ক্রমাবনতির সংকেত পেয়ে কৃষকদের আত্মহত্যার রিপোর্ট প্রকল্প বন্ধ রেখেছে মোদি সরকার

ড. দেবনারায়ণ সরকার

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তার বিখ্যাত ম্যাকবেথ নাটকে লিখেছিলেন, “মিথ্যাবাদী হৃদয় যেটা জানবে। মিথ্যেবাদী মুখ তো সেখানে লুকাবেই।” (False face must hide what the false heart doth know”)। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত সাড়ে চার বছরের শাসনকালে ভারতবাসীর কাছে মোদির প্রতিশ্রুতির বিস্বাসঘাতকতা ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলেছে। কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে কৃষকদের জন্য ওয়াদা, বিদেশ থেকে কালো টাকা এনে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা প্রদান করা, দেশের মধ্যে জাল টাকা, কালো টাকা, সন্ত্রাসবাদ, অর্থনৈতিক, সমৃদ্ধি ইত্যাদি প্রত্যেকটি বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি পালনে তিনি চরমভাবে ব্যর্থ। আরও মর্মান্তিক ও ভয়াবহ বিষয় হল মোদি সরকার তার এই বিশ্বাসঘাতকতা ঢাকতে দেশের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা হরণ করে সেই প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতা কার্যত স্তব্ধ করেছে যেটা অতীতে ঘটেনি।

যেমন ধারাবাহিকভাবে ভারতের অর্থনৈতিক সম্বৃদ্ধ পরিমাপের জন্য স্বশাসিত সংস্থা জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের (এনএসসি) স্বাধীনতা হরণ করে কার্যত ‘নীতি আয়োগ’ নামক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে মোদির আমলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হারকে উচ্চতম জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে, যা অতীতে কখনও ঘটেনি। সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিমন্ডল এটাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েচ্ছে। আসলে মিথ্যাবাদী হৃদয় যেটা জেনীছে, সেখানে অবশ্যই মিথ্যাবাদী বা বিশ্বাসঘাতক মুখ জোর করে সত্যবাদী করার চেষ্টা করলেও মানুষ এটা ধরে ফেলেছে। শুধু তাই নয় মোদি সরকারের কাছে ভারতবাসীর প্রশ্ন: কেন ২০১৬-র পর থেকে কর্মসংস্থান সম্পর্কে কেন্দ্রীয় শ্রম দফতরের রিপোর্ট জনগণের সামনে প্রকাশ করা হচ্ছে না? একইভাবে ২০১৫-র পরে ভারতে কৃষকদের আত্মহত্যার রিপোর্ট (যা ন্যাশনাল ক্রাইম রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে) কেন প্রকাশ করেনি কেন্দ্র? তাই সঙ্গত প্রশ্ন, বর্তমান মিথ্যেবাদী সরকার সত্যের সামনে আসতে কেন ভয় করছে?

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী রাধামোহন সংসদে জানিয়েছেন ২০১৬ আল থেকে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো কৃষক আত্মহত্যা নিয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করা বন্ধ করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ দিনেশ ত্রিবেদীর প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রিয় কৃষিমন্ত্রী বলেন, যে কৃষক আত্মহত্যা নিয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এনসিআরবি-র রিপোর্ট তাদের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে পরবর্তী বছরগুলিতে এ নিয়ে কোনও রিপোর্ট পেশ করেনি তাকে।

অথচ গত মার্চে ওই কৃষমন্ত্রীই ২০১৬ সালের কৃষক আত্মহত্যা নিয়ে আনুমানিক তথ্য সাংসদে পেশ করেছিলেন। সেই তথ্যে তিনি বলেছিলেন ২০১৬ সালে ভারতে ১,৩০০ জন কৃষক এবং খামার শ্রমিক আত্মঘাতী হয়েছিলেন যা কি না ২০১৫-র তুলনায় কিছুটা কম। ভারতে এন এনআরসিবি-র রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ সালে কৃষক ও খামার কৃষকদের আত্মহত্যাদের পরিমাণ ছিল ১২,৬০২ জন।

প্রশ্ন হল, কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী যখন গত মার্চে ভারতে কৃষক আত্মহত্যা নিয়ে ২০১৬ সালের আনুমানিক তথ্য পেশ পেশ করেছিলেন তিখন কীসের ভিত্তিতে এতা পেশ করেছিলেন? এখন কেন তিনি বলছেন ২০১৫ সালের পরে ভারতে কৃষক আত্মহত্যা নিয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা বন্ধ রেখেছে তার সরকার? তাহলে কোন ভিত্তিতে ২০১৬-র আনুমানিক তথ্য পেশ করা হল? সেটা কি মোদি সরকারের ঘরে বসে তোইরি করা রিপোর্ট ছিল, যাতে ভারতবাসী মনে করে মোদির আমলে কৃষকের আত্মহত্যা কমেছে। তাই তো শেক্সপিয়ার লিখেছিলেন, মিথ্যেবাদী হৃদয় সত্য সম্পর্কে যখন জানতে পারে, তখন মিথ্যাবাদী মুখ অসত্য তথ্য দিয়ে সত্য লুকানোর চেষ্টা করে। এই ঘটনা ভারতে ধারাবাহিকভাবে ঋণের জালে কৃষক আত্মহত্যা নিঃসন্দেহে একটি অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। গত ২০ বছরে ভারতে আড়াই লক্ষেরও বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছে। আর এটাও সত্য যে ভারতে গত ২০ বছরের তথ্যে স্পষ্ট ৭টি রাজ্যে—মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, তেলেঙ্গানা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ু—গড়ে প্রতিবছর ৮০ শতাংশের বেশি কৃষক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছে। শেষোক্ত ২০১৫-র এনআরসিবি-র তথ্যে দেখা যাচ্ছে উপরোক্ত ৭টি রাজ্যে মোট কৃষকদের আত্মহত্যা ঘটেছে ১২,৬০২ জনের। অর্থাৎ ২০১৫ সালে মোট কৃষক আত্মহত্যার ৮৭.৫% ঘটেছে উপরোক্ত ৭টি রাজ্যে।

প্রশ্ন হল, ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো ২০১৬ সালের পুর্ব পর্যন্ত কৃষকদের আত্মহত্যার যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে মোদির আমলে কৃষকদের আত্মহত্যার রিপোর্ট কি উর্ধ্বগামী? পরিসংখ্যানে আসা যাক। মনমোহন সিং-এর আমলে শেষ বছরে অর্থাৎ ২০১৩ সালে ভারতে মোট কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা ১১,৭৭২ জন। ২০১৪-র মে থেকে মোদি সরকারের আমল শুরু হয়। ২০১১-তে কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা ১২,৩৬০ জন। তথ্যে স্পষ্ট মোদির আমলে প্রথম বছরে মোনমোহন সিং-এর শেষবছরের তুলনায় কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা ৫% বেড়েছে। ২০১৫ তে কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা ১২,৬০২ জন। একইভাবে ২০১৪-র তুলনায় কৃষকদের আত্মহত্যা ২০১৫-তে ২ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্ট রিপোর্টে এটা স্পষ্ট যে মোদির আমলে প্রথম ২ বছরে কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা ও অনুপাত ক্রমশ বেড়েছে।

প্রথম বছর বেড়েছে ৫ শতাংশ, দ্বিতীয় বছর বেড়েছে ২ শতাংশ। এমতাবস্থায় সারা ভারতবাসীর পক্ষ থেকে মোদি সরকারের কাছে প্রশ্ন হল, কৃষকদের আত্মহত্যা মোদির আমলে ক্রমশ বাড়ছে বলেই কি মোদি সরকার ২০১৫ সালের পর থেকে ভারতে কৃষক আত্মহত্যার রিপোর্ট পেশ করছে না? নিঃসন্দেহে এটা সবারই মনে হবে যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তথ্য লুকোচ্ছে বর্তমান সরকার। একইভাবে মোদি সরকার তথ্য লুকোচ্ছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও। ধারাবাহিকভাবে ভারতের শ্রম দফতর দেশের কর্মসংস্থান নিয়ে তথ্য পেশ করে চলেছে। কিন্তু মোদি-সাম্রাজ্যে ২০১৬-র পরে সেটা বন্ধ। মোদির ওয়াদা ছিল প্রতিবছর ২ কোটি কর্মসংস্থান। শ্রম দফতরের রিপোর্টে -তে ১.৫৫ লক্ষ ও ২০১৬-তে ২.৩১ লক্ষ। অর্থাৎ বছরে মোট ৩.৮৬ লক্ষ। প্রতি বছরে গড়ে ২ লক্ষেরও কম। মোদির ওয়াদার ১০০ ভাগের ১ ভাগও নয়। তাই অবস্থা বেগতিক দেখে শ্রম দফতরের রিপোর্ট বন্ধ করে দিয়েছে মোদি সরকার।

ভারতে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা হরণের নির্মন পরিহাস পূর্বে কখনও ঘটেনি। কর্মসংস্থান হোক, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হোক অথবা কৃষক আত্মহত্যা হোক, প্রতিটি ক্ষেত্রে মোদি সরকারের নির্মম হস্তক্ষেপ। তিন রাজ্যে হারার পরে এবার ব্যক্তি স্বাধীনতার উপরেও নির্মম হস্তক্ষেপ মোদি সরকারের। কার্যত অসত্যের বিদায়… সংকেত।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers