জাতীয় ঐক্যের স্বার্থেই গণতন্ত্র রক্ষা দরকার

সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ কথাটির গুরুত্ব দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রমশ তার প্রয়োজনীয়তাকে খর্ব করে দেওয়ার এক পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে তার লক্ষ্যপথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। দেশ পরিচালনা করার ক্ষেত্রে দেশের সামনে উপস্থিত চরম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার দীর্ঘকালের প্রচলিত রীতি আজ অবলুপ্ত। আজ শুধু সরকারি গৃহীত সিদ্ধান্ত একতরফা ঘোষণা করে দেওয়া রীতি হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের আনা যে কোনও সদর্থক প্রস্তাবকে ধ্বনি ভোটেই হোক বা বোতাম টিপেই হোক, বাতিল করে দেওয়ার সরকারি প্রচেষ্টা প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। বিলের পর বিল সরকারিভাবে এনে রেকর্ড স্থাপনের জন্য সরকার কৃতিত্ব দাবি করছে সোচ্চারে। কিন্ত বিরোধী দলগুলোর এই সব বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করার বিষয়টিকে তুলে ধরা হচ্ছে না। কী ক্ষতি হয়, যদি কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিরোধী দলের দু’-একটা সংশোধনী বিলে অন্তর্ভূক্ত করা বা বাদ দেওয়া হয়। সরকারের এই মনোভাবকেই অগণতান্ত্রিক এবং একপেশে বলে চিহ্নিতকরণ করা যেতেই পারে। লোকসভাতেও সরকার এবং বিরোধীদের মধ্যে বাদানুবাদ শুরু হলে সরকারি বেঞ্চ থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা যেভাবে তাতে অংশগ্রহণ করেন তা বিসদৃশ লাগে। অপ্রত্যাশিতভাবে এই প্রবণতা বর্তমান সরকারের আমলে বেড়েই চলেছে।

সংসদে সম্প্রতি স্থায়ী সমিতি (স্ট্যান্ডিং কমিটি) ঘোষিত হয়েছে। আমাদের সাংসদদের লোকসভা ও রাজ্যসভায় প্রত্যেক সদস্যকেই রীতি অনুযায়ী দু’টি করে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। স্থায়ী সমিতি ও পরামর্শদাতা কমিটি। কিন্তু কমিটির চেয়ারম্যান যেখানে যাদের উপযুক্তভাবে প্রাপ্য তাদেরকে সেক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছে ব্যাপকভাবে । কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না মেনেই। অতীতে দলগুলির নেতাদের কাছে চিঠি দিয়ে চেয়ারম্যানদের নাম জানতে চাওয়ার রীতিরও পরিবর্তন হয়েছে এবার। তালিকা ঘোষিত হচ্ছে রাত ১২টার সময়। ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।

অর্থনীতির বেহাল পরিস্থিতিতে সরকারের কোনও হেলদোল নেই। ব্যাঙ্কে টাকা রাখা নিরাপদ বলে মনে করতে সংকোচ বোধ হচ্ছে। বস্তুশিল্প, গাড়ি নির্মাণ, গৃহ নির্মাণ, পর্যটন শিল্প সবই প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ছে।  বিকল্পের পথ খুঁজতে সব কিছুকেই বিলগ্নীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সর্বত্র এক ধরনের অস্থিরতা দেশকে গ্রাস করছে। সহিষ্ণুতার পরিবেশ সম্পৃক্তভাবেই ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে গিয়েছে। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অতীব সংখ্যাগরিষ্ঠতা অতীতে অন্য দল পেলেও এ ধরনের প্রতিহিংসার বাতাবরণ কখনও সৃষ্টি হয়নি। লোকসভার প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রত্যাশামতো বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায় না। বিরোধীদের আনা প্রস্তাবগুলোকে আলোচনায় আনতে সরকারপক্ষ বিষয়-উপদেষ্টা কমিটি বৈঠকে আমলই দেয় না। আজও দেশের বেকারিত্ব নিয়ে লোকসভায় আলোচনায় আনা তৃণমূলের প্রস্তাব গুরুত্বই পায় না।

রাজ্য সরকারের প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য করে ক্রমাগত আক্রমণ করা হচ্ছে। রাজ্য সরকার পরম ধৈর্যের সঙ্গে সমস্তরকম প্ররোচনাকে পাশে সরিয়ে রেখে রাজ্যের উন্নয়নে যখন ব্রতী থাকে, তখন কেন্দ্রের সরকারের এই নিদারুণ, নিন্দনীয়, অগণতান্ত্রিক আক্রমণের পথ কি শোভনীয়? গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাম্য? রাজ্যের কাজ রাজ্য করবে। কেন্দ্রের কাজ কেন্দ্র করবে। এটাই তো দেশের সংবিধানের নির্দেশ। প্রয়োজনের তাগিদে একে অপরের মুখাপেক্ষী হলে তাতে দোষের কিছু থাকে না। তিস্তা জলবণ্টনের সমস্যা আলোচনায় দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই সফরে মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশ গিয়েছিলেন এবং সেখানকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। একেই বলে সংসদীয় রাজনীতির সৌজন্য। অপরদিকে নীতি আয়োগের বৈঠকে বাংলার বক্তব্য শোনার সময় কেন্দ্রীয় সরকারের ধৈর্য থাকে না।

একবার মাত্র স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তৃণমূল সংসদীয় দল সাক্ষাৎ করে পশ্চিমবঙ্গের নাম বাংলা করার প্রস্তাব আইনসঙ্গতভাবে পেশ করলেও তা কার্যকর বা গৃহীত হয় না। ডানলপ কারখানা রাজ্য সরকার পরিচালনা করার অনুমতি চাইলে কেন্দ্রীয় সরকার তা প্রত্যাখান করে। অথচ এই কর্মচারীদের সাধ্যমতো মাসিক একটা অর্থসাহায্য রাজ্য সরকার নিয়মিত করে আসছেন। এইসব ব্যাপারগুলোতে কেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে? গণতান্ত্রিকভাবে জনসমর্থন নির্বাচিত রাজ্যের সরকার কতটা ধৈর্যের পরিচয় দেবে?

সর্বশেষ স্লোগান উঠছে হিন্দি, হিন্দুস্থান, হিন্দুত্ব। কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে হিন্দু বাঙালি, বাঙালি মুসলমানদের নাম জাতীয় পঞ্জিকরণ তালিকা থেকে বাদ দিয়ে নাগরিকত্ব হরণ করো। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলো একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে। ভায়নক প্রচেষ্টা, সীমাহীন প্রত্যাশা, অলৌকিক পরিকল্পনা জেনেও তৎপরতা নিঃশব্দে অব্যাহত। এমন একটা দিন আনার স্বপ্নে যারা বিভোর তারা চাইবে কেবলমাত্র প্রতিরক্ষা আর বিদেশ এই দু’টি বিষয় থাকুক সরকারি নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষভাবে। বাকি সব চলে যাক ব্যক্তি মালিকানা, বেসরকারি সংস্থার হাতে। আজ যা অবাস্তব বলে মনে হচ্ছে, একদিন তা সত্য না হয়ে দাঁড়ায়। দেশের ইতিহাসকে নতুন করে লেখার (rewritting) জন্য তৎপর বর্তমান শাসকদল।

অতীত, অতীতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভারতবর্ষের সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয় ঐক্য সব কিছুতেই একটি নির্দিষ্ট নতুন ভাবনার পথ ও চিন্তার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা নিশ্চিতভাবে অব্যাহত। সম্প্রতি এই অবহাওয়া প্রবলতর হয়েছে।
একে রোখা যাবে কি না তা বলা দুষ্কর। কিন্তু আজও যদি এই অবস্থাকে প্রতিহত করতে কোনও নামকে সমগ্র দেশের সামনে তুলে আনতে হয়, সেই নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

উন্মুক্ত চিন্তাশক্তি, দেশবাসীর কাছে বিকল্প গ্রহণযোগ্যতা, সম্প্রীতি ও সংহতির প্রতীক, তেজস্বিনী, এই রমণীর নেতৃত্বই পারে এই অবস্থায় থেকে আগামিদিনের সুবিশাল এই দেশকে রক্ষা করতে। সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করাই হবে ভারতবাসীর কাছে, ভারতবর্ষের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। সব দল যদি ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই পথের শরিক হয় তাহলে বহু সংগ্রাম, বহু যুদ্ধ, বহু অতীতকে ফেলে এসে এই স্লোগানকেই আঁকড়ে ধরতে হবে- ‘সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দীর্ঘজীবী হোক।’ দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, ভারতবর্ষের সঙ্গে, ভারতবাসীর সঙ্গে।
জয় হিন্দ। জয় বাংলা।

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial