জওয়ানদের আত্মত্যাগ নিয়ে রাজনীতি বিজেপির, তীব্র প্রতিবাদ বিরোধীদের

মেঘাংশী দাস

দেশের স্বার্থে কাশ্মীর সীমান্তে জওয়ানদের আত্মত্যাগকে ঘৃণয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি ও তাদের নেতা নরেন্দ্র মোদি। বিজেপির মনে রাখা উচিৎ দলীয় স্বার্থের চেয়েও দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেনার সাফল্যকে নিজেদের সাফল্য বলে যারা প্রচার করছে, তারা অমানবিক কাজ করছে। এভাবেই নয়াদিল্লিতে জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিরোধী ২১ দলের বৈঠকে সেনার ভূমিকাকে ছোট করে দেখিয়ে শাসক দলের গুরুত্বকে তুলে ধরার বিরুদ্ধে তুমুল সমালোচনা করলেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সাংসদ ভবনের লাইব্রেরিতে বিরধীদের প্রায় তিন ঘন্টার বৈঠক শেষে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “অনেক হয়েছে, এবার আমাদের দৃঢ় হতে হবে। রক্ষণাত্মক হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। পুলওয়ামা বা বায়ুসেনার অভিযান নিয়ে আমরা সবাই দেশের জওয়ানদের পাশে রয়েছি। তাঁদের ভূমিকা আমাদের গর্বিত করেছে।” এরপরই জননেত্রী কেন্দ্রের শাসকদলের সীমান্ত নিয়ে সেনার সাফল্যকে নিজেদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তৃণমূলনেত্রী বলেন, “বিজেপি উগ্র দেশপ্রেমের রাজনীতি করছে। এইভাবে পুরো বিষয়টি দলের স্বার্থে ব্যবহার করতে চান মোদি। তা হতে পারে না। সাফল্য বায়ুসেনার। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই ও প্রতিক্রিয়া সবারই সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা প্রয়োজন। আমরা সবাই সেনা জওয়ানদের লড়াইকে শ্রদ্ধা করি।”

পুলওয়ামা কান্ডের পর থেকেই কেন্দ্রের শাসক দল কার্যত দলীয় স্বার্থে শহিদ জওয়ানদের আত্মত্যাগকে রাজনীতিকরণ করে প্রচারে নেমে পড়েছে। স্পষ্টতই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদকে কাজে লাগানোর চেষ্টা শুরু হয়। এ নিয়ে সবার আগে সরব হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাংসদের বৈঠকে জননেত্রী বলেন, “দেশের জন্য প্রাণ দিচ্ছেন জওয়ানরা। আর সেটা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে স্ট্রং প্রতিবাদ হওয়া দরকার। সবাই মিলে প্রতিবাদ করুন।” ঠিক এইভাবেই এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-সহ বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হল দেশের অধিকাংশ বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। একুশটি রাজনৈতিক দল প্রায় তিন ঘন্টা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করার পর এক যৌথ বিবৃতিতে দেশের সেনা জওয়ানদের আত্মত্যাগকে কুর্নিশ জানিয়েছে। পাশাপাশি, বিরোধীরা খুবই উদ্বিগ্ন শহিদদের বলিদানের রাজনীতিকরণ নিয়ে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রধানমন্ত্রী সরবদলীয় বৈঠক করলেন না দেশের চিরাচরিত গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য মেনে। অথচ, বিরোধীরা জানিয়ে দিয়েছে তারা পুলওয়ামা কান্ডের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশেই রয়েছে।

বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির এই বৈঠক আগেই ডাকা হয়েছিল। ইস্যু ছিল ভিন্ন। ঠিক ছিল এই বৈঠক থেকে আসন্ন লোকসভা ভোটে বিজেপির বিরুদ্ধে জোট গঠন ও নূন্যতম কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ রেখা পারিয়ে ভারতীয় বায়ুসেনার বদলা ও তারপর দুই দেশের সীমান্তে যুদ্ধের পরিবাশ পরিস্থিতির পরিবর্তন করেছে। ফলে বদলে যায় বৈঠকের অভিমুখ। শ্রদ্ধা জানানো হয়য় পুলওয়ামায় শহীদ ৪৪ জন সিআরপিএফ জওয়ানকে। গত দু-তিন বছর ধরে জাতীয় স্তরে বিজেপি বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মূলত তাঁরই উদ্যোগে যে ২১ দলের এই বৈঠক তা কার্যত স্বীকার করে নেন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু থেকে শুরু করে আরজেডি নেতা তেজস্বী এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালরা। সকলেই একবাক্যে বলেন, সীমান্ত ইস্যুতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষপাতী সবাই। এই ইস্যুতে সরকারের পাশে রয়েছে। কিন্তু সরকারের চেয়েও দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে বিজেপির শীর্ষ নেতারা যেভাবে জওয়ানদের আত্মত্যাগ ও সাফল্যকে পার্টির প্রচারে ব্যবহার করছে তা ন্যক্কারজনক।

সব বক্তাই মা-মাটি-মানুষের নেত্রীর কথা মেনে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও কার্যত তৃণমূল নেত্রীর সুরেই বিজেপি নেতৃত্বকে আক্রমণ করেন। সভায় ঠিক হয়য় আলাদাভাবে নয়, যৌথ বিবৃতি দেওয়া হবে। সভায় ছিলেন মনমোহন সিং, সোনিয়া গান্ধী, শরদ পাওয়ার, চন্দ্রবাবু নায়ডু, শরদ যাদব প্রমুখ। বৈঠকে আলোচনায় বসেছিলেন কংগ্রেস, তৃণমূল, টিডিপি, সিপিএম, বসপা, এনসিপি, আরজেডি, ডিএমকে, এলজেডি, আপ, সিপিআই, জেডি(এস), জেএমএম, এইচএএম, টিজেএস, এনপিএফ, কেরল মনি কংগ্রেস, আইইউএমএল ও স্বাভিমানি পক্ষ পার্টি। বৈঠকের শুরুতে শহিদ জওয়ানদের আত্মার প্রতি এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বিরোধীরা ঠিক করেছে, জোট গঠনের কাজ রাজ্যে রাজ্যে যেমন চলছে চলবে। সীমান্তে উত্ত্বজনার উপর নজর রাখা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বৈঠক হবে। একইসঙ্গে জওয়ানদের আত্মত্যাগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি যাতে কোনও ফায়দা তুলতে না পারে, তার বিরুদ্ধেও এবার চলবে প্রচার।

বিবৃতিটী সংবাদ মাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন রাহুল গান্ধী। পাশে ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু। শুরুতেই পুলওয়ামা কান্ডকে ‘পাকিস্তান স্পনসরড জৈশ-ই-মহম্মদের জঙ্গিবাদ’ বলে তীব্র সমালোচনা করা হয়। ২৬শে ফেব্রুয়ারি নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ভারতীয় বায়ুসেনার বদলার প্রবল প্রশংসা করা হয়। একইসঙ্গে পাকিস্তানের হানার পালটা আক্রমণ করতে গিয়ে নিখোঁজ মিগ২১ বাইসনের পাইলট অভিনন্দন বর্তমানকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধী নেতারা। শেষ পর্বে ফের একদফা কেন্দ্রকে সতর্ক করে বলা হয়য়, দেশের ঐক্য, সংহতি, সার্ব্বহৌমত্ব রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে।

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers