তিনি কৃষক পরিবারের পাশেই, আবার বুঝিয়ে দিলেন জননেত্রী

 

তীর্থ রায়

বিগত বছরটি ভারতবর্ষের রাজনীতিতে কৃষকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভের জন্য চিরকাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে গত পাঁচ বছরে ভারতের কৃষকদের অবস্থা যে দুর্বিষহ জায়গায় পৌঁছেছে তা এক বিরাট বিক্ষোভের চেহারা নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্ৰকাশ পায় ২০১৮ জুড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষত, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ১০১৮-য় আমরা যে ধরনের কৃষক বিক্ষোভ দেখতে পেয়েছি, তা সাম্প্রতিক অতীতে দেশে দেখা যায়নি। লক্ষ লক্ষ কৃষক বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে অবাহী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কৃষকনীতির বিরুদ্ধে বিগত বছরে বারবার বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। কৃষক অসন্তোষের জেরেই হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যে বিজেপি বহুদিন পর ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। কর্নাটকেও বিজেপি অনেক টাকা-পয়সা খরচ করেও ক্ষমতায় আসতে পারেনি। কৃষক বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে রাজধানী দিল্লিও। দেশজোড়া এই কৃষক বিক্ষোভের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ। কারণ এই রাজ্যে কৃষকরা জানেন এখানে ক্ষমতায় যিনি রয়েছেন, তিনি একজন কৃষক দরদী ব্যক্তি। সাত বছর আগে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় কৃষকদের সমস্যা ও দুঃখদুর্দশা দূর করতে যেভাবে সচেষ্ট হয়েছেন তা ভারতের কোনও রাজ্যে হয়নি। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মধ্য দিয়ে  বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাজ্যে  মা-মাটি-মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম, দু’জায়গাতেই পাশে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বাজি রেখে বাংলার জননেত্রী আন্দোলন করেছিলেন। কৃষকের তিন ফসলি জমি রক্ষার স্বার্থে ধর্মতলার মোড়ে তাঁর ঐতিহাসিক অনশন দেশের কৃষকরা কোনওদিন ভুলবেন না, ভুলতে পারেন না। ২০১১-য়। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর সরকার কৃষি ও শিল্পের উন্নয়নে সমানভাবে কাজ করবে। তিনি বলেছিলেন, কৃষি ও শিল্প হল দুই বোন। হাসি ও খুশি।

 

মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর প্রথম দিন থেকেই বাংলার জননেত্রী কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার চেষ্টা করেছেন। সবাই জানে শপথ নেওয়ার পর প্রথম দিন তাঁর মন্ত্রিসভার বৈঠকের প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল, সিঙ্গুরের উর্বর তিন ফসলি জমি সেখানকার কৃষকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি কথা রেখেছেন, কৃষকদের স্বার্থে ও কল্যাণে তাঁর এই ভূমিকা ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শুধু  কৃষকদের জমি সুরক্ষিত রাখাই নয়, গত সাত বছর ধরে তিনি কৃষকদের কল্যাণে, কৃষকদের স্বার্থে একের পর এক কাজ করে গিয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে গত সাত বছরে এই রাজ্যে কৃষকদের আয় তিন গুণ বেড়েছে। গোটা দেশে যখন হাজার হাজার কৃষক খেতে না পেয়ে, ঋণের দায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন, সেখানে এই বাংলায় সরকারের সক্রিয় উদ্যোগে কৃষকদের আয় তিন গুণ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। এটা একটা অভাবনীয় সাফল্য। আজ গ্রামবাংলায় গেলেই উন্নয়নের ছবি চোখে পড়ে। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম আমলে গ্রামবাংলার চেহারা দারিদ্রক্লিষ্ট ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। মাত্র কয়েক বছরে তার বদল আনতে সক্ষম হয়েছেন বাংলার জননেত্রী। আজ গ্রামবাংলায় ঝকঝকে রাস্তাঘাট হয়েছে। ঘরে ঘরে পানীয় জল পৌঁছেছে। সমস্ত ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। কৃষকদের ফসল বিপণনের জন্য আধুনিক বাজার তৈরি হয়েছে। সরকার কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি বছর নিয়ম করে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দিয়ে ধান কিনছে। কৃষকরা অন্যান্য ফসলের দাম পাচ্ছেন। গ্রামের পরিকাঠামো ব্যাপকভাবে উন্নত হওয়ায় কৃষকরা অন্য আরও নানান কাজে যুক্ত হয়ে আয় বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন।

 

পশ্চিমবঙ্গে গত সাত বছরে কৃষকদের জীবনে এইভাবে ব্যাপক উন্নতি ঘটিয়েও চুপ করে বসে থাকছেন না বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কৃষকদের জীবণ-জীবিকা উন্নয়নে লাগাতার কাজ চালিয়ে যাওয়াই যে তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় মন্ত্র, তা তিনি প্রতিটি পদক্ষেপে স্পষ্ট করে দিচ্ছেন। বছর শেষে তিনি কৃষকদের জন্য এমন প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছেন, যা বাংলার প্রতিটি কৃষক পরিবারে খুশির আলো নিয়ে এসেছে। ২০১৮-তে দেশজুড়ে কৃষকরা যদি তাদের বিক্ষোভ-বিদ্রোহের জন্য স্মরণে রাখেন, তাহলে বাংলার কৃষকরা নিশ্চয়ই ২০১৮-তে ভবিষ্যতে স্মরণ করবেন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কয়েকটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তের জন্য। ২০১৮-র শেষ দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন তাঁর ঐতিহাসিক ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্পের কথা। দেশের কোনও সরকার কখনও এই ধরনের প্রকল্পের কথা চিন্তা করেনি। কৃষকবন্ধু প্রকল্পে বলা হয়েছে এই রাজ্যের ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যে যেকোনও কর্মক্ষম কৃষকের মৃত্যু হলে সরকার তার পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেবে। এই মৃত্যু কীভাবে হল, তা দেখা হবে না। স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রেও কৃষক পরিবার ক্ষতিপূরণ পাবে। দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রেও কৃষক পরিবার ক্ষতিপূরণ পাবেন।  কৃষক পরিবারের কোনও নিশ্চয়তা নেই। কৃষক যতদিন কর্মক্ষম থেকে উপার্জন করেন ততদিন পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়। কিন্তু কোনও কৃষককের আচমকা মৃত্যু হলে অথৈ জলে পড়ে তাঁর পরিবার। সরকারের এই ঘোষণায় এক বিরাট ভরসা পেল বাংলার সমস্ত কৃষক পরিবার।

 

এছাড়াও ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্পে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, চাষের খরচ হিসাবে প্রতিবছর কৃষক পরিবারকে সরকার ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেবে। একর প্রতি পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হবে। দু’টি পর্বে আড়াই হাজার টাকা করে সমস্ত কৃষক ও খেতমজুর এই আর্থিক সাহায্য পাবেন। জমির অনুপাতের ভিত্তিতে টাকা কৃষকদের ভাগ করে দেওয়া হবে। কৃষি দফতরকে মুখ্যমন্ত্রী অবিলম্বে এই কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়া থেকেই কৃষি দফতর ফর্ম বিলি শুরু করবে। ফর্ম পূরণ করে কৃষকদের টাকার জন্য আবেদন জানাতে হবে। সরকার এইভাবে কৃষকদের চাষের খরচ জুগিয়ে যেভাবে পাশে দাঁড়াচ্ছে, তা এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত।

সাত বছর ধরেই নানা ধরনের প্রকল্প ও পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এই রাজ্যের কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গ একটি কৃষিপ্রধান রাজ্য। এখনও এই রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। ফলে কৃষির উন্নয়নে সরকারের যে কোনও পদক্ষেপ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। কয়েকদিন আগেই বাংলার জননেত্রী ঘোষণা করেছেন, কৃষকদের ফসলের যে বিমা হয় তার পুরো প্রিমিয়াম রাজ্য সরকার দিয়ে দেবে। এতদিন এই প্রিমিয়ামের ৮০ শতাংশ টাকা রাজ্য দিত। ২০ শাতাংশ টাকা কেন্দ্রের দেওয়ার কথা। কিন্তু কেন্দ্রে যেদিন থেকে নরেন্দ্র মোদি সরকার এসেছে, সেদিন থেকে এই টাকা নিয়ে টালবাহানা শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তাই জানিয়ে দিয়েছেন, ৮০ শতাংশ টাকা যখন রাজ্য দেয়, তখন বাকি টাকাও রাজ্য দিয়ে দেবে। মুখ্যমন্ত্রী এর আগে প্রাকৃতিক বিপৰ্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৬৩ লক্ষ কৃষককে মোট আড়াই হাজার কোটি টাকা সাহায্য দিয়েছেন। তাঁর সরকারই ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে সমস্ত কৃষকদের জন্য বার্ধক্যভাতা দিচ্ছে। চার লক্ষের বেশি কৃষককে জননেত্রী যন্ত্রাংশ কিনতে আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন। এ বাবদ সরকার ১৬০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। বাংলার জননেত্রী রাজ্যে সমস্ত কৃষিজমির মিউটেশন ফি ও খাজনা মকুব করেছেন। সম্প্রতি তিনি ঘোষণা করেছেন, রাজ্যের সমস্ত জমি মিউটেশন হবে অনলাইনে। সর্বশেষ তাঁর ঘোষণা হল, ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্প। অতীতের কোনও সরকার এত অল্প সময়ে কৃষকদের জন্য এতগুলি প্রকল্প নিতে পারেনি। অতএব বাংলার কৃষক চিরকাল ২০১৮-কে মনে রাখবে তাঁদের জন্য রাজ্য সরকারের এতগুলি কল্যাণমূলক প্রকল্প গ্রহণের বছর হিসাবে। নতুন বছরে বাংলার কৃষকদের ঘরে আরও সুখ-সমৃদ্ধি আসবে, কৃষককের ঘর আরও আনন্দে ভরে উঠবে, এই প্রত্যাশা বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers