গনতন্ত্র, সংবিধান, বাংলা ও বাঙালিয়ানা

 কর্নেল দীপ্তাংশু চৌধুরী

হঠাৎ করেই বদলে যাচ্ছে আমাদের আবাল্যের চেনা এই দেশটা। বদলে যাচ্ছে এই কথাটা না বলে বরং বলা ভালো বদলে দেওয়া হচ্ছে। যে ভূখণ্ডের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের, সেই ইতিহাসের ন্যূনতম উত্তরাধিকারকেই অস্বীকার করে একটি অদ্ভূত অন্ধকার আবহ তৈরির লাগামহীন প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে এই  আসমুদ্র-হিমাচল উপনিষদের জন্মভূমি।

উপনিষদের আহ্বান ছিল “শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা”। অর্থাৎ বিশ্বের অমৃতের পুত্ররা শোনো। উপনিষদের মূল ভাবনায়, দর্শনে কোথাও কোনও ঘৃণা নেই, বিদ্বেষ নেই। মানুষ মাত্রেই অমৃতের পুত্র। যে বৈদিক দর্শনের ধাত্রীভূমি আমাদের এই মহান দেশ, সেই বৈদিক দর্শনের মধ্যেও মতের এবং পথের বিভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু বিবাদ নেই, বিদ্বেষ নেই। যাবতীয় মননশীলতা আশ্রয় করেছে এক অপরূপ সহনশীলতাকে৷ এটাই আমার, আমাদের ভারত।

গত কয়েক বছরে এই আদর্শের ভাবনা এক নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বদলে দেওয়া হচ্ছে। এই বদল ঘটানো হচ্ছে একটি গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকেই। এই সময়টা হল আগামিদিনে এক ভয়ংকর কালের সূচনা মাত্র। অনাগত সেই ভবিষ্যৎ কালে দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনও মত প্রকাশের কোনও অধিকার থাকবে না। ব্যক্তিগত পরিসর বলেও ভারতবাসীর কিছু থাকবে না। এই সময়ের আগে আমার এই মহান জন্মভূমিতে হয়তো দারিদ্র ছিল, অসাম্য ছিল, অশিক্ষা ছিল। কিন্তু মানুষে মানুষে ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছিল না। কোনও ভারতীয় স্বপ্নেও তার প্রতিবেশিকে  পিটিয়ে মারার কথা কল্পনা করতে পারত না। আজ পিটিয়ে মারছে। এই ঘৃণার আবহ আমার আবাল্যের ভারতের নয়।

গণতন্ত্র আমাদের কাছে একটি অত্যন্ত পরিচিত শব্দ। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত দ্বিখন্ডিত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। ২০০ বছরের পর স্বাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে চলতে শুরু করেছিলাম আমরা। স্বাধীনতার পরে ভারত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক চরিত্র নির্ধারিত হয়েছিল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে। সংবিধান দেশের নাগরিকদের কয়েকটি মৌলিক অধিকার দিয়েছে। এই অধিকারগুলিই ভারত নামক বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। বাক স্বাধীনতা, ধর্মাচারণের অধিকার, সংগঠিত হওয়ার এবং সংগঠন করার অধিকার ইত্যাদি এই মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। সম্প্রতি শীর্ষ আদালত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিসরকে আরও প্রশস্ত করতে ব্যক্তিমানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করেছে। কিন্ত সংবিধান প্রদত্ত এই সমস্ত মৌলিক অধিকারই আজ ভূলুন্ঠিত। ২০১৪ সালের পর থেকে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিসরে রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ক্রমবর্ধমান। কে কী খাবে, কে কোন পোশাক পরবে, কোন ধর্মীয় আচার উপাচার পালন করা যাবে আর কোনটা যাবে না, তা স্থির করে দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করে। নতুন একটি শব্দ আমদানি হয়েছে- -“দেশদ্রোহী”।

শাসকের অপছন্দের কথা বললেই তুমি দেশদ্রোহী। তা তুমি অভিনেতা, শিল্পী, লেখক, ইতিহাসবেত্তা, নাট্যকার, অথবা অধ্যাপক কিংবা বিশ্ববিশ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া, বা খুশি হও না কেন! অপছন্দের কথা বলা সেই মানুষগুলির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হচ্ছে দেশদ্রোহ সংক্রান্ত ভয়ংকর সব আইনের ধারা। রাষ্ট্র আর রাজনীতি মিলেমিশে একাকার হয়ে তোমাকে দেশদ্রোহী বানিয়েই ছাড়বে। তাহলে কোথায় গেল সংবিধান প্রদত্ত বাক স্বাধীনতার অধিকার? শাসকের মন জুগিয়ে পছন্দের কথা বললেই তুমি দেশপ্রেমিক। এমনকী দেশের জনগণের টাকা লুঠ করে বিদেশে পালিয়ে গেলেও তুমি দেশদ্রোহী নও। কেননা তুমি শাসকের পছন্দের তালিকায় আছো। এই অদ্ভূত অন্ধকারই প্রতিনিয়ত গাঢ় হচ্ছে আমাদের চোখের সামনে।

 এক অভূতপূর্ব ‘রণকৌশল’। এই কৌশল ভারতে ইতিপূর্বে প্রয়োগ করা হয়নি। কৌশলটি হল জাতীয়তাবাদ এবং দেশপ্রেমের মধ্যে যে একটি বিস্তৃত পার্থক্য রয়েছে, তা মুছে দেওয়া। যদি তুমি জাতীয়তাবাদী না হও, তাহলে তুমি দেশপ্রমিকও নও। যদি তুমি দেশপ্রেমিক না হও, তাহলে তুমি নিশ্চিতভাবেই দেশদ্রোহী। আর যে জাতীয়তাবাদের কথা বলা হচ্ছে, তা তাত্ত্বিকভাবে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের “হিন্দুত্ব” তত্ত্বের সমার্থক। অর্থাৎ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে দেওয়া হচ্ছে হিন্দুত্ব তত্ত্বটি মানলে তুমি দেশপ্রমিক, নচেৎ দেশদ্রোহী। ১৯২৮ সালে সাভারকর লিখেছিলেন “এসেনশিয়ালস অফ হিন্দুত্ব”। গঠন করেছিলেন অভিনব ভারত সোসাইটি এবং পরবর্তীকালে হিন্দু মহাসভা। নেতাজি সুভাষচন্দ্র থেকে গান্ধিজী, কেউই মানেননি হিন্দুত্ব তত্ত্ব বা হিন্দু মহাসভার রাজনীতি। কী বলতে চাওয়া হচ্ছে— নেতাজি থেকে গান্ধীজি, কেউই দেশপ্রমিক নন? দেশপ্রেম একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে বোঝায়। খুব ক্ষুদ্র আকারে এটা আমার পাড়া, আমার গ্রাম, আমার শহর হতে পারে। বৃহৎ আকারে আমার দেশ। কিন্তু তত্ত্ব হিসাবে জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। এমনকী পরিচিতি রাজনীতির মতো একটি খুবই বিতর্কিত বিষয়ও জাতীয়তাবাদের অংশ। জাতীয়তাবাদ একটি জাতি সংক্রান্ত বিষয়। কিন্তু দেশপ্রেম তা নয়। জাতিগত পরিচিতি সত্তার সঙ্গে দেশপ্রেমের কোনও সম্পর্ক নেই। একই দেশে ভিন্ন ভিন্ন জাতি বসবাস করতেই পারে এবং তারা সবাই মিলে ওই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডটিকে ভালোবাসতেই পারে এবং ওই ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আত্মবলিদানও দিতে পারে। বিশ্বের ইতিহাসে এই রকম উদাহরণ আজ রয়েছে। সুতরাং তাত্ত্বিকভাবে দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদের মৌলিক ও বিস্তৃত পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়ে যে হাঁসজারুটি উপস্থিত করা হচ্ছে, তা আসলে এক ফ্যাসীবাদী রাজনীতির রণকৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, সমাজতন্ত্রী, সাম্যবাদী বা নৈরাজ্যবাদীরা কি তাহলে দেশপ্রেমিক নয়?

বিনায়ক দামোদর সাভারকর হিন্দু জাতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভারতীয় ভূখন্ডে বসবাসককারী। হিন্দু ধর্মাবল্বীদের কথা বলেছেন। শিখ, বৌদ্ধ, জৈনরাও বৃহত্তর অর্থে হিন্দু। কিন্তু ইসলাম বা খ্রীষ্টান ধর্মালম্বীরা নৈব নৈব চ। তারা এই ভূখণ্ডের আদিমতম বাসিন্দা হলেও তাঁর মতে, এরা “বহিরাগত”। সাভারকরের হিন্দুত্ব হল আদতে ইওরোপীয় “নেশন স্টেট” বা জাতিরাষ্ট্র তত্ত্বের এক অক্ষম অনুকরণ। ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র ছিল একভাষী এবং একই সংস্কৃতির অঙ্গীভূত এবং একটি নিদিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের সমাহার। কিন্তু ভারত এমন একটি ভূখণ্ড, যেখানে বহুভাষিক মানুষের বাস। তারা বহু সংস্কৃতি এবং বহু ধর্মের অনুসারী। আক্ষরিক অর্থেই ভারত একটি কসমোপলিটান দেশ। এই দেশে কীভাবে হিন্দুত্বের প্রয়োগ সম্ভব? হয় ভিনধর্মীদের ভারত ছেড়ে চলে যেতে হবে, নয় তাদের নির্মূল হয়ে যেতে হবে তাহলে কি অ্যাডলফ হিটলারের ক্লিনজিংয়ের প্রয়োগ হবে উপনিষদের জন্মভূমিতে?

মাত্র এক লহমায় বেঘর হয়ে গেল ১৮ লক্ষ ৮৫ হাজার মানুষ। দেশহীন। এরা প্রত্যেকেই বাঙালি, বাংলাভাষী । এদের বেশির ভাগই বাঙালি হিন্দু। স্মরণকালের মধ্যে গোটা দুনিয়ায় এত বৃহৎ মানবিক বিপর্যয় খুবই কম ঘটেছে। ইরাক, সিরিয়া কিংবা সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলির সঙ্গে এই মানবিক বিপর্যয় তুলনীয়। কলমের এক খোঁচায় ১৯ লক্ষ মানুষ হঠাৎ বেআইনি হয়ে যাওয়াটা বোধহয় যুদ্ধদীর্ণ দেশগুলির চলতি পরিস্থিতির থেকেও ভয়ংকর। আজন্মের ভিটে ছেড়ে হয়তো এদের স্থান হবে কোনও এক অমানবিক শিবিরে। যেখানে যাবতীয় নাগরিক অধিকার অবরুদ্ধ। আমরা হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প কিংবা পল পটের শ্রমশিবিরের ভয়ংকর ইতিহাস জেনেছি। আগামী প্রজন্ম হয়তো তারই কোনও এক পুনরাবৃত ইতিহাস পাঠ করবে। এনআরসি নামক যে প্রক্রিয়াটি চালু হয়েছিল বেআইনি অনুপ্রবেশকারী খুঁজে বার করতে, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে সেই গোটা প্রক্রিয়াটিই বিপর্যয়ের মুখে। অজশ্র প্রশ্ন তাড়া করে ফিরছে এনআরসিকে। মোদ্দা যে প্রশ্নটি সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, তা হল এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ভবিষ্যৎ কী? এরা কোথায় যাবেন? এঁদের গ্রাসাচ্ছদনের ব্যবস্থা কী? ভারতে এঁরা বেআইনি। বাংলাদেশও এদের গ্রহণ করতে নারাজ। অতঃ কিম?

কেবল এক হিংস্র রাজনীতির শিকার হয়ে গেলেন এই বিপুল সংখ্যক মানুষ। যে রাজনীতির মোদ্দা উদ্দেশ্যই হল মেরুকরণ এবং ক্ষমতা দখল। অসমে এনআরসি করার মুখ্য লক্ষ্য ছিল একদিকে বর্ণহিন্দু অহমিয়া অস্মিতাকে তোষণ করা এবং অন্যদিকে অসমে ‘আলি’ নামে পরিচিত বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়কে উৎখাত করা। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া উনিশ লক্ষ মানুষের বেশির ভাগই যখন বাঙালি হিন্দু, তখন ব্যাপক সমস্যায় পড়েছে শাসকদল। গোটা প্রক্রিয়াটির নিট ফল হয়ে গেল হিতে বিপরীত। শুরু হয়ে গিয়েছে উস্মাপ্রকাশ, পারস্পরিক দোষারোপ। এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক বাঙালি হিন্দুর নাম বাদ যাওয়ায় প্রবল আশঙ্কায় ভুগতে শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাও। কেননা ইতিমধ্যেই গর্জন শোনা গিয়েছে, বাংলাতেও এনআরসি হবে বলে। ওপার বাংলা থেকে আগত জনসংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে বিপুল। তাঁদের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে অসমের এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে গিয়ে গোটা রণকৌশলটিকেই বানচাল করে দিয়েছে। দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে যাচ্ছে আশঙ্কা-যদি বাংলাতেও এনআররসি হয়, তাহলে বাঙালির ভবিষ্যৎ কী? 

এই সময়ে এক দুর্যোগের ঘনঘটা নামিয়ে আনা হচ্ছে গোটা বাঙালি সমাজের সামনে। উত্তর এবং পশ্চিম ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে এক নয়া সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি কখনও বাঙালির ছিল না। বাঙালিয়ানা বা বাঙালিত্ব বলতে যা কিছু ছিল, এক সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাকে শেষ করে দেওয়ার অভূতপূর্ব চক্রান্ত চলছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে রামনবমী পালনের, হনুমান জয়ন্তী উদযাপনের এবং গণেশ চতুর্থী পালনের। পাড়ায় পাড়ায় রাজনৈতিক উদ্যোগে পালিত হচ্ছে সশস্ত্র মিছিলের মাধ্যমে রামনবমী। এই রামনবমীর মিছিলে স্কুলপড়ূয়া ছাত্রের হাতেও শানিত অস্ত্র। বাঙালি কবে কোনকালে এত হিংসা ছিল? আদৌ বাঙালি ঐতিহাসিকভবে কোনওদিন সশস্ত্র মিছিল করে রামনবমী পালন করেছে? রামায়ণের চরিত্র হনুমান কোনওদিন কি বাঙালির উপাস্য দেবতা ছিল? আজ পাড়ায় পাড়ায় মহাসমারোহে হনুমান জয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে। চাঁদা তুলে গণেশ চতুর্থী পালন ছিল মহারাষ্ট্রে একচেটিয়া। মারাঠি গণেশ এখন বাঙালির উপাস্য হয়ে উঠেছেন শ্রেফ রাজনৈতিক প্রয়োজনে।

আসলে বাঙালি কোনওদিনই রামভক্ত বা কৃষ্ণভক্ত ছিল না। যদি মহাভারতই দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে বঙ্গভূমির নৃপতিরা প্রত্যেকেই ছিলেন কৃষ্ণবিরোধী। জরাসন্ধ, মুর, ভগদত্ত, নরক থেকে শুরু করে বাসুদেব এবং কংস পর্যন্ত। বাসুদেব তো নিজেকেই কৃষ্ণ বলে ঘোষণা করেছিলেন। বাঙালি শঙ্খচক্রগদাপদ্ম সম্বলিত যুদ্ধবাজ যদুপতি কৃষ্ণের আইকনকে কোনওদিনই মেনে নেয় নি। বাঙালি ছিল আদি অকৃত্রিম শৈব। প্রান্তিক মানুষর প্রাকৃত দেবতা মহাদেবই বাঙালির উপাস্য।

বাঙালি আদতে অনার্য। সমুদ্র উপকূলবর্তী নদীমাতৃক জলাভৃমিতে তার বাস। তার ভাষা প্রকৃত। তার ধর্ম শৈব। তার সংস্কৃতি অন্ত্যজ। আর্যাবর্ত বা ব্রহ্মাবর্তের বাসিন্দাদের সঙ্গে তার পোশাক, সামাজিক বিন্যাস, খাদ্যাভ্যাস, জীবনচর্চা— সবেতেই তফাত। মিল নেই, অমিল বিপুল। আদি বাংলা ভাষার যে লিখিত রূপ এখনও পর্যন্ত আবিষ্কার হয়েছে, সেটা চর্যাপদ। নেপালের রাজার গ্রন্থাগার থেকে চর্যাপদের পুথিকে “সভ্য পৃথিবী”র আলো দেখান মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। চর্যাপদের সেই “কা আ তরুবর পঞ্চবি ডাল” কিংবা “জো জো উজুবাটে গেলা/অনাবাট্টে ভৈলা সই”-এর সঙ্গে প্রাকৃত ভাষার যে মিল রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। বাংলা হরফ এসেছে সিদ্ধমাতৃকা হরফ থেকে। যা ব্রাক্ষী, খরোষ্ঠী, পালি ভাষারও আদি হরফ। শিবঠাকুর বাঙালির দেবতা। আবার পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা, যা আদতে দ্রাবিড় সভ্যতা,

সেখানেও মিলেছে শিব। সেই শিব পশুপরিবৃত পশুপতি। সিন্ধুনদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সভ্যতার ধ্বংসস্তূপে উৎখনন চালিয়ে মিলেছে পশুপতির সিল। কিন্তু বৈদিক দেবতা হিসাবে শিবের কোনও উল্লেখ নেই। শ্মশানচারী, গঞ্জিকাসেবী শিব অন্ত্যজের দেবতা, তাদের মনের মানুষ । রবীন্দ্রনাথ লিখছেন,“ তার লটপট করে বাঘছাল/তার বৃষ রহি রহি গরজে/তার বেষ্টন করি জটাজাল/ফত ভুজঙ্গদল তরজে।” .

বৌদ্ধযুগে বাঙালি বৌদ্ধ। বৈদিক ধর্মের সঙ্গে তার দার্শনিক বিরোধ। আর্যাবর্তের মানুষ গঙ্গা পার হয়ে বৃহৎবঙ্গে প্রবেশ করত। মূলত তাদের আগমন ছিল বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে। তারা গঙ্গা পার হয়ে এপারে আসত মূলত লোহার খোঁজে। কেননা এই ভূমিতেই লোহা ছিল। বাঙালি তা তুলে এনে ব্যবহারিক করে তুলতে পারত। দিল্লিতে বাঙালি গড়েছিল চন্দ্ররাজার লোহার স্তম্ভ। কিছু কমবেশি সাড়ে তিন হাজার বছর। আজও একটুও মরচে ধরেনি! আর্যাবর্তের মানুষ গঙ্গা পেরিয়ে বাণিজ্যের প্রয়োজনে এপারে আসত। কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময়ে গঙ্গার ঘাটে প্রায়শ্চিত্ত করে যেত। সেই থেকেই গঙ্গায় পিন্ডদান এবং প্রায়শ্চিত্তের প্রথা।

কেনপোনিষদ এবং কঠোপোনিষদে বাঙালিকে বলা হয়েছে “বয়াংসি”। যার অর্থ পাখির মতো কিচমিচে ভাষায় কথা বলে। যাদের হাতের তৈরি লোহা আর্যাবর্তের মানুষ নিয়ে যেত, সুর এবং অসুরদের দিব্য অপদেবতা সাজিয়ে পুরাণের পর পুরাণ ছয়লাপ করে দিয়েছে তারা । বাৎসায়ন থেকে মনু, প্রত্যেকেই বাংলাকে রাক্ষসভূমি এবং অচ্ছুৎভূমি বলে বর্ণনা করেছেন। মনু নিদান দিয়েছেন, বাণিজ্য এবং প্রচারের জন্য রাক্ষসভূমিতে পা রাখা যেতেই পারে কিন্তু ফেরার পরে মস্তকমুণ্ডন করে

প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। দুই যুদ্ধের আইকন নবদূর্বাদলশ্যাম ধনূর্ধর রাম কিংবা কূটনীতিবিদ যাদবকুলপতি কৃষ্ণ নয়, বাঙালির কৃষ্ণ প্রেমাভিসারে যায় কুঞ্জবনে। বর্ষণসিক্ত বিভাবরী জাগরণে কাটায়। তাই রামনবমী যুদ্ধোন্মাদনায় নয়, বাঙালি অনেক স্বচ্ছন্দ শিবের গাজনে আর কৃষ্ণরাসের কীর্তনে।

আগে যে কথা বলছিলাম, রামনবমী বাঙালির নয়। গণেশ চতুর্থীতে গণেশ পুজোও নয়। কস্মিনকালেও বাঙালির বারোমাসে তেরোপার্বণের তালিকায় রামনবমী বা গণেশ চতুর্থী ছিল না। আজ আচমকাই রামনবমী উদযাপন শুরু হয়ে গিয়েছে। এই হঠাৎ বদলের পিছনে যতটা সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক কারণ। এই রামনবমী উদযাপন কোনও ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষঙ্গকে বহন করছে না। এর কোনও ইতিহাসও নেই। গণসঙ্গীত বা গণনাট্যের মতোই রামনবমীকেও এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিসাবেই বাংলায় আমাদানি করা হয়েছে। এই রামনবমী উদযাপনের সঙ্গে বাঙালির কয়েক হাজার বছরের গর্বিত ইতিহাসের কোনও সম্পর্ক নেই। রামনবমী উদযাপন, বিজয়া দশমীতে রাবণদহন বা গণেশ চতুর্থীতে গণেশ পুজো একান্তভাবেই উত্তর এবং পশ্চিম ভারতীয় সংস্কৃতি।

মহাকাব্যদ্ধয় এবং পুরাণের ভাষ্য অনুযায়ী, রাম হল কৃষ্ণের অবতার। দ্বাপর যুগে যিনি কৃষ্ণ, ত্রেতা যুগে তিনিই রাম। বাঙালির সঙ্গে রাম বা কৃষ্ণের সখ্য কোনওকালেই ছিল না। কৃষ্ণ হলেন আর্যাবর্তের মানুষের এক রণদুর্মর কূটনীতিবিদ আইকন। কৃষ্ণের চার হাতে শখচক্রগদাপদ্ম। কৃষ্ণের শঙ্খের নাম পাঞ্চজন্য এবং চক্রের নাম সুদর্শন। যদি মহাভারতের কথাই ধরা যায়, তাহলে দেখা যাবে দ্বাপর যুগে পূর্বদেশের প্রতিটি সম্রাটই ছিলেন কৃষ্ণবিদ্বেষী। আবার বলছি, জরাসন্ধ, নরক, মুর, ভগদত্ত এবং কংস প্রত্যেকেই কৃষ্ণের শক্র ছিলেন এবং এদের প্রত্যককেই কৃষ্ণ বিনাশ করেছেন অন্যায় যুদ্ধে। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন শৈব অর্থাৎ শিবের উপাসক।

ঐতিহাসিক যুগে কর্ণসুবর্ণের বাঙালি সম্রাট শশাঙ্কও ছিলেন শৈব। উৎখননে প্রাপ্ত শশাঙ্কর মুদ্রা ও সিল সেই সাক্ষ্যই দেয়। বল্লালযুগে বাংলায় দ্বিতীয়বার ব্রাহ্মণ আগমনের পরে বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদ চেপে বসল বাঙালির ঘাড়ে। যে বাঙালি সমুদ্র পেরিয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, এমনকী ইওরোপেও বাণিজ্য করতে গিয়েছে, তার কালাপানি পেরনো বন্ধ হল মনুস্মৃতির নিদানে। টলেমির লেখায় কিংবা পেরিপ্লাস অফ দি ইরিথ্রিয়ান সি-তে যে গঙ্গারিডি সভ্যতা বা বাঙালি-বাণিজ্যের কথা লেখা রয়েছে, সেই গৌরবও অস্তমিত হল। বাঙালি অবশ্য সেই স্মৃতিকে ধরে রেখেছে মঙ্গলকাব্যে, চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্য অভিযানের কল্পকাহিনিতে। কিন্তু তবু বাঙালি কৃষ্ণ কিংবা রামকে মেনে নেয়নি। মনসা, শীতলা, চন্ডী, শনি এবং অবশ্যই শিবের প্রতি তাঁর আস্থা বহাল থেকেছে। বৈদিক মতে এঁরা সকলেই অন্ত্যজ শ্রেণির দেবতা।

চৈত্রমাসে শিবধ্বনি, যাকে গালবাদ্য বলা হয়ে থাকে, তাই দিয়ে গাজন শুরু হয়। গাজনের মেলায় শিবের গীত। এ শিব বাঙালির প্রাণের শিব, এই শিবকে নিয়েই বাঙালি কবি লিখেছেন শিবায়ণ। যেখানে গাঁজাখোর অলস শিবকে ঝাঁটাপেটা করে দিনমজুরি করতে পাঠাচ্ছে স্বয়ং অন্নপূর্ণা। কেননা তাঁর ঘরে বাড়ন্ত অন্ন, অভুক্ত পাঁচ সন্তান। শিবও ঝাঁটাবাড়ি খেয়ে দিব্য দিনমজুরি শুরু করে দিয়েছেন।

বাঙালি কৃষ্ণকে মেনে নিল অনেক পরে। চৈতন্যের হাত ধরে। বাঙালির ইতিহাসে চৈতন্যই প্রথম বিপ্লবী, যিনি মন্দিরের অচলায়তন থেকে দেবতাকে নামিয়ে এনেছিলেন মাটির পৃথিবীতে। কীর্তনে, স্নানযাত্রায়, মিছিলে মাতিয়ে দিয়ে বাঙালিকে মুক্ত করেছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদের স্মার্ত নিদান থেকে। চৈতন্যই কৃষ্ণের শঙ্খ চক্র-গদা-পদ্ম-ধারী চার হাত কেটে দুই হাত করে দিলেন। তারপর সেই দুই হাতে বাঁশি ধরিয়ে দিয়ে তাঁকে কদমতলায় বসিয়ে দিলেন। যুদ্ধের আর কূটনীতির আইকন হয়ে গেলেন প্রেমের আইকন। কুঞ্জবনে রাত জেগে অভিসারে যান, বাঁশি বাজিয়ে ডেকে আনেন রাধাকে। আর চৈতন্যের দৌলতে বাঙালি নারী পেল বাৎসল্যের এক অবিরল ধারা গোপাল।

এই অদ্ভূত অন্ধকার সময়ে প্রতি নিয়ত ধর্ষিত হচ্ছে ভারতীয় সংবিধান এবং অবশ্যই গণতন্ত্র, নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার। অসমে যেমন এক লহময় শেষ হয়ে গিয়েছে ১৯ লক্ষ মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারের আশা, তেমনই এক মর্মান্তিক পরিস্থিতি কাশ্মীরে। সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫এ ধারা বাতিল করে কেবল উপত্যকাবাসীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাই করা হয় নি, জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে দ্বিখণ্ডিত করে কেন্দ্রশাসিত রাজ্যে নামিয়ে আনা ওই এলাকার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপরে চরম আঘাত। একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে অবনমন ঘটানোর ঘটনা এদেশের স্বাধীনতা উত্তর ইতিহাসে অভূতপূর্ব। জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের কোনও মতামত প্রকাশের অধিকারও দেওয়া হল না। এটা কি বিশ্বের কোনও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ মেনে নিতে পারে? কেন কাশ্মীরের মানুষের মতামত নেওয়া হল না, তার কোনও উত্তর নেই। উল্টোদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভয়ংকর প্রচার চালানো হচ্ছে যে, দেশের সর্বত্র একই আইন থাকবে, কেন কাশ্মীর উপত্যকায় পৃথক আইন হবে?  এই প্রচারও করা হচ্ছে আগাগোড়া বিষয়টিকে গুলিয়ে দেওয়ার জন্য। ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্যে একই আইন বলবৎ আছে। ইচ্ছা করলেই কোনও ভারতীয় নাগরিক নাগাল্যান্ড কিংবা অরুণাচলে জমি কিনতে পারেন না। সেগুলি নিয়ে কোনও আলোচনা নেই।

একদিকে যখন ভারতের অর্থনীতি ধসে পড়ছে, শিল্পক্ষেত্রে নেমে এসেছে পাঁচ শতাংশে, তখন মেরুকরণ আর জাতীয়তাবাদী জিগির নিয়ে ব্যস্ত শাসকদল। বিরোধীদের মুখ বন্ধ করতে লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে। প্রয়োগ করা হচ্ছে দানবীয় আইন-কানুন।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে কার্যত অঘোষিত জরুরি অবস্থার চেহারা দেখা যাচ্ছে দেশজুড়ে। গাড়িশিল্পে মন্দাজনিত কারণে লক্ষাধিক ছাঁটাই কিংবা বিএসএনএল কর্মীদের সাতমাস বেতন বকেয়া থাকাটা অথবা গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বাধিক বেকারসংখ্যা এই সরকারের কাছে কোনও সমস্যা নয়। তাদের কাছে মৌলিক সমস্যা হল মেরুকরণ কত দ্রুত করা সম্ভব। কিন্তু ওরা যেটা জানে না, তা হল ইতিহাসে শাসক নয়, শেষ কথাটি বলে মানুষ। তাই বাংলার মানুষই ঠিক করবেন বাংলা, বাঙালিয়ানা, গণতন্ত্র, এই কথাগুলোর প্রকৃত অর্থ।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial