জনমুখী রাজ্য বাজেট

পূর্ণেন্দু বসু

বিজেপি শাসনে গোটা দেশ যখন দিশাহীনতার কারণে গভীর থেকে গভীরতর সংকটে নিমজ্জিত, তখন পশ্চিমবঙ্গের মা-মাটি-মানুষ সরকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্যের এক নতুন ইতিহাস রচনা করে এগিয়ে চলেছে। এ বছরের (২০১৯-২০) রাজ্য বাজেট হল সেই সাফল্যের এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিগত সাড়ে ৭ বছর ধরে নিরলস-নিরম্তর উন্নয়নের ধারা রাজ্যের প্রতিটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। সেই ধারা বজায় রেখেই এবারের বাজেট রচিত হয়েছে। এককথায়, এই বাজেট তাই জনমুখী। মানুষের জন্য, মানুষের বাজেট।

প্রথমেই বলা দরকার যে, বাংলার পরিকল্পিত উন্নয়ন যাত্রায় রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করে, রাজস্ব ঘাটতি ও আর্থিক ঘাটতি হ্রাস করে মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধি মারফত স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টির যে পথ গ্রহণ করা হয়েছে, রাজ্যের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান ভিত্তি সেটাই। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে সামাজিক ক্ষেত্রে বিপুল ব্যয়বরাদ্দ মানুষের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দারুণভাবে শক্তিশালী করেছে।

রাজ্যে জনমুখী উন্নয়নের কয়েকটি নিদর্শন তুলে ধরা যাক- রাজ্যের খাদ্য উৎপাদন ২০১০-১১ সালে ছিল ১৪৮ লক্ষ ১০ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৭-১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৮২ লক্ষ ৯২ হাজার মেট্রিক টন। খাদ্য গুদামজাত করার ক্ষমতা ছিল ৬৩ হাজার মেট্রিক টন। সেই ক্ষমতা ১৫ গুণ বেড়ে এখন হয়েছে ৯ লক্ষ ১৬ হাজার মেট্রিক টন। কৃষি জমির ক্ষেত্রে খাজনা ও মিউটেশন ফি পুরোপুরি মকুবের ব্যবস্থা করেছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী।

রাজ্যে খাদ্যসাধী প্রকল্পে স্বল্পমূল্যে ৮ কোটি ৮২ লক্ষ মানুষকে কম দামে খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

‘ধান দিন চেক নিন’ প্রকল্পের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যে শস্য কেনার দাম কৃষকদের সরাসরি মেটানোর ব্যবস্থা হয়েছে। রাজ্যের ১ লক্ষ কৃষককে বর্ধিত হারে ১ হাজার টাকা মাসিক পেনশন হিসেবে দেওয়া হচ্ছে।

গত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩২ লক্ষ কৃষক পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকার ১,২০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।

রাজ্যের ‘বাংলা ফসল বিমা যোজনায় ২৪ লক্ষ কৃষককে নথিভুক্ত করা হয়েছে। চাষিদের প্রদেয় প্রিমিয়ামের অংশটিও পুরোপুরি রাজ্য সরকার দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের কারণে, রাজ্যের চাষিদের স্বার্থে, মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এই প্রকল্প পুরোপুরি রাজ্যের তত্ত্বাবধানে চলবে। আর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রদেয় ২০% অংশ রাজ্যই দিয়ে দেবে।

‘জল ধরো জল ভরো’ প্রকল্পের অধীনে বিগত সাড়ে সাত বছরে ২ লক্ষ ৬২ হাজার জলাশয় সংস্কার ও খনন করা হয়েছে।

ডিম উৎপাদনে রাজ্য যাতে স্বনির্ভর হয় সেই লক্ষ্যে পোল্ট্রিক খামারকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য নতুন ইনসেনটিভ স্কিম চালু করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণে হাঁস ও মুরগির ছানা বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। রাজ্যের ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পে ৫২ লক্ষ ৫০ হাজার ছাত্রী নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমানে কন্যাশ্রীর ক্ষেত্রে পারিবারিক আয়ের সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এই প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছে মেয়েরা।

কৃষ্ণনগরে কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে

‘রূপশ্রী’ প্রকল্পে ২০১৮-র ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩২০ কোটি টাকা খরচ করে ১ লক্ষ ২৬ হাজার জন মেয়েকে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

মানবিক প্রকল্পে এখনও পর্যন্ত ২ লক্ষ ৩৫ হাজার মানুষ সুবিধা পেয়েছেন। এর জন্য ব্যয় হয়েছে ১২৬ কোটি ৬৯ লক্ষ  টাকা।

৪২টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা সুলভ হয়েছে।

শিশুমৃত্যুর হার ২০১২ সালের হাজার প্রতি ৩২ থেকে কমে হয়েছে ২৫। প্রসূতি মৃত্যুর হার এখন ১১৩ থেকে কমে ১০১ হয়েছে। প্রসূতি সদনে প্রসবের হার এখন ৯৭.৫ শতাংশ। শিশু চিকিৎসার বিপুল উন্নতি হয়েছে।

এখন রাজ্যের গরিব মানুষজনকে নিখরচায় চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। ২০১৮ সালে এর জন্য ব্যয় হয়েছে ১২৩১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা।

রাজ্য সরকার ১০টি নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং ২৭টি নতুন নার্সিং ট্রেনিং স্কুল স্থাপন করেছে।

রাজ্যে ২ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষকে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে।

বিগত সাড়ে সাত বছরে ৭ হাজার নতুন প্রাইমারি ও আপার প্রাইমারি স্কুল তৈরি হয়েছে। ২৭০০ জুনিয়র স্কুলকে সেকেন্ডারি স্তরে উন্নীত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এই সরকার ছাত্র-ছাত্রীদের ৭কোটি স্কুল ইউনিফর্ম, ১৬ লক্ষ স্কুল ব্যাগ, ৫০ লক্ষ স্কুলে পরার জুতো বিতরণ করেছে।

রাজ্যে ২০১১ সালে সেখানে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এখন সেখানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১৩ লক্ষ ২৪ হাজার থেকে বেড়ে এই সাড়ে ৭বছরে হয়েছে ২০ লক্ষ ৩৬ হাজার।

‘শিক্ষাশ্রী’ প্রকল্পে মোট ৭০ লক্ষ এসসি, এসটি ছাত্রছাত্রী ছাত্রবৃত্তি পেয়েছে।

‘সবুজসাথী’ প্রকল্পের আওতায় মোট ১ কোটি বাইসাইকেল বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে।

সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের ক্ষেত্রেও এই রাজ্য দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। বিগত সাড়ে সাত বছরে বছরে ২ কোটি ৩ লক্ষ সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রী বৃত্তি বাবদ পেয়েছে ৫,২৫৭ কোটি টাকা। এছাড়াও ৮ লক্ষেরও বেশি সংখ্যালঘু মানুষজনকে স্ব-নিযুক্তি প্রকল্পে ১,৩০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। ১০০ দিনের কাজে শ্রমদিবস সৃষ্টিতে বাংলা তৃতীয়বারের জন্য দেশের মধ্যে এক নম্বর স্থান অধিকার করেছে।

গ্রামীণ আবাস তৈরিতে মুর্শিদাবাদ ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করেছে।

গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে আমাদের রাজ্য বিগত সাড়ে সাত বছরে ২৬ হাজার কিমি-র বেশি রাস্তা তৈরি করে দেশের মধ্যে সেরা স্থান দখল করেছে।

‘মিশন নির্মল বাংলা’য় এই রাজ্য ৯৯ শতাংশ গ্রামীণ শৌচাগার নির্মাণ করেছে।

৪০ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন আবাস প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন।

২৪ লক্ষ সদ্যোজাত শিশুর জন্য তাদের মায়েরা ‘সবুজশ্রী’ প্রকল্পের গাছ পেয়েছেন।

৭০ লক্ষ দরিদ্র মহিলাকে সংযুক্ত করে, ৫ লক্ষ ৫০ হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠন করা হয়েছে। তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ সালে এই পরিমাণ ছিল ৬৭৪.৪১ কোটি টাকা।

বিগত সাড়ে ৭ বছরে ১ কোটি ৯০ লক্ষ উপভোক্তার ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে বৃদ্ধির হার দ্বিগুণেরও বেশি।

‘সামাজিক সুরক্ষা যোজনা’য় বিগত ৭ বছরে ১,৩২৪ কোটি ৭৮ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এতে উপকৃত হয়েছেন ২৫ লক্ষ ৮০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ।

কিছু নির্দশন তুলে ধরা আমরা দেখাতে চাইলাম সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হয়, বাস্তবে তা কাজে করে দেখানো হচ্ছে। এর থেকে সরকারের জনমুখী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অর্থনৈতিক মানদণ্ডে রাজ্যের জিডিপি ২০১৮-১৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লক্ষ ৫০ হাজার কোটিতে। আমরা সরকারের আসার সময় রাজ্যের জিডিপি ছিল ৪ লক্ষ ৬১ হাজার কোটি টাকা।

রাজ্যের জিডিপি বৃদ্ধির হারে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বাংলা ১ নম্বর স্থান অধিকার করেছে।

২০১৭-১৮তে ভারতের শিল্পে বৃদ্ধির হার ৫.৫৪ শতাংশ। বাংলার শিল্পে বৃদ্ধির হার ১৬.১৯ শতাংশ। যা ৩ গুণেরও বেশি।

একইভাবে আর্থিক ঘাটতি ৪.২৪ শতাংশ থেকে নেমে হয়েছে ২.৮৩ শাতাংশ (২০১৭-১৮ সালে)।

রাজ্যের কর বাবদ আয় ২১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭-১৮ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আড়াই গুণেরও বেশি।

মা-মাটি-মানুষ সরকার ২০১১ সাল থেকে পরিকল্পনা খাতে ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। মূলধনী খাতে ৯২ হাজার কোটি টাকা সামাজিক সম্পদ সৃষ্টি ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যয় করেছে রাজ্য সরকার।

অর্থনৈতিক মানদণ্ডের বিচারে এই চিত্রটি যথেষ্ট মাত্রায় ইতিবাচক এবং জনস্বার্থবাহী। এবারের বাজেটে নতুন প্রকল্প হিসেবে চালু হয়েছে ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্প। রাজ্যের ৭২ লক্ষ কৃষক ও ভাগচাষি যাঁদের জমির পরিমাণ ১ একর, তারা ২ কিস্তিতে বার্ষিক সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা অনুদান পাবেন। জমির পরিমাণ কম হলে ন্যুনতম ১ হাজার টাকা করে দু’কিস্তিতে চাষিদের অনুদান দেওয়া হবে।

এছাড়া মৃত্যুর পর চাষির পরিবার এককালীন ২ লক্ষ টাকা সহায়তা পাবে। সারা দেশে কৃষি ও কৃষকের সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনা, বাংলার চাষিদের রক্ষা করবে। প্রকৃত অর্থেই রাজ্য সরকার কৃষক বন্ধুর ভূমিকা পালন করছে।

উল্লেখ্য যে, শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের স্বরোজগারের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকার প্রতি বছর আরও ৫০ হাজার যুবক-যুবতীকে এককালীন ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেবে।

অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকাদের অনারিয়াম বৃদ্ধি করা হয়েছে মাসিক ৫০০ টাকা। এর ফলে ২ লক্ষ ১০ হাজারেরও বেশি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা উপকৃত হবেন।

আশাকর্মীদের ভাতাও আরও ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে ৫০ হাজারেরও বেশি আশাকর্মী উপকৃত হবেন।

চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ ডি ও গ্রুপ সি কর্মীদের মাসিক পারিশ্রমিক আরও  হাজার টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বহু কর্মী উপকৃত হবেন। সংখ্যাটা সব মিলিয়ে প্রায় ১ লক্ষের মতো।

চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের এক্সগ্রাসিয়া ২ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লক্ষ করা হয়েছে এবারের বাজেটে। প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের কথা ভেবে, গরিবদের কথা ভেবে রাজ্য সরকার বাজেট পেশ করেছে।

তাই সব দিক বিচার করেই এই রাজ্য বাজেটকে জনমুখী বাজেট বলা হচ্ছে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers