কেন্দ্রের কোষাগারে ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’র সংকট মেটাতেই কি দক্ষ ভারত পেট্রোলিয়ামের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নীকরণ

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

ডঃ দেবনারায়ণ সরকার

কথাসাহিত্যিক তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘রাধা’ উপন্যাসে লিখেছেন, “কৌশলে স্বার্থসিদ্ধি হয়, কার্যোদ্ধার হয়, কিন্তু সত্যের প্রতিষ্ঠা হয় না।” রাজকোষে “ভাঁড়ে মা ভবানী” মোদি সরকারের গত সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনকালে এত মাত্রায় কোষাগারের বিবর্ণ অবস্থা আগে ঘটেনি। একদিকে প্রত্যক্ষ করে প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা কর্পোরেট কর ছাড় দেওয়ায় প্রত্যেক কর থেকে রাজস্ব দেড় লক্ষ কোটি টাকা কম আসবে। অন্যদিকে জিএসটি আদায় গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা। জিএসটি থেকে আদায় ক্রমশ কমছে। গত তিন মাসে জিএসটি থেকে আদায় গড়ে ৯৫ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা প্রতি মাসে ১.১৪ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের শেষে ২ লক্ষ কোটি টাকা জিএসটি আদায় কমবে বলে আশা। এমনকী, জিএসটি থেকে এ বছর রাজ্যগুলির বকেয়া প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের প্রায় সমস্ত রাজ্যগুলিতে রাজস্ব আদায়ে টান পড়েছে জিএসটি আদায় কমার জন্য। তাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর মিলিয়ে এবারে কেন্দ্রের রাজস্ব আদায় অন্তত প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লক্ষ কোটি টাকা কম হওয়ার সম্ভাবনা। অন্যদিকে সংকট মেটাতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সুদ থেকে বাড়তি অর্থেও কেন্দ্রের ব্যয় সংকুলান অসম্ভব। এদিকে, রাজাকোষ ঘাটতির হিসাবের খাতায় যে অসত্য তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে সরব হয়েছেন রঘুরাম রাজন থেকে শুরু করে দেশের বেশ কিছু অর্থনীতিবিদ। মোদ্দা কথা, মোদির রাজকোষ এখন ‘ভাঁড়ে মা ভবানী” গত পাঁচ বছরে ঘটেনি। এমতাবস্থায় ভারত পেট্রোলিয়ামের মতো দক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাও সম্পূর্ণ বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্ত নিল মোদি সরকার। একদিকে সংসার চালাতে দক্ষ ও লাভজনক সংস্থা বেচে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিক সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে বেচে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ কার্যত, কৌশলে স্বার্থসিদ্ধি ও কার্যোদ্ধার হচ্ছে, কিন্তু সত্যকে স্বীকারও করা হচ্ছে না।

গত ২০ নভেম্বর রাতে মোদি সরকার ভারত পেট্রোলিয়াম-সহ পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এক ধাক্কায় বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্ত নিল। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন জানান, “ভারত পেট্রোলিয়াম (বিপিসিএল) ও শিপিং কর্পোরেশনের (এসসিআই) যত শেয়ার সরকারের হাতে রয়েছে, তার সবটাই বেসরকারি সংস্থাকে বেচে দেওয়া হবে।” তবে শুধুমাত্র ভারত পেট্রোলিয়ামের হাতে থাকা অসমের নুমালিগড় রিফাইনারির বেসরকারীকরণ হবে না। সেটি সরকার বা অন্য কোনও তেল সংস্থা কিনে নেবে।

অন্যদিকে কুন্টেনার কর্পোরেশনের (কনকর) সমস্ত সরকারি শেয়ার বেসরকারি হাতে দেওয়া না হলেও সংস্থার নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে থাকবে না। কনকরে সরকারের শেয়ার বর্তমানে ৫৪.৮%। এর মধ্যে ৩০.৮% শেয়ার বেচে দেওয়া হবে। অর্থাৎ কনকরে যেখানে সরকারি নিয়ন্ত্রন ছিল ৫০ শতাংশের বেশি সেখানে সরকারি শেয়ার নেমে আসবে মাত্র ২৪%। নিপকো ও তেহরির রাষ্ট্রীয়ত্ত সংস্থা দুটির শেয়ার অবশ্য বেসরকারি হাতে দেওয়া হবে না। তবে সংস্থা দুটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হবে এনটিপিসির হাতে।

প্রশ্ন হল, যখন সরকারের রাজকোষের অবস্থা চরম বেহাল, তখন কেন এক ধাক্কায় ৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্ত নিল সরকার? সরকারের পক্ষে যুক্তি হল, ব্যবসা করা সরকারের কাজ নয়। যুক্তিযুক্ত নয় রাষ্ট্রয়ত্ত সংস্থার অদক্ষ ব্যবহারও। তাছাড়াও বর্তমান অর্থবর্ষে বিলগ্নীকরণ থেকে ১.০৫ লক্ষ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষমাত্রা রাখা হলেও গত সাত মাসে এই লক্ষ্যমাত্রার বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্ত নিতে হল সরকারকে। তাছাড়াও সরকার মনে করছে, ৬০ হাজার কোটি টাকা ঘরে আসতে পারে। এমনকী, ৫টি সংস্থার বিলগ্লীকরণ হলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি অর্থ আদায় সম্ভব এ বছরেই।

কিন্তু, বিলগ্নীকরণের বিরুদ্ধে প্রধান তিনটি যুক্তি হল: দক্ষ ও লাভবান রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির বিক্রির অর্থ হল জনগণের দক্ষ সম্পদগুলি বিক্রি করা বা অধিকতর লাভের উৎস বিক্রি করা কখনওই কাম্য নয়। দ্বিতীয়ত, এই বিক্রির ফলে একদিকে দেশীয় বেসরকারি কোম্পানির আধিপত্য কার্যত ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের নামান্তর। তাছাড়া বিদেশি কোম্পানির কাছে বিক্রয় করা দেশের স্বর্থের ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রতিকূল। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় যারা কাজ করে তাদের কাছের নিশ্চয়তা অবশ্যই এক্ষেত্রে লংঘিত হতে বাধ্য।

তাছাড়াও অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন হল, ঘাটতি মেটাতে আজ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেচে কোষাগারে টাকা আসতে পারে। আগামী দিন কী হবে বিশেষত, ভারত পেট্রোলিয়ামের মতো লাভজনক সংস্থা বেচে দেওয়ার অর্থ বলছে, গত অর্থবছরই ভারত পেট্রোলিয়াম প্রায় ৭৮০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। আরও প্রশ্ন হল, বিবর্ণ ও শ্লথ অর্থনীতির জেরে যখন বেসরকারি সংস্থাগুলি নতুন লগ্নী থেকে কার্যত হাত গুটিয়ে রেখেছে তখন সরকারি সম্পত্তি বিক্রির জন্য বাজারে আনলে কি ভাল মেলার নিশ্চয়তা থাকে? নাকি সেগুলো দ্রুত বেচে রাজকোষ ভরার ব্যবস্থা করাই সরকারের মুখ্য লক্ষ্য? এই মুহূর্তে যাতে সরকার যে রাজকোষ ঘাটতির বেহাল সংকটে পড়েছে যে করেই হোক তা থেকে বেরিয়ে আসা যায়, ঘাটতি মাত্রাছাড়া না হয়। কিন্তু দেশের দক্ষ সম্পদ আজ বিক্রি করলে কাল কী হবে? তাছাড়াও বিলগ্নীকরণের বিরূপ প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানের উপর– এমনিতেই ৪৫ বছরের সর্বোচ্চ বেকারত্বে ভুগছে দেশ। আরও রয়েছে, যাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে, বলে জানা যাচ্ছে তারাই তো বর্তমান সরকারের থেকে ক্রমশ সুবিধা পেয়ে চলেছে। অর্থনীতির চক্র সঠিকভাবে চলছে কি? কাদের সুবিধার্থে দেশ ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট না আমজনতা? উত্তরটা চাই।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial