জনসংযোগে জনতার মাঝে জননেত্রী

মেঘাংশী দাস

নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিন থেকেই জনতা তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী। জনতাই তাঁর অস্ত্র, লড়াইয়ের শক্তির উৎস। রেলমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী, যে পদেই তিনি যখন থাকুন না কেন, সময় পেলেই কাজের ফাঁকে সেই জনতার কাছেই চলে যান তিনি।

বাম জমানায় বেহালার বিষ তেল কেলেঙ্কারি, বানতলার অনিতা দেওয়ান ধর্ষণ কাণ্ড থেকে শুরু করে সিঙ্গুরের তাপসী মালিকের ঘটনা-সাধারণ মানুষের স্বার্থে, দাবি নিয়ে তিনি জনতার সঙ্গী হয়েছিলেন। লাল সন্ত্রাসের দাপটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের চাষিরা ধান রুইতে পারছিলেন না। খবর পেয়েই তিনি ছুটে গিয়ে নিজেই ধানের চারা হাতে নিয়ে কাদামাটির খেতে নেমে রোয়ার কাজ শুরু করেছিলেন। এহেন জননেত্রী মুখ্যমন্ত্রী হয়েও পরপর তিনদিন তিনি মিশে গেলেন হাওড়ার বস্তি থেকে শুরু দিঘার গ্রামের গরিব মানুষের পরিবারের সঙ্গে। শুধু তাই নয়, সৈকত শহরের রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে ঢুকে নিজেই চা বানিয়ে খাওয়ালেন সবাইকে। আশপাশের সবাই তখন বিস্ময়ে দেখছিলেন জনতার মাঝে কীভাবে জননেত্রী মিশে গিয়েছেন। এমনকী, রাজ্য প্রশাসনে শীর্ষ আমলারাও তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে স্বীকার করে নিয়েছেন শুধু ভারতবর্ষ নয়, বিশ্বে মা-মাটি-মানুষের নেত্রীর মতো আর কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নেই। তাই তো তিনি জননেত্রী।

নবান্ন থেকে বেরিয়ে হাওড়ার শরৎ সদনে প্রশাসনিক মিটিংয়ে যাওয়ার আগেই হঠাৎ করে তিনি ঢুকে পড়েন ২ নম্বর রাউন্ড ট্যাঙ্ক রোডের বস্তিতে। একে একে ঘরের পর ঘর ঘুরে বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁদের জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি খোজ নেন বাংলার অগ্নিকন্যা। ঘরের দরজা বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে পেয়ে একই সঙ্গে বিস্মিত ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বস্তিবাসীরা। প্রশাসনকে ঘিরে নিজেদের এতদিনের চাওয়াপাওয়ার তালিকা মুহুর্তে উগরে দেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের কাছে। কেউ বলেন রেশন কার্ড নেই, পাশের বাড়ির পরিবারের চাহিদা পানীয় জল খুবই কম। বর্ষা এলে ঘরে জমা জল ঢুকে পড়ে। ৪০০ পরিবারের জন্য দু’টি মাত্র শৌচালয়। বস্তিবাসীদের এমন অসহায় অবস্থার কথা শুনে ক্ষুব্ধ জননেত্রী হাওড়ার কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন, বস্তির রাস্তা-পানীয় জল-নিকাশির সুরাহা করতে। একটি আলাদা টাস্ক ফোর্সও গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন মা-মাটি-মানুষ সরকারের প্রধান।

‘দিদিকে বলো’ ও ‘জন অভিযোগ সেল’ চালু করার পর একের পর এক সাধারণ মানুষের নানা অভাব-অভিযোগের স্রোত আসতে শুরু করেছে নবান্নের দরজায়। একই সঙ্গে দলের সমস্ত মন্ত্রী ও নিচুতলার জনপ্রতিনিধিদেরও গরিব মানুষের দরজায় পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি। গ্রামে গ্রামে সাধারণ কর্মীদের ঘরে রাত কাটাচ্ছেন বিধায়করা। প্রতিটি ক্ষেত্র থেকেই সাধারণ মানুষের নানা বক্তব্য ও প্রত্যাশার কথা পৌঁছে যাচ্ছে জননেত্রীর কাছে। বরাবর তিনি মানুষের মধ্যে থাকেন। মানুষের কথা শোনেন। এইজন্যই তিনি জনগণমনঅধিনায়িকা। হাওড়ার বস্তি থেকে দিঘার দত্তপুর গ্রাম, স্থানীয় যুবকের চায়ের দোকান, মানুষের কথা শুনতে পৌঁছে গেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বদলে যাওয়া সমুদ্রসৈকতে পৌঁছে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেননি জননেত্রী। সটান চলে গেলেন দিঘার মৈত্রাপুরে মৎস্যজীবী পরিবারের কাছে। জেনে নিলেন সরকারি প্রকল্পের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ঠিকমতো পাচ্ছেন কিনা। প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তিনি যখন ‘কন্যাশ্রী’, ‘রূপশ্রী’ ও ‘সবুজসাথী’ প্রকল্পের পরিষেবা ১০০ শতাংশ বঙ্গোপসাগরের সৈকতের বাসিন্দাদের কাছে সম্পূর্ণ পৌঁছচ্ছে কি, জীবন বিপন্ন করে মাছ ধরতে যাওয়া পরিবারের কাছে যাচ্ছে কি না, ইত্যাদির খবর নিচ্ছিলেন তখন তাকে ঘিরে ছিল কয়েকশো হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ। এই সময় ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকা শিশুদের আদরে-স্নেহে ভরিয়ে দেন মমতাময়ী মুখ্যমন্ত্রী। ব্যাগ থেকে চকোলেট বের করে সবার হাতে একে একে তুলে দেন স্নেহময়ী নেত্রী। আর রং-বেরঙের চকোলেট নেওয়ার সময় বাবা-মায়েদের মতো মুখ্যমন্ত্রীর চারপাশের শিশুরাও সমস্বরে বলছিল, “দিদি…দিদি আমাকে একটা…।”

পরদিনই ওল্ড দিঘা যাওয়ার পথে আচমকাই নেমে পড়েন সায়েন্স সিটির সামনে পরিমল জানার চায়ের দোকানে। সঙ্গে ছিলেন দুই মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং এলাকার দীর্ঘদিনের প্রবীণ সাংসদ শিশির অধিকারী। নেমেই দোকানের ছোট্ট কাঠের বেঞ্চে বসে পড়লেন জনতার প্রিয় নেত্রী। দোকানিকে বললেন, “চিনি কম দিয়ে সবার জন্য চা বানাও তো ভাই।” বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি বছর কয়েক ধরে চায়ের দোকান চালানো পরিমলের। কাটবেই বা কী করে? যাকে এতদিন টিভিতে, কাগজের পাতায় দেখেছেন, দূর থেকে পরম শ্রদ্ধায় তাঁকে সমর্থন করে ইভিএমের বোতাম টিপেছেন সেই জননেত্রী তাঁর দোকানে এসেছেন। ঘরের মেয়ে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের জন্য চা করতে হবে তাঁকে। তাই কিছুটা নার্ভাস হয়ে সসপ্যানে জল চাপিয়ে দরদর করে ঘামতে শুরু করলেন পরিমল। বিষয়টি বুঝতে পেরেই আচলে মুখ মুছে দুম করে বেঞ্চ থেকে উঠে পড়লেন বাংলার অগ্নিকন্যা। এবার সটান দোকানে ঢুকে পড়লেন। বললেন, “ভাই সরো, চা-টা আমিই বানাই।” আমতা আমতা করে ভয়ে পরিমল তখন বলছেন, “দিদি, গরম, ছ্যাঁকা লেগে যেতে পারে।” কথা শেষ হওয়ার আগেই স্নেহমিশ্রিত ধমক দিয়ে জননেত্রী বলে উঠলেন, “ছাড়ো তো…এসব অনেক করেছি। এখনও তো বাড়িতে করি। ও আমি ঠিক করে নেব।” এরপরই সসপ্যানে হাতা নেড়ে চায়ের পাতা ফেলে ফুটিয়ে নিলেন। তারপর কেটলির মুখে ছাঁকনি লাগিয়ে ছেঁকে লিকার তৈরি করে ফেললেন। এবার পাশের মিল্কমেডের কৌটো থেকে দুধ ঢেলে চা বানিয়ে নিলেন কালীঘাটের ৩০বি-র বাসিন্দা। এরপরই বললেন, “কাগজের কাপগুলো এগিয়ে দাও, চা-টা ঢেলে সবাইকে দিই।” স্টিলের থালায় চায়ের কাপ সাজানো হতেই মুখ্যমন্ত্রী বলে উঠলেন, “কই সুব্রতদা, শিশিরদা নিন, শুভেন্দু নাও।” এরপর চায়ের দাম মিটিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন জননেত্রী। সুযোগ বুঝে ঢিপ করে প্রণাম করে ছলছল চোখে আবেগপ্লুত পরিমল তখন জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে মমতাময়ী মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করলেন।

গাড়ি ছুটল ওড়িশা লাগোয়া দিঘা-সীমান্তের দিকে উদয়পুরের রাস্তায়। দিঘার পদিমা-১ পঞ্চায়েতে আদিবাসী পাড়ায় এসে থামল মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়। গাড়ি থেকে নেমেই হনহন করে পায়ে হেঁটে সোজা চলে গেলেন কানু সোরেনের ভাঙা ঘরের দরজায়। সেখানে তথন তাঁর স্ত্রী সীতা সোরেন দুপুরের খাবারে ব্যস্ত। একে একে সীতার কাছ থেকে জেনে নিলেন, সারাদিনে কী করেন, দু-টাকা কেজির চাল পাচ্ছেন কিনা, সবকিছুই। এরপরেই জেলাশাসককে ডেকে বললেন, “ওদের ঘরটা বানিয়ে দিও!” তারপরই পাশে দাঁড়ানো দিঘা-শংকরপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান সাংসদ শিশির অধিকারীকে জানিয়ে দিলেন, ওই আদিবাসী গ্রামের ৭৬টি পরিবারকে পুনর্বাসন দেবে রাজ্য সরকার। এজন্য নবান্ন থেকে তাঁকে সমস্ত সাহায্য দেওয়া হবে। সূর্যের আলো সৈকতভূমির সঙ্গে মিলিয়ে যাওয়ার আগে জননেত্রী একে একে ঘুরলেন গৌরী পাত্র, কুশ রানা, রামি বাস্কেদের মাটি-পাতার ঘরে। জেনে নিলেন রেশন থেকে শুরু করে পানীয় জলের অপ্রতুলতার কথা। আদিবাসী পাড়ার উঠোনে বসে সমস্ত সমস্যা ও আদিবাসীদের আবদার তৎক্ষণাৎ মেটানোর নির্দেশ দিলেন জননেত্রী। তখন তাঁকে ঘিরে ততক্ষণে জমে গিয়েছে আবালবৃদ্ধবনিতার ভিড়। ছোটদের সঙ্গে বড়রাও হাত বাড়িয়ে লজেন্স নিয়েছেন সবার প্রিয় দিদির কাছ থেকে। নিজের গাড়িতে ওঠার প্রস্তুতি নিতেই তাঁকে ঘিরে শুরু হয়ে যায় আবেগরুদ্ধ জনতার জননেত্রী উৎসব-উল্লাস।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial