গণতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধিকার 

অভিরূপ সরকার

 এমন কিছু দরকারি প্রতিষ্ঠান আছে যাদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে না দিলে গণতন্ত্রের মানকে ধরে রাখা যায় না। বস্তুত, এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে অনায়াসে গণতন্ত্রের চৌকিদার বলা চলে। “চৌকিদার” কথাটা অবশ্য ইদানীং রাজনৈতিক তর্জায় ব্যাবহৃত হতে হতে একেবারে ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক তরজার প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে, আগে প্রতিষ্ঠানের কথা বলি। প্রশ্ন, গণতন্ত্র ঠিকঠাক চালাতে গেলে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান কেন দরকার? আমাদের দেশে বা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে, একটা রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জিতে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসে। সেই নির্দিষ্ট সময়টা পেরিয়ে গেলে ক্ষমতাসীন দলকে আবার নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হয়, মানুষের কাছে নিজেদের কাজকর্মের পরীক্ষা দিতে হয়। এটাই গণতন্ত্রের নিয়ম। এর ফলে, প্রত্যেক নির্বাচিত জন-প্রতিনিধির উপর একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কিছু কাজ করে দেখানোর চাপ থাকে। নির্বাচিত থাকার সময়ে তিনি কী কী করলেন তার একটা বিশ্বাসযোগ্য তালিকা পরবর্তী নির্বাচনের আগে মানুষের সামনে তাকে খাড়া করতেই হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে, একজন নির্বাচিত জন প্রতিনিধির ভাবনা বা পরিকল্পনার পরিধিটা মুলত স্বল্পমেয়াদি। দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার ফুরসত বা বিলাসিতা প্রায়শই তাঁর থাকে না। এটা গণতন্ত্রের একটা মৌলিক সমস্যা। কারণ, বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দেশের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ আর দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের মধ্যে সংঘাত রয়েছে। দেখা যায়, একটা নীতি সাময়িকভাবে কিছু সমস্যার সমাধান করলেও পরে পাকাপাকিভাবে সেটা দেশের ক্ষতি করছে। একজন জনপ্রতিনিধিকে যদি অনেক দিনের জন্য নির্বাচিত করা যেত তাহলে হয়ত তিনি দেশের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারতেন। কিন্ত জনপ্রতিনিধিরা অনেক দিনের জন্য নির্বাচিত হলে অন্য সমস্যা দেখা দিত। তখন তাঁদের কাজ করার তাগিদটাই চলে যেত, যেহেতু একবার নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়ে যেতে পারলে তাঁদের চট করে আর জনগণের কাছে পরীক্ষা দিতে হত না। তাই চার-পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন হওয়াটা গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য জরুরি। আবার স্বল্পদিনের জন্য নির্বাচিত হলে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে দূরদৃষ্টিহীনতার সম্ভাবনাটাও থেকে যাচ্ছে।

এই উভয়সংকট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সমাজে কিছু স্বাধীন, চিরন্তন এবং নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান থাকাটা জরুরি, যে প্রতিষ্ঠানগুলি হবে মোটের উপর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও যাদের অস্তিত্ব ও চরিত্র পাল্টাবে না। এই প্রতিষ্ঠানগুলিরই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করার কথা। দরকারি প্রতিষ্ঠানের তালিকাটা ছোট নয়–সামরিক শক্তি, পুলিশ, আইনি ব্যবস্থা, প্রশাসন, স্কুল- ব্যাঙ্ক–সবই এই তালিকাভুক্ত। গণতন্ত্রের সাফল্য-অসাফল্য যে, উন্নত দেশগুলিতে গণতন্ত্রের প্রহরী এই প্রতিষ্ঠানগুলি অপেক্ষাকৃত সজাগ ও সক্রিয় বলে সে সব দেশে গণতন্ত্রের মানও উন্নত। তুলনায় গরিব দেশের প্রতিষ্ঠানগুলি দুর্বল, তাই সেখানকার গণতন্ত্রও নিম্নমানের ।

সামরিক শক্তি, পুলিশ, আইনি ব্যবস্থা কিংবা প্রশাসনের নিরপেক্ষ থাকার প্রয়োজনীয়তাটা সকলেই বোঝেন, এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু গণতন্ত্রের স্বার্থে কেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তথ্য-পরিসংখ্যান কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে, সেটা কিছুটা ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। বিশেষ করে এই কারণে যে, আমাদের দেশে কিছুদিন ধরেই এই প্রতিষ্ঠানগুলির উপর ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ প্রভাব বিস্তার করছে।

গণতন্ত্রের মান একটা কাঙ্ক্ষিত স্তরে পাকাপাকিভাবে ধরে রাখতে গেলে মুক্ত, সংস্কারহীন ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বস্তুত অপরিসীম। যাঁরা ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচন করবেন, দেশের ভালমন্দ নিয়ে তাঁদের দূরদৃষ্টি থাকাটা জরুরি, যে দূরদৃষ্টি একটা উদার শিক্ষার বাতাবরণেই তৈরি হতে পারে। আমাদের গরিব দেশে শিক্ষার দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, গত চার-পাঁচ বছর যাবৎ শিক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইতিহাস-বিজ্ঞান-অর্থনীতি-দর্শন সব কিছু নিয়েই একটা অশিক্ষা মানুষের মনে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে কেউ কেউ বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, বহুদিন আগেই ভারতবর্ষে এরোপ্লেন আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছিল যেহেতু রামায়ণে আছে, পুরাকালে রাবণরাজা পুষ্পক রথে চড়ে আকাশপথে ভ্রমণ করতেন। কিংবা বহু যুগ আগেই ভারতবাসীরা প্লাস্টিক সার্জারির বিদ্যা জেনে ফেলেছিল যেহেতু পুরাণের গল্প অনুযায়ী শিবের প্রকোপে খসে যাওয়া গণেশের মুণ্ডের জায়গায় শিবেরই প্রসাদে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল হাতির মাথা। এইসব কারও কারও হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্ত আসলে ব্যাপারটা গভীর উদ্বেগের। একটা অশিক্ষা থেকে জন্ম নিচ্ছে আর একটা অশিক্ষা, সঙ্কীর্ণ ধর্মান্ধতা, ভ্রান্ত জাতীয়তাবাদ। ভারতের ইতিহাস নিয়ে একটা মিথ্যা গরিমা তৈরি হচ্ছে যার থেকে শাসক দল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে সন্দেহ নেই, কিন্তু  দীর্ঘমেয়াদি বিচারে এর ফল প্রকৃতই মারাত্মক। আমাদের দ্বিতীয় আশঙ্কা সরকারি পরিসংখ্যান নিয়ে। ২০১৫ সালে যখন ২০১১-১২কে ভিত্তিবর্ষ ধরে জাতীয় আয়ের নতুন সিরিজ বেরোল, আর দেখা গেল নতুন সিরিজ অনুযায়ী ভারতে আর্থিক বৃদ্ধির হার পুরনো সিরিজের তুলনায় হঠাৎ লাফ দিয়ে অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে, তখন থেকেই সরকারি পরিসংখ্যান তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে শুরু করেছে। নতুন সিরিজ নিয়ে তারপর থেকে একটার পর একটা সমস্যা। যেমন, সেন্ট্রাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অর্গানাইজেশন সম্প্রতি জাতীয় আয়ের পরিমার্জিত যে হিসাব বার করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে ২০১৬-১৭-তে, অর্থাৎ নোট বাতিলের বছরে, জাতীয় আয়বৃদ্ধির হার এক দশকের মধ্যে সব থেকে বেশি। উদ্দেশ্য এটাই বোঝানো যে, নোট বাতিলের ফলে ভারতীয় অর্থনীতির কোনও ক্ষতি হওয়া দূরের কথা, উল্টে বিস্তর উপকার হয়েছে। একই সঙ্গে কোনও পরিসংখ্যান সরকারের পক্ষে অস্বস্তিকর মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে চেপে দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ, ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভের ২০১৭-১৮ সালের জাতীয় কর্মসংস্থান সমীক্ষার রিপোর্ট। এই ধরনের সমীক্ষা এর আগে হয়েছিল ২০১১-১২ সালে।

সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়া খবরে প্রকাশ পেয়েছিল, ২০১৭-১৮ সালের সমীক্ষা অনু্যায়ী ২০১১-১২-র তুলনায় ২০১৭-১৮-তে বেকারদের সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। বলাই বাহুল্য, ভোটের ঠিক আগে এই ধরনের তথ্য প্রকাশিত হলে ক্ষমতাসীন দল অস্বস্তিতে পড়ত। তাই এই রিপোর্টটি নির্বাচনের আগে প্রকাশ করতে দেওয়া হয়নি, যদিও জাতীয় স্ট্যাটিস্টিক্যাল কমিশন একে প্রকাশের জন্য অনেক আগেই ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছিল। নির্বাচনের আগে সরকারি পরিসংখ্যানের অপস্রিয়মাণ বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিবাদে ১০৮ জন অর্থনীতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানী একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। এর উত্তরে আবার সরকার পক্ষের ১৩১ জন চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সই দিয়ে জানিয়েছিলেন, সরকারি পরিসংখ্যানে কোন গলদ নেই, অর্থনীতিবিদদের বিবৃতি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ভয় হয় অচিরেই হয়ত দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের দিয়ে অর্থনীতি, সংখ্যাতত্ত্ব কিংবা সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হবে। কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব নিয়ে যে রিপোর্টটি নির্বাচনের আগে বিজেপি সরকার প্রকাশ করতে দেয়নি, সেই রিপোর্ট নির্বাচন শেষ হয়ে যাওয়ার পর প্রকাশ পেয়েছ। রিপোর্টের নাম পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১৭-১৮। আগেই বলেছি, সরকার প্রকাশ করতে না দিলেও রিপোর্ট-এর আসল জায়গাটা নির্বানের আগেই সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। ফাঁস হওয়া অংশ থেকে জানা গিয়েছিল ২০১৭-১৮-র সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার অকল্পনীয় বেড়ে গিয়েছে। ফাঁস হওয়া তথ্য অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।

প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতায় সরকারি হস্তক্ষেপের আর একটা উদাহরণ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি। সরকার চেয়েছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার ঋণনীতি শিথিল করুক, অনাদায়ী ঋণের ভারে ন্যুজ্ব হয়ে যাওয়া ব্যাঙ্কগুলির প্রতি আরও নরম মনোভাব দেখাক, তাদের আয়ের একটা বড় অংশ সরকারকে দিয়ে দিক, যাতে নির্বাচনের আগে অর্থনীতিটা চাঙ্গা হয় আর সরকারের হাতেও কিছু পয়সা আসে। দীর্ঘমেয়াদি কুফলের কথা ভেবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক-এর কোনওটাই করতে চায়নি। কিন্ত ব্যাঙ্কের কাজকর্মে সরকারি হস্তক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদি ফল যে ভাল হয় না সেটা তো নানা দেশের অভিজ্ঞতা থেকে আগেই জানা ছিল। যেহেতু রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বাধীনতা খর্ব হওয়াটা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনা, তাই এই ব্যাপারটা খানিকটা বিশদে পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে।

বেশ কিছুদিন ধরেই সরকারের সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিরোধ চলছিল যার জেরে গভর্নর উর্জিত প্যাটেল এবং ডেপুটি গভর্নর বিরল আচার্য সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এখন পুরোপুরি সরকারের দখলে। মোটের উপর চারটে বিষয় নিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ । প্রথমত, জাতীয় ব্যাঙ্কগুলির পাহাড়প্রমাণ জমে ওঠা অনাদায়ী ঋণের বিশেষ নজরদারির আওতায় এনেছে। এই ব্যাঙ্কগুলির কার্যকলাপ, বিশেষ করে নতুন ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে তাদের স্বাধীনতা, অনেকটাই খর্ব করে দেওয়া হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আরোপিত এই বিধিনিষেধের ফলে ব্যবসায়ীরা ধার পাচ্ছেন না, বিনিয়োগ মার খাচ্ছে, আর্থিক বৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। তাই সরকার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সাত নম্বর ধারা প্রয়োগ করে এই শীর্ষ ব্যাঙ্ককে তার ঋণনীতি শিথিল করার নির্দেশ দিয়েছে। বলা দরকার, সাত নম্বর ধারার প্রয়োগ একমাত্র চরম সংকটকালেই হতে পারে। এর আগে কখনও এই ধারা প্রয়োগ করা হয়নি। আবার সেরকম কোনও সংকটও কিন্ত ইদানীং চোখে পড়েনি। তাই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বাধীনতায় সরকারের এই অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ আছে।

দ্বিতীয় বিরোধ সুদের হার নিয়ে। প্রত্যেক ত্রৈমাসিকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের একটি কমিটি মূল সুদের হার ঠিক করে দেয়। সরকার চাইছে সুদের হার আরও কমানো হোক যাতে আরও বিনিয়োগ, আরও বৃদ্ধি হতে পারে। অপরপক্ষে, রিজার্ভ ব্যাঙ্কে, কমানো দূরের কথা, কিছুদিন আগে অবধি সুদের হার বাড়িয়েছে। সম্প্রতি নতুন গভর্নর আসার পরে অবশ্য দফায় দফায় সুদের হার কমানো হয়েছে , সুদের হার কমানর ব্যাপারে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বক্তব্য ছিল, সুদের হার অযৌক্তিকভাবে কমালে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়া বেড়ে যাবে, বাজারে নগদের জোগান বাড়বে, ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আরও আশঙ্কা ছিল, ঋণ সুলভ হলে খারাপ ঋণের পরিমাণও বাড়বে। বিশেষ করে ঋণের একটা বড় অংশ নির্মাণ-শিল্পে বিনিয়োগ করা হবে। আবার ব্যাঙ্ক থেকে সহজ শর্তে ধার নিয়ে লোকেও বাড়ি- ফ্ল্যাট বেশি করে কিনবেন। ফলে বাড়ি-জমি-ফ্ল্যাটের দামে এবং সামগ্রিকভাবে নির্মাণ-শিল্পে একটা বুদবুদ তৈরি হবে। সেই বুদবুদ থেকে সাময়িকভাবে ধারণা হতে পারে দেশের অর্থনীতিতে জোয়ার এসেছে। কিন্তু অতীতে নানা দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গিয়েছে, নির্মাণ-শিল্পের বুদবুদ শেষ পর্যন্ত ফেটে গিয়ে এক ভয়ংকর সংকটের সৃষ্টি করে। পূর্ব এশিয়ার সংকট কিংবা আরও সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবপ্রাইম ক্রাইসিস সব সংকটের পিছনেই নির্মাণ-শিল্পের বুদবুদ একটা বড় ভূমিকা নিয়েছিল।

তৃতীয় বিরোধ, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আমানত নিয়ে। সরকারের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। ঘাটতি বেড়েই চলেছে। তার উপর গত নির্বাচনের আগে জনমোহিনী প্রকল্পগুলো কার্যকর করতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। তাই রিজার্ভ ব্যাঙ্কে জমে থাকা আমানতের একটা অংশ পেতে চাইছিল সরকার। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই দাবির বিরোধিতা করেছিল । রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মতে, এই আমানতে ভাগ বসালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে। আমানত বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বোর্ড। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বোর্ডে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য সরকার নচিকেত মোরের মত বিশেষজ্ঞকে ছাঁটাই করে নিজেদের পছন্দের লোক স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের স্বঘোষিত অর্থনীতিবিদ, বিমুদ্রাকরণের অন্যতম প্রবক্তা, গুরুমূর্তিকে বসিয়েছিল। আর উর্জিত প্যাটেল এবং বিরল আচার্য পদত্যাগ করার পর গোটা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটাই তো এখন সরকারের হাতের মুঠোয়।

চতুর্থ বিরোধ, নন ব্যাঙ্ক ফিনান্সিয়াল কোম্পানি, সংক্ষেপে এনবিএফসি-দের ঋণমুক্তি নিয়ে। সম্প্রতি আইএলএফএস-সহ বেশ কয়েকটি এনবিএফসি ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে শোধ দিতে পারেনি। সরকারের ইচ্ছে ছিলো , রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এদের সাহায্যে এগিয়ে আসুক। পক্ষান্তরে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আর এক ডেপুটি গভর্নার এস এস বিশ্বনাথন সম্প্রতি বলেছেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাথমিক উদ্দেশ্য আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষা করা, ঋণখেলাপি ঋণগ্রহীতাদের উদ্ধার করা নয়। বুঝতে কষ্ট হয় না, এই বিবৃতির মূল লক্ষ্য ঋণখেলাপি এনবিএফসি-রা। উল্লেখ করা যেতে পারে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আইএলএফএস-কে উদ্ধার করতে অস্বীকার করায় সরকার সেই কাজটা এলআইসি-কে দিয়ে করিয়েছে, বা বলা ভাল, তাদের করতে বাধ্য করেছে। নির্বাচনের আগে কিছু একটা করে দেখান সরকারের পক্ষে প্রয়োজনীয় ছিল। কিছু করে দেখানো মানে গরিবদের জন্য কিছু নতুন প্রকল্প, ছোট-বড় ঋণগ্রহীতাদের পর্যাপ্ত ঋণ, তাৎক্ষণিকের জন্য হলেও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে একটা জোয়ার। এ সবের দীর্ঘমেয়াদি ফল যাই হোক না কেন। উর্জিত প্যাটেলের জায়গায় যিনি এসেছেন তিনি, অনেকেরই মনে আছে, নোটবন্দির সময় সরকারের মূল মুখপত্র ছিলেন। তাই এখনও তিনি সরকারের বিরুদ্ধে যাবেন না, এটা ধরে নেওয়া যায়।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কে নেতৃত্ব বদলের ফল কী হতে পারে? নির্বাচনের আগে সব সরকারেরই জনমোহিনী নীতি গ্রহণ করার ঝোঁক থাকে । এইসব জনমোহিনী নীতির দীর্ঘমেয়াদি ফল অনেক ক্ষেত্রেই ভাল হয় না। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার কাজ নিরপেক্ষ থেকে এই ধরনের নীতির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা। নেতৃত্ব বদলের পরে সেই কাজটা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কতটা করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিচ্ছে। সুদের হার খুব বেশি কমতে না দিয়ে নগদের জোগানকে নিয়ন্ত্রণ করে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং সেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে দিয়ে মূল্যবৃদ্ধিকেও আটকে রাখে। সরকারের দাবি মেনে যদি এখন এই শীর্ষ ব্যাঙ্ক সুদের হার কমাতে শুরু করে এবং তার ফলে কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কগুলো যথেচ্ছ ধার দিতে শুরু করে, তাহলে দুটো জিনিস ঘটার সম্ভাবনা। এক, যে মূল্যবৃদ্ধির হারকে বেশ কিছুদিন বশে রাখা গিয়েছিল সেটা আবার লাগামছাড়া হয়ে যেতে পারে। দুই, ব্যাঙ্কগুলির অনাদায়ী ঋণ বেড়ে গিয়ে দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটতে পারে। সেই ডামাডোলের বাজারে ভাল বিনিয়োগকারী, যাঁরা দীর্ঘমেয়াদি ফলের কথা মাথায় রেখে বিনিয়োগ করতে চান, সম্ভবত বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকবেন। বিনিয়োগ করবেন তারাই যাঁরা চটজলদি ফল চান, যাঁদের বিনিয়োগে প্রছুর ঝুঁকি আছে , যাঁরা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা  নিয়ে ফেরত দেন না।

আসল কথা হল, গণতন্ত্রে একটা নির্বাচিত সরকারের হাতে অসীম ক্ষমতা থাকে, সে চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্ত কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলি করতে নেই। গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই করতে নেই। জানি না, বর্তমান সরকার সে কথা বোঝে কি না। নির্বাচনের আগে চৌকিদার চোর না সাধু তা নিয়ে খুব তরজা চলেছিল। আমরা সেই তরজা আবার নতুন করে শুরু করতে চাই না। শুধু ক্ষমতাধারীদের কাছে করজোড়ে অনুরোধ করতে চাই, চৌকিদারের উপর চৌকিদারি করা যে প্রতিষ্ঠানগুলির মৌলিক দায়িত্ব, দয়া করে তাদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিন।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial