কেন্দ্রের ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্প ব্যর্থ, সাফল্যের নয়া মুকুট ‘কন্যাশ্রী’র

ডঃ দেবনারায়ণ সরকার

নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান বলেছিলেন, “একটা বড় ত্রুটি হল নীতি ও কর্মসূচি বিচার করা হয় ফলাফলের চেয়ে বরং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের উপর” (“One of the great mistakes is to judge policies and programs by their intentions rather than their results.”)। এটা ঘটনা যে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বহু চরিত ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল স্কুলছাত্রীদের স্কুলছুট কমানো এবং মেয়েদের শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী ও তাদের ক্ষমতায়নকে প্রতিষ্ঠিত করার অন্যতম প্রধান উপায় হিসাবে৷ পক্ষান্তরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যাশ্রী প্রকল্পও একই উদ্দেশ্যে বাংলায় কার্যকর করা হয়েছিল৷ অর্থাৎ উভয় প্রকল্পেরই উদ্দেশ্য একই৷ কিন্তু ফলাফলে দেখা যাচ্ছে আকাশ-পাতাল তফাৎ৷ হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলি যেমন গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলিতে বহুদিন বিজেপি ক্ষমতায় থাকা সত্বেও ১৫-১৬ বছর বয়সী (নবম দশম শ্রেণি) ছাত্রীদের স্কুলছুটের হার যথেষ্ট ঊর্ধ্বমুখী৷ অন্যদিকে কার্যত কন্যাশ্রীর উপর এক্ষেত্রে যথেষ্ট সাফল্য মিলেছে পশ্চিমবঙ্গে৷ সাধারণ রাজ্যগুলির মধ্যে তৃতীয় স্থানে এবং ভারতের সমস্ত রাজ্যগুলির মধ্যে ৬ষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ৷ বর্তমান নিবন্ধে এ সম্পর্কে সর্বভারতীয় সমীক্ষার বিষয় পর্যালোচনা করা হল৷

স্কুলশিক্ষার সার্বিক হাল নিয়ে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে “অ্যানুয়াল স্টেটাস অফ এডুকেশনাল রিপোর্ট (ASER)” বার্ষিক সমীক্ষা করে থাকে৷ পশ্চিমবঙ্গে ২০১০ সালে ১৫-১৬ বছর বয়সি (নবম-দশম শ্রেণি) ছাত্রীদের স্কুলছুটের হার যেখানে ছিল ১৭.৫ শতাংশ, সেখানে তা ২০১৮-তে কমে দাড়িয়েছে ৪.৮ শতাংশ৷ অর্থাৎ ৮ বছরে এইহার কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ৷ স্কুলছুটের কমার এই হার লক্ষ্যণীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে ২০১২ থেকে যখন এই রাজ্যে চালু হয়েছে কন্যাশ্রী প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গে কন্যাশ্রীর সাফল্যের স্বীকৃতি আগেও একাধিক সমীক্ষায় উঠে এসেছিল। তবে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় স্কুলশিক্ষায় কন্যাশ্রীর প্রভাবকে সবথেকে বড় প্রমাণ হিসাবে মেনে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় রিপোর্ট, সমাজতত্ববিদ ও শিক্ষাবিদেরা। নবম-দশম শ্রেণির ছাত্রীদের স্কুলছুটের সাফল্য কার্যত হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলিতে আসেনি বললেই চলে৷ ২০১৮ সালে দেখা যাচ্ছে গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, ছত্তিশগড় এবং রাজস্থান এই হার সামান্য কমে দাড়িয়েছে যথাক্রমে ২৪.৯, ২২.২, ২১.২ এবং ২০.১ শতাংশে৷ অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশে বরং নবম-দশম শ্রেণির ছাত্রীদের স্কুলছুটের হার বেড়ে দাড়িয়েছে ২৬.৮ শতাংশ৷ কার্যত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে (সাম্প্রতিক নির্বাচনে যদিও বিজেপির থেকে ৩টি রাজ্য হাতছাড়া হয়েছে) ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’-এর সাফল্য যে আসেনি তা সর্বভারতীয় সমীক্ষা থেকেই স্পষ্ট।

কার্যত মোদী সরকারের ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’-এর সাফল্য না আসাই স্বাভাবিক। কারণ উদ্দেশ্য মহৎ হলেও, এই মহতি প্রকল্পে সারা ভারতে মোদী সরকারের আর্থিক বাজেট অতি নগন্য৷ ১৩০ কোটি জনসংখ্যা বিশিষ্ট ৩৬টি রাজ্যের জন্য এই প্রকল্পের খরচ শুরু হয়েছে মাত্র ১০০ কোটি দিয়ে৷ এমনকী অদ্যবধি এই প্রকল্পে খরচ বরাদ্দের বৃদ্ধিও তলানিতে৷ পক্ষান্তরে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের এই প্রকল্পে বার্ষিক বরাদ্দ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। পার্থক্যটা স্পষ্ট৷ ১৩০ কোটি জনসংখ্যার জন্য বরাদ্দ যেখানে মাত্র ১০০ কোটি, সাড়ে ন’ কোটি জনসংখ্যার জন্য শুধু পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ প্রায় দেড় হাজার কোটি। মোদীর ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য মহান হলেও, প্রকল্পে বরাদ্দ অতি নগন্য৷ পক্ষান্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য মহান এবং প্রকল্পে বরাদ্দও যথেষ্ট৷ তাই ফলাফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোদীর থেকে অনেকগুণ এগিয়ে।

গত ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত কন্যাশ্রী প্রকল্পের সরকারি তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৫১ লক্ষ বালিকা K1 কন্যাশ্রী প্রকল্প থেকেই প্রতি বছর আর্থিক সাহায্য পেয়েছে গত ৬ বছরের মধ্যে৷ ১৮ বছরে এককালীন ২৫ হাজার টাকা (K2 প্রকল্প) অর্থ সাহায্য পেয়েছে প্রায় ১৬ লক্ষ বালিকা৷ প্রকল্পে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের বর্তমান বছর থেকে প্রতি বছর ১ হাজার টাকা করে অর্থসাহায্য দেওয়া হচ্ছে৷ পূর্বে কন্যাশ্রী প্রকল্পে সুবিধাভোগী হতে হলে পরিবারের বার্ষিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা৷ গত ১৪ আগস্ট থেকে আয়ের ঊর্ধ্বসীমা নেই৷ যে কোনও রাজ্যের পরিবারেরই শিক্ষারত অবিবাহিত সমস্ত বালিকারা ১৮ বছর বয়স অবধি K1 ও K2 প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয়েছেন৷ এছাড়াও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে K3 কন্যাশ্রী প্রকল্পও চালু করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার৷ বিজ্ঞান শাখায় পড়লে মাসে আড়াই হাজার টাকা এবং অন্যান্য শাখায় মাসে বৃত্তি দুই হাজার টাকা। এমনকী কন্যাশ্রী প্রকল্পের মেয়েদের জন্য কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী চালু করেছেন ‘স্বপ্নের ভোর৷ খেলাধুলায় উৎসাহ দিতেও কন্যাশ্রী প্রকল্পও তিনি চালু করেছেন। কন্যাশ্রীদের উচ্চশিক্ষায় নিশ্চিতভাবে ভর্তির জন্য তিনি কয়েকদিন আগেই কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সাধারণ ডিগ্রিসহ কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার ব্যবস্থা চালু হবে। এমনকী স্কুলেও কন্যাশ্রীদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার ব্যবস্থা করছে স্কুল শিক্ষা দফতর। মোদ্দা কথা হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যাশ্রী প্রকল্প হল কন্যাশ্রীদের শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করে তোলা ও তাদের ক্ষমতায়নকে সমাজে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার একটা সর্বাঙ্গীন প্রকল্প। ইতিমধ্যেই কন্যাশ্রী প্রকল্পে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান রাজ্যের ঝুলিতে।

অথচ মোদী সরকারকে তার ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্পের ব্যর্থতাকে হজম করতে হচ্ছে। হিন্দি বলয়ে এইপ্রকল্প কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ডেও সর্বভারতীয় সমীক্ষায় নবম-দশম শ্রেণির ছাত্রীদের স্কুলছুটের হার কমার যে সাফল্য ঘটেছে তা কার্যত মোদীর ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্পের জন্য নয়। মোদী সরকার ক্ষমতায় এসেছে অল্প দিন। বিহারে নিতীশ কুমারও অল্পদিন হল বিজেপির সঙ্গে গাটছড়া বেঁধেছে। কার্যত এই রাজ্যগুলির সাফল্য মোদীর প্রকল্পের জন্য নয়। মোদীর ক্ষেত্রে ব্যর্থতা কার্যত মহতি প্রকল্পের নগন্য অর্থ বরাদ্দের জন্য। অর্থাৎ নাম কিনব, কিন্তু বরাদ্দ হবে নগন্য। ৪ বছর পরে আয়ুস্মান ভারতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ১০ কোটি পরিবারের জন্য ১ বছরে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু রাজ্যগুলিতে দিতে হবে ৪০ শতাংশ৷ ১০ কোটি লোকের জন্য এত নগন্য অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে অথচ রাজ্যগুলিকে এড়িয়ে মোদীর নাম নেওয়া হচ্ছে। এর ফলাফল কতখানি ব্যর্থ হতে পারে তা মোদীর ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রকল্প থেকে স্পষ্ট। সফলতার উদাহরণ পশ্চিমবঙ্গ।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers