জননেত্রীর উন্নয়ন মন্ত্রে পাল্টে গিয়েছে বাংলা

শুভাশিস চক্রবর্তী

১৯৮৪ সাল। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত। গোটা ভারতবর্ষজুড়ে চলছে অস্থির পরিস্থিতি।এদিকে শিয়রে লোকসভা নির্বাচন। ভারতবর্ষের অন্যান্য লোকসভা কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থীর মোটামুটি ঠিক হয়ে গেলেও দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী ঠিক করতে গিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের হিমশিম অবস্থা। অবশেষে কংগ্রেস হাইকমান্ডের নির্দেশে প্রার্থী করা হলো পশ্চিমবঙ্গের যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। 

এটিকে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বেশ কয়েকবারের জেতা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ সিপিএমের সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। মমতা দিদি কিন্তু নির্ভীক চিত্তে ঝাঁপিয়ে পড়লেন নির্বাচনী ময়দানে। আয়তনে বিশাল যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিটি বিধানসভা, প্রতিটি অঞ্চল, প্রতিটি পাড়ায় ঘুরে ঘুরে আমাদের নিয়ে প্রচার সারলেন তিনি। বাংলায় তখন সিপিএমের অত্যাচার ও অবিচার এর রাজত্ব। দলদাস কমরেড, হার্মাদদের অত্যাচারে আমাদের কর্মী-সমর্থকরা তখন অনেকেই ঘরছাড়া। কিন্তু জনগণের নেত্রী, আমাদের দলনেত্রী মানুষকে সঙ্গে নিয়েই জিতে নিলেন যাদবপুরের ভোটারদের হৃদয়। বিপুল ভোটে জয় যুক্ত হলেন তিনি।যাদবপুরের মানুষের মূল উদ্বাস্তু সমস্যা ও অন্যান্য সমস্যা পার্লামেন্টে তুলে ধরতে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। ধীরে ধীরে বেকার যুবকদের স্বনির্ভর করার জন্য ব্যাঙ্কের মাধ্যমে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করে তিনি হয়ে উঠলেন বাংলার অবিসংবাদী নেত্রী। তবে শুধু সংসদে এলাকার দুঃখ-দুর্দশার প্রতিকার দাবি করেই থেমে থাকেননি তিনি। সঙ্গে সঙ্গে নিরলস লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন অত্যাচারী সিপিএমের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। ফলস্বরূপ বহুবার তাঁকে প্রাণে মারার চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু ঈশ্বরের আশীর্বাদে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন জননেত্রী জনগণমন অধিনায়িকা। তিনিই প্রথম আওয়াজ তুলেছিলেন ‘নো আইডেন্টিটি কার্ড -নো ভোট’। একটা সময় পশ্চিমবঙ্গে পরিচ্ছন্ন নির্বাচন-প্রক্রিয়া মানুষ ভুলতে বসেছিল। সিপিএম হার্মাদদের রক্তচক্ষুর ভয়ে বুথমুখো হতে পারতেন না ভোটাররা। যাঁরা বুথ পর্যন্ত যেতে পারতেন গিয়ে দেখেতেন তাঁর ভোট পড়ে গিয়েছে। বহু জায়গায় বহু বুথে কংগ্রেস পোলিং এজেন্ট দিতে পারত না। কংগ্রেস করার অপরাধে আমাদের বহু কর্মীর হাত কেটে নেওয়া হয়েছে,চোখে লোহার শিক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিরকালের মতো পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে বহু কর্মীকে। আর সিপিএম হার্মাদদের হাতে কত কর্মী যে খুন হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। যাইহোক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তাঁর নীতি থেকে সরে যাননি। সারা বাংলায় যেখানে যেখানে সাধারণ মানুষও কংগ্রেস কর্মীরা অত্যাচারিত, নিপীড়িত হয়েছেন সেখানেই তিনি ছুটে গিয়েছেন প্রতিবাদ জানাতে। তবে শুধু প্রতিবাদী থেমে থাকেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। নরসিমা রাও মন্ত্রিসভায় ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ দফতরের দায়িত্ব পেয়ে তিনি ক্রীড়াক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ কর্ম করেন। ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের কিছু ব্যক্তির জন্য পদে পদে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হচ্ছিল যুব কংগ্রেস সভানেত্রীকে। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তিনি গঠন করলেন নতুন দল ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’। আমরা, যারা দিদির রাজনৈতিক জীবনের প্রায় শুরু থেকে তাঁর অনুগত সৈনিকের ভূমিকায় ছিলাম, তারা কংগ্রেস ত্যাগ করে। দিদির কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়তে তাঁর নবগঠিত দলে জড়িয়ে পড়লাম। তৃণমূল কংগ্রেস নানা হুমকি, অত্যাচার সহ্য করেও সংসদীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করল। পরে কিছুদিনের জন্য রেলমন্ত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার রেল মানচিত্রে বিপুল উন্নতি ঘটান। কিছুদিনের মধ্যে অবশ্য কেন্দ্র সরকারের কিছু কাজকর্মে বিরক্ত হয়ে রেলমন্ত্রীত্ব হেলায় ছুড়ে ফেলেন তিনি। ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গে সংগঠন বাড়ানোর কাজে মনোনিবেশ করলেন নেত্রী। অচিরে জেলায় জেলায়, ব্লকে ব্লকে তৃণমূল স্তর থেকে সংগঠন গড়ে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বুকে ৩৪ বছর ধরে গেড়ে বসা জগদ্দল পাথর বামফ্রন্টকে সর্বস্তরের মানুষের আশীর্বাদ ও  সমর্থনে পরাস্ত করলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের অনুন্নত জেলাগুলিতে উন্নয়নের আলো পৌঁছে দিতে সচিবালয়কে জেলা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছেন তিনি। অবহেলিত উত্তরবঙ্গে গড়ে তুলেছেন সচিবালয় ‘উত্তরকন্যা’। 

২০১১ তে বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেস সরকার আসিন হওয়ার পর বাংলার মানুষ আজ বিনা চিকিৎসায় মারা যায় না। জেলায় জেলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল গড়ে জননেত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্ন, – সংবিধান বর্ণিত নাগরিকদের প্রাথমিক চাহিদাটুকু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যথাযথভাবেই পাচ্ছেন। গরিব, দুঃস্থ মানুষদের জন্য ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকানে স্বল্পমূল্যের জীবনদায়ী ওষুধ আজ মুমূর্ষুর প্রাণ বাঁচাচ্ছে। মা-মাটি- মানুষের নেত্রীর এই  উন্নয়ন প্রকল্প ভারতের অন্যান্য রাজ্যও আজ অনুকরণ করছে সেই রাজ্যের সরকার। মা-মাটি- মানুষের নেত্রী, জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প সারা বিশ্বে প্রশংসিত। এর সঙ্গে রয়েছে স্কুল পড়ুয়াদের জন্য ‘সবুজ সাথী’ প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল পড়ুয়া আজ আর স্কুলছুট নয়। ‘সবুজ সাথী’-র সাইকেলে আজ তারা স্কুলমুখী। পাহাড়ে জিটিএ গঠন, পর্যটনের নতুন নতুন স্থান নির্বাচন জননেত্রীর উন্নয়নের নজির। বারুদের গন্ধ বলে পাহাড় আজ কর্মচঞ্চল। পাহাড় থেকে সাগর যোগাযোগের সড়কপথ তৃণমূল সরকারের সময়েই আরও সুগম ও মসৃণ হয়েছে।  কলকাতা আজ আর বিদেশি বা প্রবাসীদের নাক কোঁচকানোর পর্যায়ে নেই। কলকাতা আজ বহু পর্যটকেরই তালিকায় অন্যতম নাম। গ্রামের লোকশিল্পী, বাউল সম্প্রদায়ের শিল্পীদের ভাতার ব্যবস্থা করে জননেত্রী বাংলার লোকসংস্কৃতিকে পুনরায় উজ্জীবিত করেছেন। দুস্থ প্রবীণ চলচ্চিত্রশিল্পীদের সম্মাননা প্রদান মাসিক ভাতার ব্যবস্থা চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের জন্য মানবিক প্রকল্প গ্রহণ করে মা- মাটি-মানুষের নেত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি প্রকৃতই জনগণের সরকার পরিচালনা করেন।

জননেত্রীর আর একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হল ‘শারদোৎসব’ কে বস্তুতই সর্বজনীন করে তোলা। কলকাতা দুর্গাপুজো দেখতে আজ কলকাতায় ভিড় জমান অন্য রাজ্য অন্য দেশের বহু মানুষ।  নেত্রীর অনুপ্রেরণায় কলকাতার বিভিন্ন বারোয়ারি পুজো কমিটিগুলিও মেতে উঠেছে এক সুস্থ প্রতিযোগিতায়। আর এদের পৃষ্ঠপোষকতায় এসে গিয়েছে বহু নামকরা শিল্প সংস্থাও। আর যাঁরা ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখতে পারেন না, তাঁদের জন্য নেত্রী ব্যবস্থা করেছেন পুজো কার্নিভাল। কলকাতার রেড রোডে শোভাযাত্রা সহকারে কলকাতার শ্রেষ্ট পুজো কমিটিগুলির প্রতিমা দেখার সুযোগ আজ রাজ্যবাসী পেয়ে গিয়েছেন। 

এছাড়াও আমাদের জনপ্রিয় নেত্রী তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিক কিংবা জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কারও কোনও অনুযোগ- অভিযোগ থাকলে তা নির্ভাবনায় বলার জন্য চালু করেছেন ‘দিদিকে বলো’ । নির্দিষ্ট একটি ফোন নম্বরে সরাসরি অভিযোগ লিপিবদ্ধ করতে পারবেন যে কেউ। প্রশাসনকে স্বচ্ছ ও কর্মমুখী করতে এমন প্রচেষ্টা ভারতের আর কোনও মুখ্যমন্ত্রী করেছেন বলে আমি অন্তত মনে করতে পারছি না। 

জননেত্রীর অন্যতম পদক্ষেপ ‘জল ধরো জল ভরো’। ধীরে ধীরে পৃথিবীতে জল-সংকট যে মারাত্মক আকার ধারণ করছে তার প্রতিকারের ‘জল ধরো জল ভরো’ প্রকল্প অনেকটাই সুরাহা দিতে পারে।

স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন বাংলার মা-বোনেরা। ‘বাংলার বাড়ি’, ‘নিজ ভূমি নিজ গৃহ’,  ‘আমার ফসল আমার গোলা’, ‘ জল তীর্থ’, ‘সবুজ শ্রী’, বিবাহযোগ্য কন্যার বিবাহের জন্য ‘রূপশ্রী’, মৃত ব্যক্তির সৎকারের জন্য ‘সমব্যথী’ প্রকল্প নিঃসন্দেহে জননেত্রীর উন্নয়নের অন্যতম পদক্ষেপ। 

পশ্চিমবঙ্গ স্বনির্ভর সহায়ক প্রকল্প  আজ কর্ম দ্যোগী যুবক যুবতীদের রোজগারের পথ খুলে দিয়েছে। মা-মাটি- মানুষের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানুষের কল্যাণে গৃহীত আরও অনেক প্রকল্প স্থানাভাবে লিখতে পারলাম না। ভবিষ্যতে আরও বিশদে লেখার ইচ্ছে রইল। শেষ করব একটি কথাই বলে, সারা ভারত এমনকী সারা বিশ্বে মমতাদির তুলনা একমাত্র তিনিই। জোর গলায় তাই একথা আমরা বলতেই পারি, উন্নয়নের আর এক নাম- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial