ছ’বছরের সর্বনিম্ন জিডিপি-র জন্য মূল দায়ী কাঠামোগত সমস্যা-খরচের শ্বেতপত্র চাই

ডঃ দেবণারায়ণ সরকার 

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন (কর্মফল), “সামনে একটা পাথর পড়লে যে লোক ঘুরে না গিয়ে সেটা ডিঙিয়ে সংক্ষেপ করতে চায়-বিলম্ব তারই অদৃষ্টে আছে।” ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্থ এক ধাক্কায় বাতিল করে দেশে জাল টাকা কালো টাকা ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের যে সংক্ষিপ্ত রাস্তা মোদি তৈরি করতে চেয়েছিলেন তাতে অর্থনীতি এমনভাবে তছনছ হয়েছে যে, কবে যে অর্থনীতির অবস্থা পুনরুদ্ধার হবে তা কেউই বলতে পারছে না। বরং অর্থনীতির অবস্থা আরও খারাপতর হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারিভাবে বলা হয়েছিল বেকারত্ব গত ৪৫ বছরে সর্বনিন্ন। এবারে মনে হচ্ছে স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতবর্ষে বর্তমান বেকারত্বই সর্বোচ্চ। বাজারে চাহিদা নেই, বিক্রি নেই, নতুন লগ্নি আসছে না, কৃষিক্ষেত্র চরম দুর্বিপাকে। এর মধ্যে গত শুক্রবার সরকারি পরিসংখ্যান দফতর জানাল মোদির আমলে বর্তমান অর্থ বছরের গত ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধির হার সর্বনিন্ন। এপ্রিল-জুনের ত্রৈমাসিকে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার গত ছয় বছরে সর্বনিম্ন-মাত্র ৫ শতাংশ। কলকারখানার উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ০.৬ শতাংশ এবং সেটাই জিডিপি হ্রাসের প্রধান কারণ। কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। গত শুক্রবার সরকারি পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট, চাহিদা হ্রাসের কারণে মূলত বাজারে কেনাকাটা কমাই দেশে আর্থিক বৃদ্ধি গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিন্ন। এই খরচ বেড়েছে মাত্র ৩.১ শতাংশ। গত ৫৪ মাসে এত খারাপ অবস্থা আসেনি। লগ্নি যে আসছে না তার প্রমাণ নতুন মুূলধনে ৪% খরচ বৃদ্ধি। কারখানার উৎপাদন ১ শতাংশেরও কম বৃদ্ধি এর প্রধান কারণ। সরকারের পরিসংখ্যান দফতরের বর্তমান হিসাব নিয়েও প্রশ্ন যথেষ্ট রয়েছে। কিছুদিন নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রাক্তন মুখ্য উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যমনই বলেছিলেন, আসলে ভারতের গড় জিডিপি বৃদ্ধি সরকারি পরিসংখ্যানের থেকে আরও ২.৫ শতাংশ কম। এই হিসাব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটিকে নাকচও করতে পারেননি কোনও অর্থনীতিবিদ।

এই গবেষণাপত্র অরবিন্দবাবু পেশ করেছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকেই এই হিসাবের সূত্র ও তথ্য অস্বীকারও করতে পারেননি। এটিকে ধরলে বর্তমান ত্রৈমাসিকে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধি দাড়াবে মাত্র ২.৫ শতাংশ। বিজেপি বোঝানোর চেষ্টা করছে, অর্থনীতির এই ওঠানামা স্বাভাবিক কারণে। কিন্তু ফিচ-সহ বড় বড় রেটিং সংস্থা-সহ অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের মতে, দেশের আর্থিক বৃদ্ধি-সহ এত শোচনীয় অবস্থার মূলে শুধু ওঠানামা নয়। এর পিছনে মূল সমস্যা কাঠামোগত। গৃহস্থের সঞ্চয়ের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ফলে কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে ২০১১-১২ অক্টোবরে গৃহস্থের সঞ্চয় ছিল জিডিপির ২৩.৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে এটি কমে দাঁড়িয়েছে ১৭.২ শতাংশ। বর্তমানে যে আরও কমেছে তা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিন্ন জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। অর্থমন্ত্রকের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা জি সুব্র্যহ্মণমও মেনে নিয়েছেন, বৃদ্ধির হারে ঝিমুনি এসেছে। তাঁর দাবি, সরকার গাড়ি, ব্যাঙ্ক, বিদেশি লগ্নিতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ এনেছে। প্রধানমন্ত্রীর আর্থির উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেক দেবরায়ও জানান, অর্থনীতির ওঠা-নামার সমস্যা ও কাঠামোগত সমস্যা দূর করতে সরকার পদক্ষেপ করছে। ব্যাঙ্কের সংযুক্তির ক্ষেত্রেও গত শনিবার দাওয়াই হিসেবে দশটি ব্যাঙ্ককে সংযুক্ত করে চারটিতে আনা হল।

দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা ১৮ থেকে কমে ১২তে নেমে আসবে। এর ফলে সরকারের দাবি অনুযায়ী ঋণের বোঝায় দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাঙ্কগুলিতে সরকার যে পুঁজি ঢালছে তা আরও ভালভাবে কাজে লাগানো যাবে। সরকারের দাবি, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে যে ৭০ হাজার কোটি টাকা ঢালা হবে ব্যাঙ্ক সংযুক্তির ফলে ওই অর্থ আরও দক্ষভাবে কাজে লাগানো যাবে। কিন্তু, প্রশ্ন অন্যত্র। একদিকে ব্যাঙ্কগুলির আর্থিক অবস্থা ফেরানোর জন্য এ বছর ৭০ হাজার কোটি টাকা পুঁজি ঢালা হচ্ছে, অন্যদিকে, গত বৃহস্পতিবার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বার্ষিক রিপোর্টে জানা গেল, গত অর্থবর্ষেই (২০১৮-১৯) ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় হওয়া প্রতারণার অঙ্ক ৭১,৫৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ যা ব্যাঙ্কে এবারে ঢালা হচ্ছে তা থেকে গত বছর ব্যাঙ্ক প্রতারণার অর্থ আরও বেশি। আরও উল্লেখ্য যে গত বছর ৭১,৫৪২ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক প্রতারণার মধ্যে শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে প্রতারণার অর্থ ৬৪,৫০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এবারে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে যেখানে ঢালা হচ্ছে ৭০ হাজার কোটি টাকা, সেখানে গত বছর শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে প্রতারণা হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন হল, অনাদায়ী ঋণের জন্য যদি অনেকাংশে কংগ্রেসকে দায়ী করে মোদি সরকার, তাহলে নিঃসন্দেহে ব্যাঙ্ক প্রতারণার জন্য সিংহভাগ দায়ী মোদি সরকার। স্বাধীনতার সিংহভাগ প্রতারণা ঘটেছে শুধু মোদির আমলেই।

মোদি বলছিলেন যে, আমরা নিজে খাব না এবং অপরকে খেতে দেব না। কিন্তু, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অর্থের দিক দিয়ে সিংহভাগ প্রতারণা ঘটেছে মোদির আমলে। একদিকে অর্থ ব্যাঙ্কে ঢালা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় সমপরিমাণ অর্থের প্রতারণা ঘটছে ব্যাঙ্কের লেনদেনে। তাহলে দেশের কাঠামোগত উন্নতি কীভাবে ঘটবে? তাছাড়াও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ৭৬ হাজার কোটি টাকা কি কাঠামোর উন্নতিতে খরচ হবে, না ঘাটতি মেটাতে খরচ হবে, এজন্য সুস্পষ্ট শ্বেতপত্র চাই।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial