসটি সংক্রান্ত রাজ্যের অর্থমন্ত্রীদের কমিটি বার বার সভা ডেকে ট্যাক্সের পুনর্বিন্যাস করলেন কিন্তু এরই মধ্যে দেশের যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে এবং সরকার দেশের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়নি বলে দাবি করলেও সাধারণ মানুষ আজ দিশেহারা। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি লাগামছাড়া। গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার। গীতায় উল্লেখিত শ্লোকে বলা হয়েছে, “ভাবী শুভাশুভ ফল, ধনক্ষয়, শক্তিক্ষয়, পরপীড়া ও সামর্থের বিচার না করে কেবল অবিবেকবশত যে কর্ম করা হয় তাকে তামস কর্ম বলা হয়।”

আগেই বলেছি যে সাধারণ নাগরিকদের জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার যা বলা হয়েছে গীতায়। সৃষ্টি হয়েছে বর্তমানে দেশে এক গভীর সমস্যা এবং দেশব্যাপী সহিংস ও অহিংস আন্দোলন শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যা – অর্থাৎ সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট আক্টের জন্য। উপরোক্ত মূল আইনটি আগে পাঁচ বার সংশোধিত হয়েছে কিন্তু সেই আইন প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়নি। ২০১৯ সালে বিজেপি সরকার আরও একবার সংশোধন করে প্রয়োগ করার কথা ঘোষণা করে। সারা দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ কোনও কোনও রাজ্যে ব্যাপক হিংসাত্মক হয়। একমাত্র পশ্চিমবাংলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হিংসাত্মক আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পর্যবসিত করেন এবং সারা দেশকে বোঝাতে পেরেছেন, সহিংস আন্দোলন সব সময় আন্দোলনের মূল অভিমুখই পাল্টে দেয়। আজ ভারতবর্ষের মানুষের মনে প্রশ্ন একটাই তা হল, একদিকে চরম আর্থিক সংকট আর সেই সংকট থেকে মানুষের মন অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই আইন প্রণয়ন যাতে সব রাজ্যের মানুষের মন থেকে অভাব, দারিদ্র ও আর্থিক সংকট মুছে যায় এবং দেশের মানুষ ক্যা (CAA) বা এনআরসি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজধর্ম পালন করছেন। তিনি এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তিনি একদিকে রাজ্যের মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে যারপরনাই চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং দৈনিক সংবাদপত্রে তার সাফল্যের কথা প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর প্রকল্পগুলি তার উদাহরণ। এই প্রসঙ্গে গীতায় উল্লেখিত ৪৪নং শ্লোকে বলা হয়েছে- “স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ”। অর্থাৎ নিজ নিজ স্বভাবজাত কর্মে তৎপর ব্যক্তি ভগবৎ প্রাপ্তিরূপ পরম সিদ্ধিলাভ করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেদিন থেকে ক্ষমতায় এসেছেন সেদিন থেকেই রাজ্যের মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে একের পর এক প্রকল্প ঘোষণা করেছেন এবং প্রতিটি প্রশাসনিক বৈঠকে তার চুলচেরা বিচার করে দেখেছেন কোথায় মন্ত্রী বা প্রশাসকরা কাজে গাফিলতি করছেন। তীব্র ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, কাজে গাফিলতি তিনি সহ্য করবেন না। গীতায় উল্লেখিত শ্লোকটির প্রকৃত রূপায়ণ আমরা দেখতে পাই পশ্চিমবাংলায়। তাঁর উদ্যোগে যে প্রকল্পগুলি বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে এক দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। প্রকল্পগুলি যথাক্রমে ১) সবুজ সাথী ২) খাদাসাথী ৩) সুফল বাংলা ৪) গীতাঞ্জলি ৫) নিজ গৃহ নিজ ভূমি ৬) কন্যাশ্রী ৭) সবলা ৮) রূপশ্রী ৯) মুক্তির আলো ১০) স্বাবলম্বন স্পেশাল ১১) শিক্ষাশ্রী ১২) সবুজ সাথী ১৩) যুবশ্রী ১৪) গতিধারা ১৫) লোকপ্রসার ১৬) স্বাস্থ্যসাথী ১৭) শিশুসাথী ১৮) মাভৈঃ ১৯) স্বামী বিবেকানন্দ স্বনির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্প ২০) পশ্চিমবঙ্গ স্বনির্ভর সহায়ক প্রকল্প ২১) মুক্তিধারা ২২) জল ধরো জল ভরো। এছাড়া সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ ও সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষের জন্য নানা প্রকল্প চালু করে রাজ্যকে শীর্ষস্থানে আনার চেষ্টা করে চলেছেন।

রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্য’ কর্মসূচি অনুযায়ী পশ্চিমবাংলা দ্রুত ভারতের অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় এগিয়ে গেছে। নীতি আয়োগের এসডিজি সূচক অনুযায়ী জাতীয় স্কোর যখন ৬০ তখন পশ্চিমবাংলার স্কোরও ৬০। পশ্চিমবাংলা আজ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, শান্তি, বিচার, পরিস্রুত পানীয় জল ও নিকাশি। বাঁচার মতো চাকরি ও আর্থিক বৃদ্ধি, শিল্প ও পরিকাঠামো-উদ্ভাবন, অসাম্য দূরীকরণ, পরিবেশের ভারসাম্য ও মজবুত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রথমসারিতে উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে যে কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন কেবলমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি করছে পশ্চিমবাংলা যেমন দারিদ্র দূরীকরণ, ভাল মানের শিক্ষা, সস্তায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, সুস্থায়ী আর্থিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। আরও অনেক কাজ বাকি কিন্তু পশ্চিমবাংলার মানুষ বিশ্বাস করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকৃতপক্ষে স্বামী বিবেকানন্দের অনুগামী এবং তারই প্রদর্শিত পথে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন রাজধর্মে পালনের জন্য। যিনি দেশ বা রাজ্যকে পরিচালনা করবেন তাঁকে একদিকে দেশ বা রাজ্যের মানুষের জীবনের মানকে উন্নত করতে হবে। সমস্ত জাতি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে এবং সর্বোপরি শান্তিরক্ষা করতে হবে যা উন্নয়নের প্রধান শর্ত।

দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি দূরদর্শী হতেন তাহলে আজ সমগ্র দেশ জুড়ে আন্দোলন সংগঠিত হত না। দেশের মানুষ অসমের এনআরসি দেখেছেন আর সেই জন্য ক্যা, এনআরসি বা এনপিআর-কে মেনে নিতে পারছে না কারণ কেন্দ্রীয় সরকার মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। লোকসভা ও রাজ্যসভায় যে আইন গৃহীত হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দিয়েছেন সেই আইন না মানার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা। ভারতীয় গণতন্ত্র কত শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা আরও একবার প্রমাণিত হল কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশ আজ বিরোধিতার পথে। কৌটিল্যের একটি বচন যা তার অর্থশাস্ত্রে লেখা তার উল্লেখ করে শেষ করব–

প্রজাসুখে সুখং রাজ্ঞঃ প্রজানাং চ হিতে হিতম।
নাত্মপ্রিয়ং হিতং রাজ্ঞঃ প্রজানাং তু প্রিয়ং হিতম।।

অর্থাৎ প্রজার সুখে রাজার সুখ, প্রজার হিতে রাজার হিত, রাজার প্রিয় জিনিস বা কাজ হিত নয়। প্রজাদের প্রিয়ই হিত। সম্ভবত নরেন্দ্র মোদি এই উপদেশ পড়েননি বা পড়েও তা কার্যকর করার ক্ষমতা নেই।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial