জনতার সংগ্রাম চলবে…

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাব বিভিন্ন দেশের উত্থান আমার পতনও। যেমন রোমের কথা মনে করুন, রোমের জাতীয় লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্য চূর্ণ হয়ে বিস্তার। যে মুহূর্তে সাম্রাজ্যবাদে বাধা পড়ল অমনি রোম চূর্ণ-ধ্বংস হল। গ্রিসের আদর্শ ছিল বুদ্ধিবৃত্তি। যে মুহূর্তে বুদ্ধির ক্ষেত্রে সংকট দেখা দিল গ্রিসও অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল। ঠিক এই অবস্থাই স্পেন ও অন্যান্য দেশগুলির হয়েছে। কিন্তু আমাদের মাতৃভূমি ভারতবর্ষে সেই প্রাণশক্তি আজও অব্যাহত। এই প্রাণশক্তি ভারতবাসী কখনও ত্যাগ করেনি। শত সহস্র ঘৃণ্য কুসংস্কারে ভারতবর্ষ পূর্ণ। তাতে কিছু যায় আসে না। জাতীয় প্রবাহ ও জীবনের উদ্দেশ্য আজও তেমনই আছে।

আমার একথা বলার উদ্দেশ্য স্বাধীনতার ৭০ বৎসর পর ভারত  সরকার অসমে নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করল। এই বিজেপি পরিচালিত সরকার এই দেশটাকে জানে না বা চেনে না অথবা ইচ্ছা করেই দেশটাকে আবার টুকরো কারবার জন্য এসব করছে। দেশ বিভাগের পূর্বে এবং পরে  ভারতের নেতৃবৃন্দ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ভারত পূর্ব পাকিস্তানের কোনও বাস্তুত্যাগীকে পরিত্যাগ করবে না। তাই দেশ বিভাগের পরবর্তীকালে যখনই সীমান্তের ওপারে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তখনই বাস্তুহারার স্রোত প্রবাহিত হয়ে এসেছে অসম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গে। তারা হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ। আমরা দেখেছি খালিস্তানের দাবিতে পাঞ্জাবের পবিত্র স্বর্ণমন্দির উগ্রপন্থীদের সমর ঘাঁটিতে পরিণত হওয়া। দেখেছি বিদেশি বিতাড়নের নামে All Assam Students union (AASU) আর অসম গণ পরিষদের হাত মেলানো। এই সেদিনকার গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের নামে চরম বিশৃঙ্খলা। বিছিন্নতাবাদ বলুন আর সন্ত্রাসবাদ বলুন এগুলি মানুষ্যসৃষ্ট সমস্যা। এগুলির শ্রষ্টা যেমন মানুষ, এগুলির হাতে। রাজনৈতিক ফায়দা তোলা নয় সর্বাগ্রে চাই জাতীয় সংহতির পক্ষে বিপজ্জনক এই সমস্যাগুলির সমাধানগুলির সমাধানকল্পে প্রকৃত সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা, যা আমাদের বর্তমান ভারত সরকারের দায়িত্ব যাঁরা আছেন তাঁদের মধ্যে সামান্যটুকুও নেই। না হলে এইভাবে দলিতদের মারতে পারে। গোমাংস বহন করছে বলে পিটিয়ে নির্মমভাবে মানুষকে খুন করতে পারে। সংবিধান ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বঞ্চনা ও শোষণের অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মধ্যস্থতায় সার্বিক জাতীয় উন্নয়ন ও সচ্ছলতার জোয়ার আনাই হোক সকলের সাধারণ লক্ষ্য।

আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাংলার উন্নয়ন আজ বিশ্ববন্দিত। এখানে ‘খাদ্যসাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২ টাকা কিলো দরে চাল ৮ কোটি ৬৬ লক্ষ মানুষের অর্থাৎ রাজ্যের ৯০.৬ শতাংশ মানুষ পায়। ‘গীতাঞ্জলি’ প্রকল্পের মাধ্যমে সুনিশ্চিত আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ‘নিজভূমি নিজগৃহ’ ভূমিহীন রিদ্র মানুষের স্থায়ী আশ্রয়। বাংলার মানুষের সেবায় আরও কত প্রকল্প শিক্ষাশ্রী, সবুজসাথী, যুবশ্রী, গতিধারা, স্বাস্থ্যসাথী, মাভৈঃ, স্বামী বিবেকানন্দ স্বনির্ভর কর্মসংস্থান, মুক্তিধারা ইত্যাদি ইত্যাদি। হিন্দু, মুসলিম, জৈন, শিখ, খ্রিস্টান ভেদাভেন নয়। সবই বাংলার মানুষের সেবায়।

দেশে একমাত্র নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির  গেরুয়া সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রথম দিন থেকেই লড়াই করছে। নোটবন্দি বলুন, GST বলুন, আর FRDI বিল, সবের বিরুদ্ধে তৃণমূলের লড়াই অব্যাহত। নোটবন্দি করে কালো টাকা উদ্ধার হবে বলে মোদিজি বলেছিলেন। কিন্তু আমরা তার উল্টোটা দেখালাম, বিজেপির কালো টাকাকে সাদা করবার জন্য এই নোটবন্দি, উদাহরণস্বরূপ বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আমেদাবাদের যে সমবায় ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর, মাত্র পাঁচ দিনে সেই ব্যাঙ্কে জমা পড়েছিল ৭৪৫ কোটি ৫৮ লক্ষ টাকার বাতিল নোট। দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছে গুজরাতের রাজকোট জেলা  সমবায় ব্যাঙ্ক।এই ব্যাঙ্কে জমা করা বাতিল নোটের পরিমাণ ৬৯৩ কোটি ১৯ লক্ষ টাকা। এই ব্যাঙ্কের চেয়ারমান বর্তমান গুজরাত সরকারের অন্যতম মন্ত্রী জনেশ ভাই রাদাদিয়া, এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে। RBI-এর প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন এর বিরুদ্ধে বলেছিলেন, “প্রুধানমন্ত্রীর হঠকারিতা”। তৃণমূল কংগ্রেস GST-র বিরোধী নয়; যেভাবে GST লাগু করা হয়েছে তৃণমূল তার বিরোধী। আর FRDI বিল প্রত্যাহারের দাবিতে তৃণমূল কংগ্রেসের আন্দোলন চলছে চলবে। সাধারণ মানুষের কঠোর পরিশ্রমের সঞ্চয় ব্যাঙ্কে রাখলে তা মোদিজির সফরসঙ্গী ধনকুবের নীরব মোদিরা হাজার হাজার কোটি টাকা লুঠ করবে, তার বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম চলবে। সাধারণ মানুষের টাকা জালিয়াতি করা হয়েছে, আমরা কিছুতেই ছাড়ব না। কোনও শক্তি আমাদের লড়াইকে থামাতে পারবে না।

রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মীর জীবনাদর্শে আজ চরম বিভ্রান্তি এসেছে। রাজনীতি পেশা নয় জনসেবার আদর্শ, আদর্শ শুধু বুলি নয়, শুধু সমাজ জীবনের জন্য নয়, ব্যাক্তি জীবনের আচার ব্যাবহারের  মধ্যে সঙ্গতিবিধান সম্ভব হলেই সত্যিকার রাজনৈতিক কর্মী হওয়া সম্ভব । বলিষ্ঠ যুব আন্দোলনের জন্য আগামী দিনে বলিষ্ঠ জাতীয় জীবন রচনা করতে হবে।

যুবকদের সামনে যদি নতুন সমাজবাদী সমাজ রচনার জীবন্ত আদর্শ প্রদীপ্ত ভাস্করের মতো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে থাকে এবং গঠনমূলক কর্মসূচির পথে যুব আন্দোলন সমাজবাদী মানুষ গড়ার সাধনায় আত্মনিয়োগ করে তবেই আগামী দিনে বলিষ্ঠ যুব আন্দোলন সম্ভব। চির-উদ্দামধর্মী যৌবন শক্তিকে নতুন সমাজ গঠনের গঠনমূলক কর্মসূচিতে প্রবাহিত করতে হবে। জাতীয় জীবনের জীবন্ত আদর্শ ও আত্মগঠনের সুষ্ঠু কর্মপন্থার আমন্ত্রণ পেলে যুব প্রাণ আলোকের সহস্রশিখায় সুদীপ্ত হয়ে উঠবে, এ চিন্তা ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর’।আর স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, “যুবকদের যদি আত্মনির্ভরশীল হতে শেখানো না যায়, তবে জগতের সমগ্র ঐশ্বর্য ভারতের একটা ক্ষুদ্র গ্রামের পক্ষেও পর্যাপ্ত হবে না। আমাদের কাজ হওয়া উচিত প্রধানত শিক্ষাদান এবং চরিত্র ও বুদ্ধিবৃত্তির উৎকর্ষ সাধনের শিক্ষাবিস্তার”।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial