জয়তু বিবেকানন্দ

রাজ চক্রবর্তী

“জয়,-তরুণের জয়!/জয় পুরোহিত আহিতাগ্নিক,-জয়,-জয় চিন্ময়!/স্পর্শে তোমার নিশা ছুটেছিল,-ঊষা উঠেছিল জেগে’/পূর্ব তোরণে, বাংলা-আকাশে,-অরুণ-রঙীন মেঘে;/আলোকে তোমার ভারত, এশিয়া,- জগৎ গেছিল রেঙে!”

ভাবছেন নিশ্চয়ই, এ কবিতা কার লেখা, কাকে নিয়েই বা লেখা। বলাটা একটু কঠিন, কারণ যিনি লিখেছেন, তার নাম জীবনানন্দ দাশ। বাংলার ১৩৩৪ অর্থাৎ ১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘ঝরা পালক’ কবিতার বইতে মাথা গুঁজে আছে এ কবিতা। ছত্রগুলোয় জীবনানন্দীয় গন্ধ নেই, আছে যেন খানিকটা নজরুলের গন্ধ। সে যাই হোক, যাঁকে নিয়ে লেখা, তিনি হলেন বীরসন্ন্যাসী বিবেকানন্দ। অর্থাৎ এ-কবিতা হল এক কথায় বাংলার এক চিরপ্রণম্যকে প্রণাম, স্বভূমিকে প্রণাম, ইতিহাসকে প্রণাম। কেননা, বিবেকানন্দ বাংলার উজ্জ্বল ইতিহাসের অন্যতম অগ্রণী নায়ক।

 

১৮৬৩-র জাতক স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর সার্ধশত জন্মবর্ষ পার হয়ে ছুটে চলেছেন অনন্তের পানে। এ ছুটে চলার বিরাম নেই। কেননা, অফুরন্ত তাঁর প্রাণশক্তি। তার সঙ্গে ইচ্ছাশক্তি। আছে আরও- মানবতার আলো আর প্রজ্ঞার দ্যুতি। মাত্র ৩৯ বছরের আয়ু হলেও, আজ থেকে ১১৭ বছর আগে শরীরী বিদায় নিলেও তিনি আজও প্রবলভাবে বিদ্যমান। আজও কোন সুদূর থেকে লাখো মানুষকে পথ দেখিয়ে চলেছেন, আজও তাঁর প্রবল আত্মবিশ্বাসী হৃদয়ের একটুখনি ছোঁয়া দিয়ে কত লাখোজনকে সাফল্যের শীর্ষে তুলে ধরছেন আর কত মানুষের মনে আজও ইতিবাচকতার অগ্নিমন্ত্র লাভের নেপথ্য কারিগর হয়ে রয়েছেন সে-হিসাব রাখা অসম্ভব। তাঁকে ছাড়া আজও আমাদের বাঁচতে চাওয়া মানে স্রেফ অন্ধকারে কানাগলিতে পথ খুঁজে মরা।

 

আজ জগতে যে-মানবাধিকার ও মানবতা নিয়ে এত হইচই সেই মানবতার সবচেয়ে বড় পুরোহিত বিবেকানন্দই। মানবতার প্রতি আকাশছোঁয়া শ্ৰদ্ধা নিয়ে তিনি বলছেন, “Never forget the glory of human nature ! we are the great God, Christ and Buddha are but waves of boundless ocean, which । am.” এই হল সেই অগ্নিমন্ত্র যা কানে ঢুকলে হয়তো মৃত শরীরেও প্রাণ ফিরতে পারে। পশ্চিমে গিয়ে মানবসাগরতীরে দাঁড়িয়ে মানুষকে উত্তীর্ণ হওয়ার পথ দেখিয়ে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “Man never progresses from error to truth, but from truth to truth from lesser truth to higher truth. মানবসভ্যতার এই শ্ৰেষ্ঠ আচার্যদেবকে পেয়ে আমরা ধন্য হয়েছি, কিন্তু তাঁকে সর্বাংশে গ্রহণ ও অনুসরণে কোথাও একটা খামতি রয়ে গিয়েছে নিশ্চয়ই, নইলে আমাদের জাতীয় দুৰ্গতি কবেই ঘুচে যেত।

 

বিবেকানন্দ সনাতন ধরণীর জাগ্রত বিবেক। তিনি চেয়েছিলেন, মানুষের মধ্যে যে অনন্ত শক্তি বিরাজিত তাকে জাগিয়ে তুলতে। মানুষকে, আরও ভাল করে বললে, তরুণদলকে উৎসাহিত করতে তিনি নিজের জীবনপাত্ৰখানি মেলে ধরেছিলেন তাদের সামনে। আজ তাঁর জন্মদিন জাতীয় যুব দিবস হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, হয়তো আমরা ভেবেছি, এতেই বুঝি তাঁকে মস্তবড় সম্মান জানিয়ে আমাদের দায় সারা হল। কিন্তু এর চেয়ে বড় ভ্রান্তি আর হয় না। কারণ, সে সম্মানটুকু তাঁর অনেককাল আগেই আদায় করা হয়ে গিয়েছে। চিকাগো-জয়ী বিবেকানন্দ যেদিন ভারতে প্রত্যাবর্তন করলেন সেদিন মাদ্রাজ বন্দর থেকে তামিল যুবকেরা তাঁকে গাড়িতে বসিয়ে ঘোড়া খুলে দিয়ে নিজেরাই টেনে নিয়ে গিয়েছিল। যুবসমাজ সেদিনই বিবেকানন্দকে তাদের নেতা বা পথপ্রদর্শক বলে মেনে নিয়েছিল আর সেদিনই ছিল আসল যুব দিবস। যুবসমাজের তিনি নির্বিকল্প নায়ক এবং শ্রেষ্ঠ আচার্য। এ পড়া দেশে এমন দেশভক্ত, মানবপ্রেমিক তেজস্বী সাধু দ্বিতীয়রহিত।

রবীন্দ্রনাথ যেমন পুঁথিগত শিক্ষাকে আদর্শ বলে মেনে নেননি, বিবেকানন্দও তেমনি ধর্মকে শুধুই কতকগুলি আচার-সংস্কারের বস্তু বলে মানতে অস্বীকার করেছেন। ধর্ম তাঁর কাছে আলোকিত হওয়ার সোপান। লোকাচারের বেড়ি পায়ে পরে ধর্মপালনের কুফল সম্পর্কে বিলক্ষণ অবহিত ছিলেন তিনি। এই লোকাচারধারীরাই একদিন তাঁর গুরুতীর্থ দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে বিদেশ-ফেরত বিবেকানন্দকে ঢুকতে দেয়নি আর কালের কী নির্মম পরিহাস! আজ সেই দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গণেই শোভা পাচ্ছে তাঁরই ব্রোঞ্জের মর্মরমূর্তি। এই অন্ধকার থেকে প্রিয় দেশবাসীকে বের করে আনতেই বিবেকানন্দ একদিন বলেছিলেন, গীতাপাঠ ছেড়ে ফুটবল খেলা ভাল। দাপটের সঙ্গে বদলে দিয়েছিলেন সন্ন্যাসের চিরাচরিত সংজ্ঞা, মাত্রা ও আদর্শ। তাঁর মতে, সন্ন্যাসগ্রহণের উদ্দেশ্য হল মানবসেবা, কিনা জীবজ্ঞানে শিবসেবা। বলেছিলেন, “আত্বনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ।” জগতের হিতসাধনের মধ্য দিয়েই নিজের মোক্ষলাভ সম্ভব। আবহমানকালের পৃথিবীতে, এই ঘোর স্বার্থপর পৃথিবীতে এ বড় অভিনব বার্তা। আর একথা বলতে পারেন একমাত্র তিনিই। গুরু শ্রী রামকৃষ্ণ তাঁকে বটবৃক্ষের ভূমিকায় দেখতে চেয়েছিলেন। বটবৃক্ষই হয়েছিলেন তিনি। তাঁর ডালে ডালেই আজও আমাদের আশ্রয়। তাঁরই ছায়াতলে আমাদের শরণ। বিবেকানন্দই আজও আমাদের পরমানন্দের উৎসভূমি। তাঁর ১৫৬তম জন্মবর্ষে তাঁকে আমাদের প্রণাম। বাংলা তথা ভারত তথা আবিশ্বের চৈতন্যের উদয় হতে পারে তাঁর হাত ধরেই। আর সেটাই আমাদের একমাত্র বাঁচার পথ। জয়তু বিবেকানন্দ।

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers