ক্ষমতার দম্ভ

পূর্ণেন্দু বসু

পয়লা জানুয়ারি, ২০১৯। নতুন বছরের প্রথম দিন৷ একটি বেসরকারি টেলিভিশন সংস্থাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ রামমন্দির নির্মাণ প্রশ্নে অর্ডিন্যান্স জারির সম্ভাবনা, রাফাল যুদ্ধবিমান চুক্তি বিতর্ক, তিন তালাক-সহ নানা বিষয়ে নিজের মত দিয়েছেন৷ লোকসভা ভোট দোরগোড়ায়৷ তারপর নতুন লোকসভা গঠিত হবে৷ গড়ে উঠবে নির্বাচন পরবর্তী সরকার৷ টেলিভিশনের মুখোমুখি হয়ে দেশবাসীর কাছে তিনি কী বার্তা দিতে চাইলেন?
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদী নিজেকে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী বলে দাবি করেন৷ তার সরকার সবধরনের দুর্নীতি থেকে মুক্ত এমন প্রচারই তিনি করে থাকেন৷ গত সাড়ে চার বছরে তিনিই দেশকে সবক্ষেত্রে উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছেন বলে দাবি করেন৷ এসব বলে তিনি বেশ তৃপ্তি পান৷ একথাগুলি আমরা জানি৷
বছরের প্রথম দিনে নরেন্দ্র মোদী হাস্যকর যুক্তি দিয়ে এমন কিছু কথা বললেন, যা শুনে মনে হবে তিনি নিজের কথা কি নিজে শুনতে পান না?
তার কথায় তিন তালাকের প্রশ্নটি হল, লিঙ্গসাম্যের বিষয়৷ আর শবরীমালায় মহিলাদের প্রবেশাধিকারের প্রশ্নটি নাকি প্রথার বিয়য়। এই হাস্যকর যুক্তি তিনি দিলেন কেমন করে? একটা অধিকার, আর অপরটা প্রথা? এ কথা বলার সময় তার কোনও খটকা লাগে না? তিনি যা বলেছেন, তা কি না বুঝে বলছেন৷
মোদী আর একটি কান্ডজ্ঞানহীন কথা বলেছেন৷ তার মতে, রাফাল চুক্তি নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, তারা দেশের সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে চান৷ এই কান্ডজ্ঞানহীন যুক্তি তিনি অবলীলায় দিয়ে দিলে। এর অর্থ দাড়ায় তার কোনও সমালোচনা করা যাবে না৷ তিনি সমালোচনার ঊর্ধে তিনি নিজেকে কী ভাবেন? তিনি যা বলবেন মানুষ কি সেটাই মেনে নেবে? এই ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাস আসে কোথা থেকে?

মোদীর কথায়, তার আমলে যাঁরা ছেড়ে পলায়ন করেছেন, তিনি তাদের দেশে ফিরিয়ে আনবেন। এই কথাটি শুনে কেউ কি হাসি চাপতে পারবেন? নীরব মোদীরা পর্যন্ত খিল খিল করে হেসে উঠবেন তার কথা শুনে৷ পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে পরাজয় সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, পাঁচ বছরে তারা এমন কোনও ভুল বা এমন কোনও অন্যায় করেনি, যাতে মানুষ তাদের উপর রুষ্ট হতে পারেন। কী গভীর প্রত্যয়! মানুষকে কি ভাবেন মোদী?

এসব মোদী-ম্যাজিক কি না জানি না৷ এতে বিজেপির ভোটের ঝুলি ভরবে কি না, তা মোদী জানেন৷ কিন্তু, আমরা দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলব, সাড়ে চার বছর এনডিএ শাসন সাধারণ মানুষের পক্ষে মোটেই ভাল যায়নি৷ সংখ্যালঘুরা ক্রমেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পর্যবসিত হয়েছেন৷ যোগী আদিত্যনাথ প্রমাণ করলেন, এই জমানায় একজন মুসলমানের প্রাণের দামের তুলনার গরুর দাম অনেক বেশি৷ দলিতদের হয়রানি কমেনি বলেই শেষ পর্যন্ত তাঁরা রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন৷ আধার কার্ডের অভাবে একাধিক মানুষ অনাহারে মারা নিয়েছেন৷ কৃষকরা শুকনো ও নির্বাচনী ঋণমকুব ছাড়া কিছুই পাননি৷ তেলের দাম বেড়েছে, টাকার দাম কমেছে৷ দুর্নীতি কমেনি৷ কর্মসংস্থান যোজনায় কাজ কমেছে। চাকরি জোটেনি৷ পকোড়া ভাজার বিধান মিলেছে। আর মিলেছে নেট বাতিলের তান্ডব। কালো টাকা কমেনি। সন্ত্রাসবাদ প্রমাণিত হয়নি৷ নকল টাকা আরও বেডেছে৷ নোটবন্দির কারণে, কত মানুষ প্রাণ হারালেন- তাঁর কোনও জবাব নেই৷ প্রধানমন্ত্রী নোট বাতিলের আত্মগর্বে গর্বিত। এত সব নমুনা। তারপরও প্রধানমন্ত্রী কোনও ভুল না করার কথা বলছেন।

প্রধানমন্ত্রী যখন তাঁর সাক্ষাৎকারে পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের অভাবের কথা বললেন, তখন কি তাঁর কানাইয়া কুমারের কথা, ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নওলখাদের কথা মনে পড়েনি? গৌরী লঙ্কেশ, এম কালবুর্গি, দাভালকার ও অন্যান্যদের কথা কি ভুলে গেলেন প্রধানমন্ত্রী! প্রবীণ সাংবাদিক প্রণয় রায়ের বাড়িতে মধ্যরাত্রে আয়কর হানার কথাও কি ভুলে গিয়েছেন তিনি? যাঁর শাসনকালে লক্ষণগুলি ক্রমশই প্রকট হচ্ছে, তাঁর মুখে কি গণতন্ত্র রক্ষার কথা সাজে? যিনি গত সাড়ে চার বছরে কখনও সাংবাদিক সম্মেলন ডাকার সাহস পাননি, তিনি কথা বলছেন! তাঁর আমলেই তো, নাগরিকপঞ্জি নির্মাণের ছলনায় সংখ্যালঘুদের একঘরে করার ছক তৈরি হয়েছে। তাঁর আমলেই ক্রিকেট খেলায় কেউ পাকিস্তানকে সমর্থন করলে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়৷ কাশ্মীরে মুসলিম বালিকার যৌন নির্যাতন ও হত্যার পর তাঁর দল অন্যায়কারীদের প্রকাশ্য সমর্থন দেয়৷ আর তিনিই একের পর এক অভিযোগ আনলেন বিরোধীদের বিরুদ্ধে! এসবই তাঁর ঔদ্ধত্য, তাঁর ক্ষমতার দম্ভ। কোনও কথা বলার আগে, কীবলছেন, তা ভেবেও দেখেন না তিনি৷ তাই এত অযৌক্তিক কথার ছড়াছড়ি৷

আমরা স্মরণ করতে পারি, সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় দিল্লির মসনদে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। দীর্ঘ এই সময়কালে কোনও সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেননি তিনি৷ যা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে একান্তই বিরল ঘটনা। যে কোনও রাষ্ট ব্যবস্থায় সরকারকে দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। সংবাদমাধ্যম সেক্ষেত্রে একটা বড় হাতিয়ার৷ নরেন্দ্র মোদী সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত সংবাদমাধ্যমকেই বেছে বেছে সাক্ষাৎকার দেন৷ এই সমালোচনা বারবার বারবার উঠলেও প্রধানমন্ত্রী তাতে কর্ণপাত করেননি৷ কারণ, সাংবাদিকদের খোলামেলা প্রশ্ন করার কোনও সুযোগই তিনি দিতে নারাজ।

আলোচ্য সাক্ষাৎকারটির বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে যে, প্রধানমন্ত্রী বিজের উত্তরগুলি পাঠিয়ে দেওয়ার পর কি সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন স্থির করা হয়েছিল৷ সাক্ষাৎকারটি দেখা ও শোনার পর, এই প্রশ্ন ওঠা কিন্তু একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। এ প্রশ্নও উঠছে যে, প্রশ্নগুলিকে নিদেনপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের ছাড়পত্র জোগাড় করতে হয়েছিল কি না? প্রশ্নগুলি ছিল অতি সহজ। প্রধানমন্ত্রীকে চেপে ধরার কোনও প্রচেষ্টাই সাক্ষাৎকারে ছিল না৷ সাড়ে চার বছরে তাঁর ভূমিকা দেখে প্রশ্নগুলি ওঠা সত্যিই খুবই স্বাভাবিক।

এ প্রশ্নও উঠছে যে, তবে কি সাক্ষাৎকারটি ছিল নিছক নির্বাচনী প্রচারের সূচনাপর্ব? যাই হোক না কেন, নরেন্দ্র মোদী তাঁর সাক্ষাৎকারে বর্তমান শাসনের ব্যর্থতার দিকগুলি আড়াল করতে চেয়েছেন। দাম্ভিকরা সাধারণত নিজেদের ভুল স্বীকার করে না৷ নরেন্দ্র মোদীর ক্ষেত্রেও সেকথা প্রযোজ্য। একনায়কতন্ত্র বিশ্বাসীরা এরকমই হন৷ কম্পিত সত্যকেই তাঁরা প্রকৃত সত্য বলে মনে করেন। রাজার ভুল হয় না – এটাই এঁদের ভিতরকার বিশ্বাস। এই একনায়কতন্ত্রী মানসিকতা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে ভয় পায়৷ এঁদেরমনোভাব হল – এঁরা বলবেন, মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনবেন৷ হাততালি দেবেন এঁদের নামে জয়ধ্বনি করবেন। বিপাকে পড়লে এঁদের হয়ে বলবেন অন্যরা৷ পয়লা জানুয়ারির সাক্ষাৎকারটি হল, ‘আমি আছি’–এটা ঘোষণা করা৷ এটাই তার বাণী৷ নিজের ঢাক নিজে পেটানোর ব্যাপারে নরেন্দ্র ভাই দামোদারদাস মোদীর জুড়ি মেলা ভার মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান তাকে একটুও দমাতে পারেনি৷ গর্বের জন্য সেকথাই তো বললেন তিনি৷ রামমন্দির ইস্যুকে সযত্বে সুপ্রিম কোর্টের দিকে ঠেলে দিয়ে তিনি একদিকে নিজের সাংবিধানিক অবস্থানকে ঘোষণা করে, অন্যদিকে উগ্র হিন্দু শিবিরের সমালোচনা না করে তাদের কাজের প্রতিও মৌন সমর্থন জানালেন৷ এটা মোটেই উগ্র হিন্দু শিবিরকে শান্ত করার চেষ্টা নয়৷ জীবনের চেয়েও বড় করে মোদীকে দেখানো হয়েছে৷ কখনও জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতো চরকা কাটার ছবি তোলা হয়েছে মোদীর। কখনও বা নেতাজির মতো টুপি পরে নিজেকে কিংবদন্তি নেতাদের সমতুল্য ভাবার চেষ্টা করেছেন তিনি৷

অনেক কথা বললেন, অথচ নরেন্দ্র মোদী উত্তর দিলেন না, মুসলিম নামের কেউ অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে মুখ খুললে কেন তাকে দেশবিরোধী বলে দেগে দেওয়া হবে৷ কেন কোনও একপক্ষের (পড়ুন গেরুয়া শিবিরের) ইচ্ছা-অনিচ্ছা দেশের ভালমন্দের নির্ণায়ক হয়ে উঠবে৷ কোন অধিকারে তারা সাধারণ মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে? এ কোন গণতন্ত্র যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাক্- স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারে কথা ব্যক্ত করা যাবে না? ধর্মের নামে ক্ষমতা দখলের যে চক্রান্ত চলছে, তার বিরুদ্ধে মুখ খুললেই তাকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে ধিক্কার জানানো হবে–এ কোন গণতন্ত্র শাসকরা এর জবাব দিতে পারছেন না। তাই আগডুম-বাগড়ুম কথার ফুলঝুরি৷ নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাৎকার এর থেকে বেশি কিছু নয়৷ আজ শাসকের ঔদ্ধত্য ও দন্তের বিরুদ্ধে সমবেত কণ্ঠে আওয়াজ তোলার সময়৷ আমরা আমাদের বিবেকবোধ কোনও ক্ষমতার চোখরাঙানির কাছে বন্ধক রাখব না৷ এই দেশ আমাদের সবার৷ তাই দেশের ভালো-মন্দের সব ব্যাপারে আমাদের চিন্তা-ভাবনা ও উদ্বেগ প্রকাশের অধিকার আছে৷ নাসিরুদ্দিন শাহ-সহ ভারতের যে কোনও নাগরিক তার আশঙ্কা, আতঙ্ক, মতামত প্রকাশ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললে, তার মুখ বন্ধ করার অধিকার কারোর নেই৷ বাকস্বাধীনতা প্রত্যেকের আছে৷ আছে অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশের অধিকারও৷ বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলি কেড়ে নেওয়ার সমস্ত ফন্দি-ফিকির অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার৷ ক্ষমতার দন্ত চূর্ণ হবেই৷ মানুষ এখন তারই প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন৷ নরেন্দ্র মোদীরা এখনও দেওয়াল লিখন পড়তে পারেননি৷ ক্ষমতার দম্ভ মানুষ সহ্য করেন না৷ মানুষ জবাব দেবেন যথাসময়ে। আগামী লোকসভা নির্বাচন হল সেই সময়৷

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers