ক্ষমতার রাজনীতি বনাম রাজনীতির ক্ষমতা

পূর্ণেন্দু বসু

কেন্দ্র ক্ষমতা দখল করার পর গত পাঁচ বছর ধরে ক্ষমতার রাজনীতি কাকে বলে বিজেপি তা দেশবাসীকে বুঝিয়ে ছাড়ছে৷ রাজনীতির ইতিহাসে ক্ষমতা শাসকদের অনেককেই কীভাবে উদ্ধত, সর্বগ্রাসী, কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী করে তোলে, তার কথা স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে৷ যাদের মধ্যে অগ্রগণ্য হিটলার৷ আবার ইতিহাসে সেই শাসকদেরও দৃষ্টান্ত আছে– যাঁদে জনহিতৈষী শাসক বলা হয়৷ জনবিরোধী ও জনবন্ধু- এই দু’প্রকারের শাসক সম্পর্কেও ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়৷ আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা অনেক স্বৈরাচারী শাসকের উপস্থিতি দেখতে পাই৷ সেদিক থেকেই জনবিরোধী ও জনবন্ধু সরকারের কথা বলা হয়৷ আমাদের দেশের বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলে ২০১৪ থেকেই দেখতে পাচ্ছি যে, দেশের শাসকরা কেমন করে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে চলেছেন৷ ক্ষমতার দম্ভ নষ্ট করছে মানুষের সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে। বিজেপি তার শাসনকালের শুরু থেকেই মানুষে-মানুষে বিভাজনের রাজনৈতিক খেলা খেলে চলেছে৷ বহুত্ববাদী ভারতে হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচি নিয়ে চলছে এই সরকার৷ অসহিষ্ণুতার অপ-মতাদর্শকে হাতিয়ার করে বিরোধী মতাদর্শের মানুষের উপর জঘন্য প্রতিহিংসামূলক কাজকর্ম চলছে একনাগাড়ে৷ যে মতাদর্শের জোগান দিচ্ছে আরএসএস-সহ সংঘ পরিবারের নানা সংগঠন৷ বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিম, দলিত এবং মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবীদের উপর যে আক্রমণ চলছে, কেন্দীয় ক্ষমতা হস্তগত থাকায় শাসকরা সহজেই আক্রমণকারীদের প্রশ্রয় দিতে পারছে।

ক্ষমতার রাজনীতিকে ব্যবহার করে, সংসদকে এড়িয়ে, এমনকী নিজেদের মন্ত্রী-এমপি এবং দলীয় নেতৃত্বকে আড়াল করে দেশের একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷ যার বড় দৃষ্টান্ত হল— নোটবন্দির সিদ্ধান্ত৷ রাষ্টীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে দখল করা হয়েছে– ক্ষমতাধারীদের তল্পিবাহকদের দিয়ে৷ দেশের ইতিহাসকে বদলে দেওয়া হচ্ছে সংঘবাদীদের মতের পক্ষে৷ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্ট চলছে কুসংস্কার ও অপবিজ্ঞানকে সমানে এনে জনমত গুরুত্ব পাচ্ছে না, শাসকদের মতকেই একমাত্র সত্য বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্ষমতার জোর৷ ‘মন্দির-মূর্তিরথ’ হয়ে উঠছে শাসকদের প্রধান হাতিয়ার দুর্নীতি-বেকারি, নুন্নয়ন রুখতে সরকারি ব্যর্থতাকে দেওয়া হচ্ছে ধর্মীয় ভাবাবেগের তুফান তুলে৷ অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে- দেখানো হচ্ছে ক্ষমতার ঔদ্ধত্য। অর্থনীতির নিয়মকে অগ্রাহ্য করে বে-নিয়মী প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওরা হচ্ছে৷ ক্ষমতার রাজনীতি রাষ্টীয় প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্ব শাসন মানে না৷ প্রতিটি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে৷ সিবিআই-রিজার্ভ ব্যাঙ্ক-এর ক্ষেত্রে তাই অশোভনীয় হস্তক্ষেপ। পরিকল্পনা কমিশন তুলে দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অবাঞ্ছিত নাক গলানো, পরিকল্পনাহীন অবস্থায় জিএসটি চালু করা, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় কালো টাকা উদ্ধারের নামে নোটবন্দির তুঘলকি কার্যক্রম, বাধ্যতামূলক আধারকার্ডের নামে গরিব মানুষের বঞ্চনা, ইত্যাদি বিষয়গুলি আমরা দেখেছি– দেখেছি এগুলির কুফল৷ শাসকের জেদে অর্থনীতির বিপর্যয় আজ ভয়ানক চেহারা নিয়েছে৷

 

দেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাকে হিন্দুত্ববাদের মোড়কে আবদ্ধ করা হচ্ছে৷ রাজনীতির ক্ষেত্রে জাত-পাত-ধর্ম ও হিন্দুত্বের আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে৷ ‘এক ধর্ম-এক জাতি-এক ভাষা’-র কথা বলে ভারতের বহুত্ববাদী জীবনরেখাকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলছে সর্বত্র৷ দেশের ক্ষেত্রে নেহরুর অবদানকে অস্বীকার করে– অসত্যের আগ্রয় নিয়ে দেশনায়ক রূপে সর্দার প্যাটেলকে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে৷ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, দেশের সংবিধান-বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে৷ স্বৈরাচারী ক্ষমতার রাজনীতি, নিজের সমর্থনে একটা নিজস্ব মতাদর্শ গড়ে তোলে৷ দেশের ক্ষমতাধারী শাসকরা সেই মতাদর্শ গড়ে তোলা ও তা প্রতিষ্ঠান করার কাজ করছে ক্ষমতাকে বাবহার করে৷ রাজনীতির ক্ষেত্রে, নেহরুর উদারবাদী গণতান্ত্রিক ও বিশ্বশান্তির চিন্তাভাবনাকে বাতিল করে, বর্তমান শাসকরা মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ ও সর্দার প্যাটেলকে বড় আসন দিচ্ছেন৷ আসলে এসব লোক দেখানো৷ মূল লক্ষ্য, নিজেদের প্রতিষ্ঠান৷ কারণ দীনদয়াল উপাধ্যায়কে কখনওই আধুনিক ভারতে নেহরুর বিকল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না- একথা শাসকরা বুঝে গিয়েছেন৷

 

বিজেপি শাসকরা, সমাজ-সংস্কৃতি ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে, গো-রক্ষা, লাভ জিহাদ, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-আশাক, নরনারী সম্পর্ক– ইত্যাদির ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদী অভিযান চালিয়ে—একদিকে ‘উন্নয়নের প্রতিভূ’ হিসাবে দেশের প্রতীক করে তুলেছেন, অন্যদিকে গেরুয়া বসনধারী উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীকে সামনে রেখে হিন্দুত্ববাদের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচার ও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন৷ দু’টি ক্ষেত্রেই চলছে স্বৈরাচারী কাজকর্মেমর ধারাবাহিক অভিযান৷ একদিকে- নোটবন্দি, জিএসিট, বাধ্যতামূলক আধারকার্ডের জুলূম-সহ রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে নানা চটকদারি ঘোষণা ৷ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চলছে বিফল অতিসক্রিয়তা ৷ অন্যদিকে চলছে গো-রক্ষা, রামমন্দির, নাম পরিবর্তন এবং সমাবেশ ঘটানোর ব্যাপক সক্রিয়তা। একদিকে, বিপুল অর্থব্যয়ে সর্দার প্যাটেলের সর্বোচ্চ মূর্তি স্থাপন, অনাদিকে, আরও বড় শ্রী রামচন্দ্রের মূর্তি প্রতিষ্ঠার আয়োজন৷ গুজরাতের ও উত্তরপ্রদেশ– ক্ষমতাধরদের দুই কেন্দ্র। একদিকে রাজনীতি ও অর্থনীতির মার৷ অন্যদিকে ধর্ম ঐতিহ্যের মার৷ দুইয়ে মিলে এক৷ এতে লাভ হচ্ছে বিদেশে পলায়নকারী ধনকুবেরদের এবং হিন্দুত্ববাদী শক্তির৷ বিজেপি- শাসনে, আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও তাদের অগণিত শাখা সংগঠনগুলি হিন্দুত্ববাদী ভাবধারা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে নিজেদের বিপুল বিস্তার ঘটিয়েছে৷ ফলে, দেশব্যাপী নিজস্ব মতাদর্শ বিস্তারের ক্ষেত্রেও সংঘপন্থীরা আগের থেকে অনেক বেশি সুযোগ পাচ্ছেন৷ সুযোগ পাচ্ছেন অনুকূল রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবেশে৷ এদের আমলে রাষ্ট্র ক্রমশই হয়ে উঠছে ধর্মের বাহন৷ নেহরু ছিলেন এর ঘোরতর বিরোধী। তাই নেহরু নিশ্চিতকরণ কর্মসূচি নিয়েছে শাসকপক্ষ৷ ভারতে ধর্মপ্রাণ মানুষের সংখ্যা বিপুল৷ দেশে নানাধর্মের মানুষের বাস৷ একে ওপরের ধর্মকে শ্রদ্ধার চোখে দেখব- এটাই ভারতের আদর্শ। এখানে টান পড়লেই সমস্যা তৈরি হয়৷ সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়৷ পারস্পরিক শ্রদ্ধার এই বাতাবরণে এদেশে গড়ে উঠেছে ধর্মনিরপেক্ষতার ভারতীয়-ভাবনা৷ বিজেপি ও সংঘপক্ষীয়রা এই ভাবনায় আঘাত হানছেন৷ যার ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা৷ নষ্ট হচ্ছে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশ৷ এদিকে, চরম আর্থিক অস্থিরতা, অন্যদিকে, সামাজিক- রাজনৈতিক অস্থিরতা গোটা দেশকে, জনজীবনকে অস্থির করে তুলেছে৷ এই অবস্থায় ভাষাকে সামনে রেখে রাজ্যে রাজ্যে চলছে বাংলাভাষী ও হিন্দিভাষী মানুষের বিতাড়ন প্রক্রিয়া৷ উত্তেজনাময় পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে রাজ্যে রাজ্যে।

বিজেপি বাঙালি বিতারনের পরীক্ষাগার করতে চাইছে অসমে৷ এনআরসি-র আড়ালে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে৷ কর্নাটকে বাঙালি বিতাড়ণের ধুয়ো তুলেছে বিজেপির লোকেরা৷ গুজরাতে হিন্দিভাষী শ্রমজীবী মানুষের উপর একই প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে৷ বর্তমান শাসকরা দেশপ্রেম ও জাতিয়তার সংজ্ঞা পাল্টে দিয়েছে৷ তাদের কাছে দেশপ্রেম বলতে বোঝায়–পাকিস্তান বিরোধিতা। আর জাতীয়তা বলতে বোঝায় হিন্দু জাতীয়তা। এ- নিয়ে নানা স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে অনেক অশান্তি হয়েছে৷ দেশপ্রেম ও জাতীয়তার অন্য বয়ানে যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁদের উপর অনেক জুলুমও চালানো হয়েছে৷ উচ্চমেধার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি নিজেদের দখলে আনতে এভাবেই শাসকপক্ষীয়রা কাজ করছে৷ সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিরোধী-দূর্গ ভাঙার লক্ষ্যে নিজেদের লোককে নিয়ে আসা হচ্ছে৷ সংঘপন্থী ছাত্রদের মদত ও প্রশ্রয় দিচ্ছে শাসকপক্ষ৷ এই জমানায় শাসকপক্ষ নিজেদের পাল্টা বয়ান তৈরি করছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিকে ব্যবহার করে৷ ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, সমাজনীতি-অর্থনীতি-সহ নানা বিষয়ে বিজ্ঞান ও যুক্তির পরিবর্তে আবেগ, বিশ্বাস ও কাল্পনিক ধ্যান- ধারণাকে ভিত্তি করে শাসকরা প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজস্ব বয়ান তৈরি করেছে৷ বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর চালু ধারণাগুলিকে নাকচ করছে৷ এই কাজ করার জন্য অপব্যবহার ঘটছে রাজনৈতিক ক্ষমতার৷ এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ স্থান, সৌধ-সড়কের নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে৷ যার মূল ভিত্তি মুসলিম বিরোধিতা৷ গণতান্ত্রিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ চলছে৷ এরকম অভিযোগ সাম্প্রতিককালে বেশ শোনা যাচ্ছে৷ সুপ্রিম কোর্টের রায় সরকারের বিরুদ্ধে গেলে, শাসকপক্ষের নেতারা প্রকাশ্যেই রায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন৷ রামমন্দির নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থানকে নানাভাবে কটাক্ষ করা হয়েছে৷ শুধু তাই নয়, অযোধ্যায় সাধুসন্তদের সমাবেশ করে চাপ দেওয়া হচ্ছে৷ চাপ দেওয়া হচ্ছে দ্রুত রামমন্দির গড়তে দেওয়ার জন্য৷ শাসকদের মদত না থাকলে এসব হতে পারে না৷

ক্ষমতার রাজনীতি, অর্থবল ও পেশীবলের উপর নির্ভর করে৷ আমরা যা প্রত্যক্ষ করেছি ত্রিপুরার ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে৷ অন্যান্য রাজ্যে বিরোধী এমএলএ-দের টাকার জোরে কিনে নিয়ে সংখ্যালঘু থাকা সত্বেও সরকার গড়ার দৃষ্টান্ত সেকথাই বলে৷ বাংলা জয়ের লক্ষ্য বিজেপি অর্থ ও পেশীশক্তির ব্যবহারকে রোজকার ঘটনায় পর্যবসিত করেছে। রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতা বলে বিজেপি শাসকরা প্রতিহিংসার রাজনীতিকে একেবারে সামনে নিয়ে এসেছেন৷ বিরোধী দলগুলির উপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেত বিরোধী নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে সিবিআই এবং ইডি-কে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটাই লক্ষ্য৷ ভয় পাইয়ে আত্মসমর্পণ করানো৷ দেশজুড়ে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে৷ শাসকদের বিরুদ্ধে যাঁরাই মুখ খুলবেন, তারাই শাসক শক্তির প্রতিহিংসার শিকার হবেন। চরিত্র হনন করা হবে৷ জেলে পাঠানো হবে৷ আর শাসকপক্ষীয়দের শত খুন মাফ৷ এটাই ক্ষমতার রাজনীতি৷ মূর্তি গড়ার রাজনীতি আর হিন্দুত্বের জিগির তুলে লোকসভা ভোটে জিততে চায় বিজেপি৷ পুনর্বার ক্ষমতায় থাকতে চায়। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে পরিস্থিতির অন্য দিকটি নিয়ে অবশ্যই আলোচনা করা জরুরি৷ সেই দিকটি হল, ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিন্তু মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে৷ দ্রুত শাসকশক্তির পতনের লক্ষণগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠেছ৷ এত দন্ত, এত ঔদ্ধত্য, এত ক্ষমতার সহ্য করতে পারছে না মানুষ৷ মানুষ শান্তি চায৷ মানুষ উন্নতি চায়৷ এই অবস্থায়, শাসক বিজেপিকে রাজনীতির প্রকৃত ক্ষমতা দেখাতে হবে৷ রাজনীতির ক্ষমতা, জনসমর্থনপুষ্ট রাজনীতির ক্ষমতা, গণ-রাজনীতির ক্ষমতা। বিজেপির ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধে গণরাজনীতির প্রতিষ্ঠা, বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে–ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিষ্ঠা, বিজেপির অসহিষ্ণু রাজনীতির বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতার রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষণ নির্বাচনী সংগ্রামকে পরিচালিত করতে পারলে বিজেপিকে বোঝানো যাবে রাজনীতির প্রকৃত ক্ষমতাকে৷ রাজনীতি অনেক ব্যাপক অর্থ বহন করে৷ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, গড়ে ওঠে গণতান্ত্রিক রাজনীতি৷ যে রাজনীতি জনগণের স্বার্থরক্ষা করে, সেই রাজনীতি হল— গণতান্ত্রিক রাজনীতি ৷

 

যে- সরকার জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হয়, সেই সরকার হল, জনমুখী সরকার৷ বিজেপির সরকার হল-জনবিরোধী সরকার৷ যদি প্রশ্ন করা হয়, জনবিরোধী বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে জনমুখী রাজনীতির পক্ষে সাম্প্রতিক ভারতে কার ভূমিকা সবার আগে রয়েছে? এক কথায় তার উত্তর হল, জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷ বর্তমান জমানা শুরুর আগে থেকেই এই লড়াই তিনি শুরু করেছেন৷ সংগ্রামে তিনি বামফ্রন্টকে পরাজিত করে নতুন জনমুখী সরকার গড়েছেন পশ্চিমবঙ্গ৷ কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের প্রতিটি জনবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একেবারে শুরু থেকেই তাঁর নেতৃত্বে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে৷ গণতান্ত্রিক আদর্শভ্রষ্ট বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকদের জনবিরোধী রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার জনস্বার্থবাহী নীতির পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে৷ নোটবন্দি থেকে শুরু করে জিএসটি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুলিতে সরকারি হস্তক্ষেপ, শাসকপক্ষীয় বিভাজনের রাজনীতি, ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করা, সরকারের এককেন্দ্রিক স্বৈরাচারী প্রবণতা– সবকিছুর বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন৷ বাঙালি বিরোধিতার রাজনীতির বিরুদ্ধেও তিনি রুখে দাড়িয়েছেন৷ তিনি ব্যক্তি বা রাজনীতির ক্ষমতার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষমতায় বিশ্বাসী৷ তাই তিনি আজ বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ৷ মানুষের পক্ষে আপোসহীন লড়াই তাঁকে এই অগ্রণী ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করেছে৷ এটাই হল রাজনীতির ক্ষমতা৷ যার আধার হল মানুষ৷ মানুষই শেষ কথা বলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়৷ সেই মানুষের উপর বিশ্বাস রেখে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি বিজেপির বিরুদ্ধে একের বিরুদ্ধে এক–এই কৌশল নিয়ে লড়াই গড়ে তুলতে পারলে বিজেপির পরাজয় নিশ্চিত৷ বিজেপির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করাটাই এখন সবথেকে বড় জনস্বার্থবাহী রাজনীতির এখনকার ভিত্তি এটাই৷ ক্ষমতার লোভ নয়৷ অর্থের লোভ নয়৷ পেশীশক্তি কিংবা অর্থশক্তির উপর অবাঞ্ছিত নির্ভরতা নয়। মানুষের শক্তির উপর বিশ্বাস রাখাটাই হল রাজনীতির আসল ক্ষমতায় উৎস৷ মানবিকতা ও মানবসেবাই হল রাজনীতির মূল ধর্ম। এই মূল্যবোধেরই আজ বড় অভাব৷ তাই অপদার্থ অযোগ্যরাই আজ রাজনীতির ‘মহাপুরুষ’ সেজে বসে আছেন। এরই বিরুদ্ধে আজ রাজনীতির নীতিনিষ্ঠ লড়াই গড়ে তোলার প্রকৃষ্ট সময়৷ বিজেপিকে পরাজিত করতে গেলে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই হবে৷ গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষমতা কোনও ব্যক্তির ক্ষমতা নয়, ব্যক্তি গণ প্রতিনিধি মাত্র৷ এই অর্থেই ভারতীয় রাজধর্মের আলোচনা হয়েছে যুগে যুগ। সেই রাজধর্ম পালনে ব্যর্থ বিজেপি-নেতারা৷ তাই বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ে সফল হওয়ার জন্য চাই রাজধর্ম পালনের দৃঢ় অঙ্গীকার৷ সাংবিধানিক শাসক প্রতিষ্ঠার শপথ৷ লক্ষ কোটি ভারতবাসীর আশীর্বাদ পেতে হলে এই অঙ্গীকার, এই শপথ গ্রহণ করতেই হবে- গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কথা এটাই। এর থেকেই জন্ম নেয় রাজনীতির ক্ষমতা৷ এটাই গণদর্শন৷ এটাই রাজনৈতিক বীক্ষা বা রাজনীতির দার্শনিক দষ্টিকোণ৷

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers