গরিব মানুষকে ঠকানো কেন্দ্রের মূল্যহীন বাজেট

শঙ্খ রায়

রোগীর মৃত্যুর পর আর তাকে ওষুধ দিয়ে কী লাভ? কৃষককে ঠকিয়ে, গরিব মানুষকে ঠকিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে কেন্দ্র। তারপর সেই বাজেট একেবারে মূল্যহীন। কেন্দ্রের জনস্বার্থ-বিরোধী মূল্যহীন বাজেটকে এভাবেই মানুষের সামনে তুলে ধরে কেন্দ্রের সরকারকে আক্রমণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

 

কেন্দ্রের সরকারের জনস্বার্থ বিরোধী ভূমিকার সমালোচনায় ইতিমধ্যেই সরব হয়ে তাকে এক্সপায়ারি সরকার বলেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রের বাজেটের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, “এটা এক্সপায়ারি বাজেট। ওদের সরকারের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র একমাস বাকি। ওরা জানে আর ফিরবে না। তাই মরিয়া হয়ে গিয়েছে। একমাসে আর কিছুই করা সম্ভব নয়। মানুষকে আবার ঠকানোর জন্য ভোটের ইন্তাহার তৈরি করেছে।” একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা প্রশ্ন, “গত পাঁচ বছরে এই বাজেট কেন্দ্র কেন করেনি? কৃষকদের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য ভোটের মুখে এই ঘোষণা কেন? আমরা বা ইতিমধ্যে করে দিয়েছি ওরা এখন সেগুলো করছে। পুরোটাই নকল করে করছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। কৃষকদের ঠকিয়ে, গরিব মানুষকে দেখানোর জন্য সব করছে। রোগীর মৃত্যুর পর আর তাকে ওষুধ দিয়ে কি লাভ? এই বাজেট মূল্যহীন।”

 

কেন্দ্রের সরকারের বিরোধিতায় জননেত্রীর ভূমিকায় প্রশংসা করে তাঁরই পথ নিয়েছে সব ক’টি বিরোধী দল। বাজেট নিয়েও তারা একজোট। সেই প্রসঙ্গ টেনেই মুখ্যমন্ত্রী বাজেটের বাস্তব ছবিটা পরিস্কার করে দেন। বলেন, “এই সরকারের কোনও নৈতিক অধিকার নেই পাঁচ বছরের জন্য কোনও বাজেট করার। ওরা যা ঘোষণা করেছে, তা কিছুই রুপায়িত হবে না। এর কোনও ভবিষ্যৎ নেই।” তাঁর কথায়, “রেলমন্ত্রী থাকাকালীন পাঁচ-ছটা বাজেট করেছি। সাধারণ মানুষের চাহিদা সম্পর্কে আমাদের বাস্তব ধারণা ছিল। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এই সরকারের কোনও ধারণাই নেই। নোটবন্দি, জিএসটি, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ডিজাস্টারের পর থেকে দেশে অর্থনৈতিক এমারজেন্সি চলছে। আমরা আশায় ছিলাম হয়তো সেসব নিয়ে কিছু কথা থাকবে বাজেটে। কিন্তু পরিস্থিতি সামলানোর জন্য কিছুই করার কথা বলা হল না।” এর পরই মুখ্যমন্ত্রীর আশঙ্কা, “সারা দেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা কিছু বললেই গলা টিপে ধরা হচ্ছে। গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। এই সরকার এমারজেন্সির “ই” আর হ্যারাসমেন্টের ‘এইচ’ নিয়ে চলছে। আর মিথ্যা বলে চলেছে। রাজনৈতিকভাবে লড়াই করতে পারছে না তারা। তাই মরিয়া হয়ে নানাভাবে প্রলোভন দেখাচ্ছে। আমি এই বাজেটের বিরোধিতা করছি বলে আমাকেও গ্রেফতার করা হতে পারে।

ভোটের মুখে মধ্যবিত্তের কর ছাড় দেওয়ার মতো বিষয়ের পাশাপাশি কৃষকদেরও নানাভাবে প্রলোভন দেখানোর চেষ্টা করেছে সরকার। যাকে কৃষকদের ঘুষ দেওয়ার সমান বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “কৃষকদের জন্য গত সাড়ে চার-পাঁচ বছরে কিচ্ছু করেনি কেন্দ্র। আমরা একর প্রতি কৃষকদের জন্য বছরে পাঁচ হাজার টাকা অনুদান দেওয়ার কথা জানিয়েছি। কেন্দ্র দু’বছরে ছয় হাজার টাকা দেবে বলেছে। ভোটের জন্য এসব কেন্দ্রের উস্কানি। এভাবে তারা ঘুষ দিতে পারে না। তারা আমাদের গর্ব। কেন্দ্রের সরকার তাদের চিট করছে। ঠকাচ্ছে। ওরা একটা চিট ফান্ড সংস্থায় পরিণত হয়েছে।” মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, কৃষকদের জন্য বাজেটে বরাদ্দর বিষয়টি কোনওভাবেই কেন্দ্র সরকারের অধিকারে পড়ে না। তাঁর অভিযোগ, “এটা রাজ্যের বিষয়। আজ বিজেপি ক্ষমতায় আছে। কাল থাকবে না। কোনও রাজ্যে তাদের সরকার আছে, কোথাও কংগ্রেসের। অথচ কেন্দ্র দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করতে চাইছে। রাজ্যের হাত থেকে তা কেড়ে নিয়ে নিজেদের মতো বাজেট করছে। রাজ্য থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সমান্তরাল সরকার চালানোর চেষ্টা করছে তারা। সবই যদি উনি করবেন তবে দেশের প্রধানমন্ত্রী আর সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও উনি হয়ে যান।”

গ্রামীণ উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প বরাদ্দে কাটছাঁট করেছে কেন্দ্র। স্বচ্ছ ভারত প্রকল্পকে তারা নানাভাবে প্রোমোট করার চেষ্টা করছিল। এবার সেই খাতেই বরাদ্দে ছাঁটাই ঘোষণা করেছে। নারেগা, ১০০ দিনের মতো প্রকল্পেও হয়েছে বরাদ্দে ছাঁটাই। “স্কিল ডেভলপমেন্ট’-এ ১৩.৪ শতাংশ বরাদ্দ কমেছে। তফসিলি জাতিউপজাতি উন্নয়নে ২৯.০৯ শতাংশ বরাদ্দ কমেছে। উজ্জ্বলা যোজনায় কমেছে ১৪.৪ শতাংশ। পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের বরাদ্দে কমেছে ২০.৮ শতাংশ। নন পারফরমিং অ্যাসেট (এনপিএ) নিয়েও কেন্দ্র মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। তাই মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “২০১৪ সালে ২ লক্ষ ৪ কোটি টাকা থেকে পাঁচগুণ বেড়ে ১০ লক্ষ ৪ কোটি টাকা। কী লাভ হল?” একইসঙ্গে বলেছেন, “গরিব মানুষের জন্য কোনও বাড়তি বরাদ্দ নেই। তাদের ক্ষতি হবে এট বাজেটে।” মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্পে উদ্যোগপতিদের কোনও নথি ছাড়াই এক ঘন্টায় ১ লক্ষ টাকা লোন দেওয়ার সিদ্ধান্ত ও আরেক দুর্নীতির নামান্তর। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “এই লোন কাকে দেওয়া হবে তদন্ত করে দেখা হোক। এটা আরও একটা বড় দুর্নীতি। মিলিয়ে নেবেন।”

সার্বিকভাবে এই বাজেটকে কেন্দ্র করে ফের একজোট হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ভোটে বিজেপির পরাজয় হবে বলেই মনে করছেন তিনি। বলেছেন, ভোটের পর একটি সাধারণ অ্যাজেন্ডার ভিত্তিতে আমরা সবাই একজোট হয়ে কাজ করব। উত্তর-পূর্ব ভারতে সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার দাবি তুলেও মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “দেখবেন ভোটের মুখে এই নিয়ম ওরা শিথিল করবে। কিন্তু তাতেও লাভ হবে না। মানুষ ওদের চিনে গিয়েছে।”

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers