কেন্দ্রের জন্যেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে আমাদের দেশে

 

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

মানবাধিকার এমন একটি শব্দ যার ব্যাপ্তি সমগ্র বিশ্বের মানবজাতির অধিকারে। বিশ্বের সর্বত্র মানবজাতির কোনও না কোনও অংশ বসবাস করে যারা রাষ্ট্রের দ্বারা পরিচালিত এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের অধিকার রক্ষা করা। এই অধিকারের অর্থ হল জীবনের প্রতিটি অবস্থায় মানুষের স্বাধীনতা। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহিলা এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ফুমরাইল ফ্লামবো বলেছেন,”আমাদের স্বপ্নের পৃথিবীতে যখন মানুষ ন্যায় প্রাপ্ত হয়,নিরাপদ থাকতে পারে এবং শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে এবং মানবজাতি বিশ্বজনীন সম্মানবোধ ও মর্যাদাপ্রাপ্ত হয় এবং সময় অধিকার অর্জন করে তখন মানবিকতা রক্ষিত হয়।মানবাধিকার সকলের জন্য ও সবসময়ের জন্য। মানবাধিকার দেশ,কাল ও পাত্রের বিভিন্নতায় মানবাধিকারের সংজ্ঞার পরিবর্তন হয় না। একজন মানুষের মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ যখন সে আক্রান্ত বা আক্রমণের লক্ষ্য হয়। প্রাক্তন রাষ্ট্রপুঞ্জের সেক্রেটারি বলেছেন,”উন্নয়ন হলে শান্তি থাকে। না হলে তার অগ্রগতি ব্যাহত হয়। কিন্তু মানুষের জন্মগত অধিকারকে অস্বীকার করে কোনও অগ্রগতিই গ্রহণযোগ্য নয়।” ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় বিশ্বের সমস্ত স্থান থেকে তাদের প্রচলিত আইন,সংস্কৃতি-সহ বিভিন্ন সামাজিক,রাজনৈতিক বিষয়ে প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি মানবাধিকার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সনদ প্রকাশ করে। এই সনদ প্রথম সাধারণের মৌলিক মানবাধিকার হিসাবে স্বীকৃত যা ৫০০টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। আমরা সংক্ষেপে দেখে নেব উপরোক্ত সনদে কীভাবে মানবাধিকার রক্ষার প্রয়াস করা হয়েছে।

(১) প্রতিটি মানুষ জন্মগ্রহণ করে স্বাধীনভাবে এবং মর্যাদা ও সমঅধিকার নিয়ে। প্রতিটি মানুষ অপরের সঙ্গে ভাতৃত্ব বন্ধন গড়ে তুলবে।
(২) জাতি,রং,লিঙ্গ ভাষা,রাজনৈতিকভাবে অন্য মতালম্বী সকলেরই সমান অধিকার। ভিন্ন দেশ,অঞ্চল,এবং রাজনৈতিক পার্থক্য থাকলেও অধিকার সকলের সমান থাকবে।
(৩) জীবনের অধিকার অর্থাৎ প্রত্যেকের স্বাধীন ও নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার।
(৪) কোনও মানুষ অপর মানুষকে ক্রীতদাস করতে পারবে না।
(৫) কোনও মানুষ কাউকে আঘাত অথবা অত্যাচার করতে পারবে না।
(৬) প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে তার ইচ্ছামত গন্তব্য স্থানে যাওয়ার।
(৭) আইন সুখের জন্য সমান এবং সেই আইন যথোচিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
(৮) মানবাধিকার আইনের দ্বারা রক্ষা করতে হবে।
(৯) যথাযথ কারণ ছাড়া কোনও মানুষকে কারাগারে বন্দি করা যাবে না।
(১০) বিচার জনসমক্ষে করতে হবে।
(১১) বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত সকলেই নির্দোষ।
(১২) যথাযথ কারণ ছাড়া কোনও মানুষের অপর কারও বাড়িতে প্রবেশাধিকার থাকবে না।চিঠিপত্র খুলতে পারবে না এবং পরিবারের কারও সঙ্গে অন্যায় ব্যবহার করতে পারবে না। নিজের দেশে সর্বত্র যাওয়ার অধিকার সকল নাগরিকের থাকবে।
(১৩) নিজের দেশে সর্বত্র যাওয়ার অধিকার সকল নাগরিকের থাকবে।
(১৪) সকলের নিরাপদ জায়গায় থাকার অধিকার থাকবে।
(১৫) একটি দেশে বসবাসকারী হিসাবে নাগরিক অধিকার থাকবে।
(১৬) পুরুষ এবং মহিলার বিবাহ করার ও বিচ্ছিন্ন হওয়ার সমান অধিকার থাকবে। (১৭) প্রত্যেক মানুষের নিজের জিনিসের উপর অধিকার থাকবে। যথাযথ কারণ ছাড়া কেউই নিতে পারবে না।
(১৮) প্রত্যেক মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা থাকবে। ধর্মগ্রহণ বা ত্যাগ করা ব্যক্তির স্বাধীনতা।
(১৯) প্রত্যেক মানুষের অভিব্যক্তির স্বাধীনতা থাকবে যা সে মনে করলে অন্যের সঙ্গে মত বিনিময় করতে পারবে।
(২০) প্রত্যেক মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার অধিকার থাকবে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে সেই সমাবেশে যোগদান করতে পারবে না।
(২১) প্রত্যেক সাবালক মানুষকে তার দেশের সরকার গড়ার অধিকার দিতে হবে সে তার নিজের নেতা নির্বাচন করতে পারবে।
(২২) প্রত্যেক মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা থাকবে। গৃহ,ওষুধ ,শিক্ষা,শিশুদের সুরক্ষা এবং বাঁচার মত অর্থ থাকবে।
(২৩) প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কদের কাজের অধিকার (কর্মসংস্থান) থাকবে,যথাযথ পারিশ্রমিক দিতে হবে এবং তারা ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবে।
(২৪) প্রত্যেক মানুষের কাজের মধ্যে বিশ্রাম নেওয়ার অধিকার থাকবে।
(২৫) প্রত্যেক মানুষের খাদ্য,নিরাপত্তা ও বাসস্থান থাকবে। মা,শিশু,বৃদ্ধ-বৃদ্ধা,বেকার ও অক্ষম মানুষদের দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে।
(২৬) শিক্ষা মানুষের অধিকার। শিশুশিক্ষা অবৈতনিক করতে হবে। সন্তানের শিক্ষা,পিতামাতার ইচ্ছানির্ভর হবে।
(২৭) কপিরাইট একটি বিশেষ আইন যা মানুষের সৃষ্টিকে নিরাপত্তা দেবে। কোনও মানুষের নকল করার অধিকার নেই। শিল্প,কলা,বিজ্ঞানের সৃষ্টি কে উপভোগ করার অধিকার থাকবে।
(২৮) একটি দেশের সকল মানুষ যাতে সবকিছু উপভোগ করতে পারবে তার স্বাধীনতা ও অধিকার থাকবে ।
(২৯) প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব অপরের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করা ।
(৩০) কোনও মানুষেরই অপর মানুষের মানবাধিকার হরণ করার অধিকার নেই ।

ভারতবর্ষের সংবিধানে মানবিক অধিকার মৌলিক অধিকারে স্বীকৃত। মৌলিক অধিকারে ৩৫টি ধারায় উপরোক্ত মানবাধিকার স্বীকৃত হয়েছে । কিন্তু মানুষই মানুষের সেই অধিকার খর্ব করছে। দেশের সংবিধানকে ভিত্তি করে যে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে তা কিছু মানুষ সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে প্রতিনিয়ত ভঙ্গ করছে।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মৌলিক মানবাধিকারকে সফলভাবে প্রয়োগ করে চলেছেন সংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে। রাজ্যে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত। পঞ্চায়েত,পুরসভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন।বিধানসভা ও লোকসভার নির্বাচন হয়েছে এবং জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। রাজ্যের নাগরিকরা সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও মানবিক অধিকার নিয়ে করছেন। রাজ্যে শুধু শিশুরাই অবৈতনিক শিক্ষা পাচ্ছে তাই নয়,মেয়েরা শিক্ষার জন্য অর্থ ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পে পাচ্ছেন। বিবাহযোগ্য মেয়েরাও রূপশ্রী প্রকল্পে অর্থ সাহায্য পাচ্ছেন এবং প্রত্যেক শিশু জন্মানোর সময় একটি গাছ পাচ্ছে যা ১৮ বছরে বিক্রি করেও বিবাহ অথবা অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে। রাজ্যে শিশুরা জুতো,বই পাচ্ছে সরকারের থেকে। পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে বাড়ি দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু,ওবিসি-সহ সর্বস্তরের মানুষকে জীবনের মূল স্রোতে নিয়ে আসার জন্য,শিক্ষার জন্য,কর্মসংস্থানের জন্য,সরকার আর্থিক সাহায্য করছে। চাষ,পশু পালন, মৎস উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতা করছে। অতিক্ষুদ্র,ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সহযোগিতা করছে সরকার। খরা অথবা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা কৃষিবীমার সাহায্য পাচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা ও কম দামে জেনেরিক ওষুধের ব্যবস্থা। মানবিক অধিকারের সনদে যা যা বলা হয়েছে সম্ভবত তার সব কিছুই বাস্তবায়িত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। মহিলাদের স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন করে তোলার জন্য স্বনির্ভর গোষ্ঠীদের তৈরি করা সামগ্রী বাজারিকরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মানবিক অধিকারের সনদে খেলাধুলা ও আনন্দ করার কথা বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের ক্লাবগুলিকে অর্থ সাহায্য করে ক্লাব ও সংগঠনগুলির প্রভূত উন্নয়ন করেছেন। রাজুকে বেকারদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের মানুষদের জন্য কর্মসংস্থান,শিক্ষা,স্বাস্থ্য ও খাদ্যের অধিকার বিশেষভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।রাজ্যের ৮ কোটির বেশি মানুষকে ‘খাদ্যসাথী’ অর্থাৎ নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। সর্বোপরি এই রাজ্যে মানুষ নির্ভয়ে ধর্মাচরণ করতে পারে এবং মত প্রকাশ করতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘ধর্ম যার যার -উৎসব সবার। ‘

সংবিধান মানবাধিকারকে লঙ্ঘন করে দেশের বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে স্বাধীন মনস্ক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গরু খাওয়া বা বিক্রির অপরাধে মানুষের উপর ব্যাপক আঘাত নেমে এসেছে। দেশের উন্নয়নে ব্যর্থ হয়ে সরকারই যদি ধর্মকে ঢাল করে বৈতরণী পার করার চেষ্টা করে তাহলে সরকারই সংবিধানও মানবিক অধিকার লঙ্ঘন করার দায়ে অভিযুক্ত হয়।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers