দেশরক্ষার ব্রিগেড

পূর্ণেন্দু বসু

ধান্ধাটা লেগেছে ঠিক জায়গামতো৷ ব্রিগেড সমাবেশ নিয়ে নরেন্দ্র মোদির মন্তব্যেই তা বেশ বোঝা যাচ্ছে৷ দেশরক্ষার এই ঐতিহাসিক বিরোধী সমাবেশ সম্পর্কে মোদি বলেছেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমার জিরো টলারেন্স নীতি বিরোধীদের খেপিয়ে তুলেছে৷ ওঁরা আর সাধারণ মানুষের টাকা নিজেদের পকেটে ভরতে পারছেন না৷ ফলে খেপে গিয়ে এখন মহাজোট গড়তে চাইছেন৷”

ব্রিগেড সমাবেশ নিয়ে নরেন্দ্র মোদির এই মন্তব্য থেকে একথা স্পষ্ট যে, এই সমাবেশকে তিনি ভয় পেয়েছেন৷ তাই এইরকম কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেছেন বিরোধীদের৷ মোদি একথা বুঝতে পেরেছেন যে, বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়তে পারলে তাদের পরাজয় সুনিশ্চিত৷ তাই, বিরোধীরা নয়, আসলে খেপিয়েছেন মোদি নিজেই৷ গদি হারানোর ভয়ে তিনি দিশাহারা হয়ে বেলাগাম কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন৷ তার এই মন্তব্য অগণতান্ত্রিক, ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অসংসদীয়৷ তার সরকারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে উঠে আসা প্রশ্নগুলির সদুত্তর দিতে তিনি অপারগ৷ তাই তিনি এতটা উগ্র আক্রমণ করে বোঝাতে চাইছেন– বিরোধীরা অসৎ উদ্দেশ্যে মহাজোট করছেন৷ একথা সকলেই জানেন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা দেশনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত বছরের ২১ জুলাই ব্রিগেড সমাবেশের ঘোষণা করেছিলেন। তিনি দূরদর্শী তাই বুঝতে পেরেছিলেন মোদি জমানার গতিপ্রকৃতি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন– মোদি শাসনে দেশের বিপদ কীভাবে বেড়ে চলেছে৷ কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক নীতি দেশের ক্ষেত্রে বিপর্যয় ডেকে আনছে৷ দেশের ঐক্যভাবনা, ভারতের বহুত্ববোধ জলাতলি দিচ্ছে বিজেপি সরকার উগ্র সরকারি মদতে ভাষা এমনকী, নাগরিকত্ব নিয়ে এক ভয়ংকর বিভাজনের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে দেশকে টুকরো টুকরো করে ফেলার বিপদ বাড়ছে৷ শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষকে এই বিপন্ন পরিস্থিতি গ্রাস করছে৷

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির কথা ভেবেই বিজেপি বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলিকে একমঞ্চে হাজির করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন৷ এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে বাংলার মানুষকে প্রস্তুত করেছেন কয়েকমাস ধরে৷ তার ডাকে সাড়া দিয়ে সর্বভারতীয় বিরোধী নেতারা ব্রিগেড সমাবেশে হাজির হয়েছেন, রাজ্যের মানুষ কাতারে কাতারে এসেছেন জাতীয় স্তরের নেতদের কথা শুনতে৷ ব্রিগেড সমাবেশ প্রমাণ করেছে, মমতা সঠিক সময়ে, সঠিক কাজটিই করেছেন৷ এই সমাবেশ ছিল- দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, দেশের সংস্কৃতি, দেশের সংবিধান রক্ষার শপথ নেওয়ার সমাবেশ৷ তাই ব্রিগেডের ঐতিহাসিক সমাবেশকে এহেন আক্রমণ নরেন্দ্র ব্রিগেডের সমাবেশ ঐতিহাসিক৷ যে ঘটনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত হয়, সেই ঘটনাই ঐতিহাসিক বলে বিবেচিত হয়৷ এই সমাবেশ খাদের কিনারা থেকে দেশকে বাঁচানোর সমাবেশ। ব্যক্তি নয়, দেশের স্বার্থরক্ষার দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই ছিল ব্রিগেড সমাবেশ। উন্নত ভারত, ঐক্যবদ্ধ ভারত, গণতান্ত্রিক ভারত, সাংস্কৃতিক বহুত্বের ভারত ছিল এই সমাবেশের প্রাণকেন্দ্রে৷ ব্রিগেডের সমাবেশে একের পর এক নেতা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এই সমাবেশ কোনও ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়, এই সমাবেশ দেশ চালানোর ভুল নীতির বিরুদ্ধে৷ এই সমাবেশ দেশ বাঁচানোর সমাবেশ৷ এই সমাবেশ স্বৈরশাসনের প্রতিটি ঝোঁকের বিরুদ্ধে, অসহিষ্ণুতা আর রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সমাবেশ৷ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সংকীর্ণ দলতান্ত্রিক ক্ষুদ্রতার বিরুদ্ধে সোচ্চার আওয়াজ উঠেছে ব্রিগেড সমাবেশে৷ কে প্রধানমন্ত্রী হবে– এই সমাবেশ তা নির্ধারণ করার সমাবেশ ছিল না৷ এই সমাবেশ ছিল— দেশকে বাঁচাতে হলে, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ‘একের বিরুদ্ধে এক, এই নীতিকে সামনে নিয়ে লড়তে হবে এই দৃপ্ত ঘোষণার সমাবেশ৷ একথাও স্পষ্ট যে, শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ ভারত গড়ার অঙ্গীকার গ্রহণ করার লক্ষ্য, ব্রিগ্রেডে সমাবেশের দিশাকে দ্বিধাহীন ভাষায় ব্যক্ত করেছে৷ বার বার একথা বলা হয়েছে, আগে বিজেপি বিদায়, পরে হবে প্রধানমন্ত্রী বাছাইয়ের কাজ৷ শনিবারের মহা-ব্রিগেড থেকে মহাজোটের দামামা বাজিয়ে বিজেপি শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করল বিরোধী দলগুলি৷ বিরোধী জোটের এই মহারম্ভ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে গেলেন একের পর এক নেতৃত্ব।

মোদি জমানার অবসান ঘটাতে, বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার লক্ষে ঐক্যবদ্ধ ভারতের ছবি তুলে ধরতে বিজেপি-বিরোধী জোটের প্রথম বৃহত্তম সমাবেশ হিসাবে ১৯ জানুয়ারি ২০১৯-এর ব্রিগেড ইতিহাসে তার স্থান করে নেবে৷ এই বৃহত্তম সমাবেশের আয়োজক শুধু নন, পরিবর্তনের মুখ হিসাবেই নিজের জায়গা আরও মজবুত করে ফেললেন জননেত্রী-দেশনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মমতার ভূমিকায় খুশি বিরোধী নেতৃবর্গ।

রাজনৈতিক দিক থেকে বা রাজনীতির নিরিখে শনিবারের ব্রিগেড গভীর তৎপর্যময়৷ এদিনের ব্রিগেড সভায় উপস্থিত রাজনৈতিক দলগুলো দেশবাসীর সামনে শপথ নিল, এককেন্দ্রিক স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী ভাবনার রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই চলবে ভারতে৷ যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজ্যের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই চলবে দেশের কেন্দ্রীয় শাসন৷ সকলের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে — এমন শাসনই চাই৷ ব্রিগেড সমাবেশে যাঁরা এসেছেন তারা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারছেন। যাঁরা আসেননি, তাদেরও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে৷ শেষ পর্যন্ত যাঁরা আসবেন না, তারা ইতিহাসের পাতায় সমালোচিত হবেন। তবে এ-দেশের বামপন্থীরা যে বেশিরভাগ সময়ে ভুল করেন, এবারও তার ব্যতিক্রম হল না৷ বিজেপি বিরোধী জোট গড়ার মহাসংগ্রামে মমতার ডাকে সাড়া দিলে ওঁদের যে জাত যাবে না, সে-কথা ওরা কবে বুঝবেন? এ কথাটাও স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার যে, কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি শাসন যখন থেকে শুরু হয়েছে, তখন থেকেই প্রতিটি জনবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় দেখা গিয়েছে৷ নোটবন্দি থেকে তড়িঘড়ি জিএসটি চালু, ঋণভারে বিপর্যস্ত কৃষকের মৃত্যু মিছিল, কিংবা দুর্নীতির প্রশ্নে সকলের আগে সরব হতে দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই। মোদি সরকারের হাতে যে দেশের মানুষ সুরক্ষিত নয়, সেটাও প্রথম জানিয়েছিলেন তিনিই। অথচ সব বিরোধী দলগুলি বিজেপির বিরোধিতা করার সাহস সঞ্চয় করতে পারছিল না৷ তাই নোটবন্দির সময় সব বিরোধী দল আন্দোলন সংঘটিত করতে পারেনি৷ এক্ষেত্রেও যোগসূত্র হিসাবে কাজ করেছেন উদ্যোগী মমতা৷ দেশের চরম সংকটমোচনে বিজেপি সরকারকে উৎখাত করে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা যখন সমানে আসছে, তার আগে থেকেই মমতা বিরোধী দলগুলির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রেখে চলেছেন। এখন দেশের অধিকাংশ বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারছেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাবিত সম্মিলিত বিরোধী মহাজোটেই ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে রুখে দিতে পারে৷ বিজেপিকে রুখে দিতে একের বিরুদ্ধে এক এবং যেখানে যাদের শক্তি বেশি সেখানে সেই দলের প্রার্থীকে সকলে মিলে সমর্থন করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এ বিষয়ে নানা দোদুল্যমানতাও সে সময়ে লক্ষ করা গিয়েছে বিরোধীদের মধ্যে৷ এই দোদুল্যমানতা দূর হওয়া দরকার৷ কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে দেশের ২৫-২৬টি দলের নেতৃবৃন্দ হাজির হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে জোটবার্তা দিলেন, তাতে স্পষ্ট সকলেই মমতার ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন৷ দেশে যে পরিবর্তনের লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে, সেই ছবিটাও অনেকটা স্পষ্ট হল এই বিরোধী সমাবেশে৷ বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম দেখে জাতীয় নেতারা নিশ্চিতভাবেই বুঝেছেন যে, বাংলার বিপুল জনপ্রিয়তার পিছনে আছে তার নানাবিধ জনমুখী কর্মকাণ্ড। তাই মানুষের উজাড় করা সমর্থন পান মমতা। ব্রিগেড সমাবেশ ‘ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার ব্রিগেড’রূপে সকলের সামনে ফুটে উঠেছে। এবারের ব্রিগেড ছিল এক মিনি ভারতবর্ষ যেখানে উত্তর-পশ্চিম, মধ্য-দক্ষিণের রাজনীতি মিশে গেল পূর্বের সঙ্গে৷ আওয়াজ উঠল ঐক্যবদ্ধ ভারতের। আওয়াজ উঠল ধর্মনিরপেক্ষতা অক্ষুন্ন রাখার। বৈচিত্রের ভারত ধরা দিল, ভাষণে ভাষায়। সুর কাটেনি একবারও। সুর একটাই, দেশের সংবিধানকে অক্ষত রাখতে হবে৷ তার জন্য বিজেপিকে দিল্লির মসনদ থেকে সরাতে হবে৷

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers