দেশবিভাজন রুখতে একঘরে হবে বিজেপি

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

তীর্থ রায় 

নতুন বছরে বিজেপিকে গোটা দেশে একঘরে করার ডাক দিয়েছেন বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনকে সামনে রেখে দেশে আড়াআড়ি বিভাজন করতে চাইছে বিজেপি। যেভাবে ধর্মের ভিত্তিতে দেশে নাগরিকত্ব প্রদানের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে তা দেশকে নিশ্চিত করেই বিভাজনের মুখে দাঁড় করাবে। যদি আমরা আরও একটা দেশভাগ ঠেকাতে চাই, তাহলে এই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনটি বাতিল করতেই হবে। সমস্ত তৃণমূলকর্মী ও দেশভক্তদের কাছে নতুন বছরের শপথ হল যে কোনও মূল্যে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনকে ঠেকাতে হবে। এই আইনের বিরুদ্ধে গোটা দেশজুড়ে বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী যে আন্দোলন শুরু করেছেন তার বার্তা প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। এই নতুন বছরে দেশে এবং সর্বোপরি আমাদের রাজ্যে এমন কোনও মানুষ থাকবে না যে সংশোধিত নাগরিক আইনের প্রতিবাদে রাস্তায় নামবে না। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে যদি সমস্ত মানুষকে পথে নামানো যায়, তবেই একমাত্র এই আইনকে রুখে দেওয়ার লক্ষ্য পূরণ হতে পারে।

এই নতুন বছর একটি নতুন দশকেরও সূচনা করছে। একটা নতুন দশক আমাদের সামনে সবসময় অনেক আশাভরসা নিয়ে হাজির হয়। এক দশক মানুষের জীবনে কম সময় নয়। দেশ ও সমাজের ইতিহাসেও এটি একটি দীর্ঘসময়। একবিংশ শতকের দুটি দশক আমরা পার করে এসেছি। আজ থেকে ২০ বছর আগে নতুন শতক নিয়ে দেশের সামনে অনেক প্রত্যাশা ছিল। দেশের অর্থনীতিতে আমরা নিঃসন্দেহে অনেকটাই এগিয়েছি। দেশে দারিদ্র তুলনামূলকভাবে কমেছে, কিন্তু এই নতুন শপথ যতটা প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের সামনে এসেছিল বিগত দুটি দশক অবশ্যই তার সবটা পূরণ করতে পারেনি। আগামী এক দশক সেই কারণে আমাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত ছ’বছর ধরে আমরা দেশে যে শাসন দেখছি, তা আমাদের উপর সবরকমভাবে বিপর্যয় নামিয়ে এনেছে। দেশে বেকারত্ব এখন ৪৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। দেশে গত কয়েক বছর ধরে নতুন কোনও কল-কারখানা নেই, নতুন কোনও লগ্নি নেই। দেশে বৈষম্য বাড়ছে। দেশের অর্থনীতিতে এক চরম নৈরাজ্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক একসময় ছিল আমাদের অর্থনীতির একটা বড় বুনিয়াদ। সেই ব্যাঙ্ক-কাঠামোকে আজকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাঙ্কের অনুৎপাদক সম্পদ ১০ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। নীরব মোদি, মেহুল চোকসি, বিজয় মালিয়ারা হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে দেশ থেকে ফেরার হয়ে গিয়েছে। দেশের ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার পরিকাঠামো এইভাবে ধসে পড়ায় অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত। ফলে নতুন দশকে অর্থনীতিকে ফের আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া দেশের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ দেশের সরকার কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেই প্রশ্ন নতুন বছরে সবচেয়ে বড় করে দেখা দিয়েছে।

দেশের অর্থনীতি গত ছ’বছর ধরে একেবারে পর্যুদস্ত করে দেওয়ার পর বিজেপি এখন চাইছে জনগণের নজর ঘোরাতে। জনগণের নজর ঘোরানোর ক্ষেত্রে তাদের হাতিয়ার রাজনীতিতে বিভাজন সৃষ্টি করা। রাজনীতিতে এই বিভাজনের লক্ষ্যেই তারা নাগরিকত্ব আইনের বর্তমান সংশোধনীটি নিয়ে এসেছে। আমাদের দেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের কথা সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলা রয়েছে। এই ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের মূল সুর হল রাষ্ট্র কোনওভাবে নাগরিকদের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে কোনও ভেদাভেদ বা বৈষম্য করবে না। কিন্তু, নাগরিকত্ব আইনে দেখা যাচ্ছে, ধর্মকে বেনজিরভাবে টেনে আনা হল। স্বাধীনতার পর দেশে কখনও রাষ্ট্রীয় কাজে ধর্মকে টানা হয়নি। কিন্তু সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা একমাত্র অ-মুসলিম শরণার্থীদেরই নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এই তিন দেশ থেকে যদি কোনও মুসলিম শরণার্থী ভারতে এসে থাকেন তাহলে তাঁকে নাগরিকত্ব দেওয়ার সংস্থান বর্তমান আইনে নেই। এই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এনআরসি। এনআরসি তালিকায় যাদের নাম থাকবে না, তাদের কাগজপত্র দেখিয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। যাদের বাপ-ঠাকুরদা ২০০-৩০০ বছর ধরে ভারতে রয়েছেন, তাদের নামও এনআরসি তালিকায় বাদ যেতে পারে। অসমে এনআরসি তৈরির ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে। বহু এমন মানুষের নাম অসমের এনআরসি-তে নেই যারা কয়েক পুরুষ ধরে ভারতে বসবাস করছে। যাদের নাম এনআরসিতে নেই তাদের এখন কাগজপত্র দিয়ে আদালতের কাছে নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই হতদরিদ্র। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। যারা কাগজপত্র দেখাতে পারছে না, তাদের স্থান হচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্পে। যে ডিটেনশন ক্যাম্পে বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বিনা চিকিৎসায়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একাধিকবার ঘোষণা করেছেন, গোটা দেশে এনআরসি হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘোষণার পর বহু মানুষের আতঙ্কে মৃত্যু হয়েছে। বহু মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। কারণ, এইসব মানুষের নাগরিকত্ব প্রমাণে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। অথচ, এরা সকলেই বছরের পর বছর ভারতে বসবাস করছে। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে বলা হয়েছে, হিন্দু-শিখ-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ-জৈন ও পারসিকদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার কোনও সমস্যা নেই। ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা এই ৬টি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমস্ত মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু, মুসলিমদের ক্ষেত্রে সেটা হবে না। ফলে, কোনও মুসলিমের নাম যদি এনআরসি তালিকা থেকে বাদ যায়, তাহলে তাকে কাগজপত্র দিয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে যখন আইন করে এই কথা বলা হয়, তখন নিশ্চিত করেই সেটা দেশের এক বিরাট অংশের মানুষের ভাবাবেগকে আহত করে। ভারতবর্ষের সংবিধান কখনওই এইভাবে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভেদকে প্রশ্রয় দেয় না। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। গোটা দেশজুড়ে মানুষ এই সংশোধিত আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে। এই আন্দোলন কোনও ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই আন্দোলনে এক স্বতঃস্ফূর্ত জনবিক্ষোভের চেহারা গ্রহণ করেছে।

সংশোধিত নাগরিকত্ব বিলটি সংসদে পেশ করার পরই এর প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দেশজুড়ে এই আন্দোলনে নেতৃত্বের মুখ হয়ে আজ উঠে এসেছেন। আগামিদিনে এই আন্দোলনকে আরও ব্যাপক ও তীব্র করার লক্ষ্যে গোটা দেশ আজ তাঁর দিকে তাকিয়ে। কয়েকদিন আগে ঝাড়খণ্ডের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ঝাড়খণ্ড জনমুক্তি মোর্চার নেতা হেমন্ত সোরেন। রাঁচিতে সোরেনের শপথেও দেখা গেল বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী গোটা দেশের নেতাদের মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন। আজ গোটা দেশের মানুষ তাঁর উপর ভরসা করছে এই আইনকে ঠেকাতে। এই আইনকে না ঠেকাতে পারলে দেশ ফের ভাগ হয়ে যাবে। এই সংশোধিত আইন দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। ভারতবর্ষ বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতির দেশ। ভারতের এই বহুত্বকে ধরে না রাখতে পারলে তার ঐক্যকেও কোনওভাবে রক্ষা করা যাবে না। সুতরাং, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন আমাদের ঐক্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দেশকে ভাগের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন বছরে তথা নতুন দশকে সমগ্র দেশবাসীর তাই একটাই শপথ হওয়া উচিত, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনকে আমরা ঠেকাব। দেশের সব মানুষ নাগরিক, এই কথা সোচ্চারে বলব।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial