কান্ডারির কলম: সৌজন্য – মমতা বন্দোপাধ্যায়

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

পুজো এসে গেল। সুনীল আকাশ। মাঠে কাশ ফুল। বাতাসে শিউলির গন্ধ। জাগো মা। তুমি জাগো। প্রতি বছর আমাদের দলের মুখপত্র ‘জাগো বাংলা’র উৎসব সংখ্যার জন্য একটা ছোট্ট লেখা লিখতে হয়। ‘জাগো বাংলার’র এডিটর হিসাবে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। সুতরাং আমাদের এই পত্রিকার প্রতি একটা আবেগ সবসময় কাজ করে। আমি ‘জাগো বাংলা’র নিয়মিত পাঠক। আজকে যখন দেখি ‘ফেকনিউজ’ এর সমাহার, তখন আমি গর্ব করে বলতে পারি, আমাদের পত্রিকা নির্ভিক। কুৎসা, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার। উন্নয়নের কথা, সমাজের কথা, মানুষের কথা ‘জাগো বাংলা’র থিম। বিভেদনয়, আমরা বলি ঐক্যবদ্ধ ভারত। সর্ব ধর্ম সমন্বয়। সবাইকে শারদ শুভেচ্ছা জানিয়ে মা-মাটি-মানুষের করকমলে নিবেদন করলাম আমার এই ছোট রচনা। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া কিছু স্মৃতি, কিছু না-বলা কথা।

যত দিন যাচ্ছে ততই অনুভব হচ্ছে যা সৌজন্য যেন অস্বাভাবিকভাবে কেমন হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা ছোটবেলায় পিতামাতার কাছ থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছি যে বড়দের সবসময় সম্মান জানাতে হয় আর ছোটদের ভালবাসতে হয়। কোনও ভেদাভেদ করতে নেই। কাউকে ঘৃণা করতে নেই। অসহায় মানুষের পাশে সবসময় থাকতে হয়। কেউ গরিব অসম্মান করার অধিকার কারও নেই একই ভাবে মনে রাখা উচিত, রাজনৈতিক আদর্শে মতভেদ থাকলেও ব্যাক্তি কুৎসা অথবা ব্যক্তি আক্রমণ করতে। রাজনৈতিক ময়দানের বিরোধিতা রাজনীতির সীমার মধ্যেই থাকা উচিত। এর নাম সৌজন্য। ভদ্রতা। পরিচয়।

অথচ লক্ষ করেছি, আজ সব কিছু থেকে সৌজন্য কেমন হারিয়ে যাচ্ছে। কথায় বলে ‘Old is Gold’। আমরাও পিছনের দিকে ফিরে তাকালেই এই কথাটা বারবার মনে পড়ে, অবশ্যই বারবার ভাবতে শেখায় যে, Old is now also Gold. আমাদের অভিভাবক ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা সবসময় কিছু আদর্শ ও কিছু মূল্যবোধের কথা শেখান যা আমাদের সারা জীবনের সম্পদ। আর সেটাকে পাথেয় করেই আমরা গড়ি জীবন।

অটলজির মৃত্যুর পরদিন প্লেনে ফিরতে ফিরতেই এই সব কথাগুলো ভীষণ মনে হচ্ছে। আজ তিনি বেঁচে নেই। কিন্তু মানুষটার অকপট হাসি হাসি মুখটা কখনও ভুলতে পারি না। তিনি যখন প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন তখন তাঁর সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য আমাদের তৃণমূল কংগ্রেসের একটা ভূমিকা ছিল।

১৯৯৮ সালে পয়লা জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচন প্রতীক পায়। তার ঠিক এক মাস বাইশ দিনের মাথায় লোকসভা নির্বাচন। মনে আছে ভোট হয়েছিল ২২ ফেব্রুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি। নতুন দল। বিপক্ষে কত বড় বড় পার্টি। ফলে আমাদের দলের পক্ষ থেকে কেউ যে তখন লোকসভা আসনে নির্বাচিত হবেন, তা অনেকে ভাবতেই পারেননি। এত কম সময়ের মধ্যেও আমরা কিন্তু সাতটা আসনে জয়লাভ করে অটলজির সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছিলাম। শুধুমাত্র ওই মানুষটির দৃপ্ত রাজনৈতিক চেহারা দেখে এই সমর্থন আমরা দিই। আমাদের এমপিদের নিয়ে দিল্লি গেলাম। মনে আছে সে-দিন ধান-দূর্বা ও প্রদীপ জ্বালিয়ে আদবানিজির স্ত্রী আমাদের এমপিদের বরণ করে নিয়েছিলেন। ১৩ মাস সে সরকার ছিল। মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে তাঁর সরকার হেরে যায়। আমরা কিন্তু ওঁর পাশ থকে সরে আসিনি। সঙ্গেই ছিলাম।

১৯৯৯-তে এক বছরের মধ্যে আবার নির্বাচন হল, আমরা আটটা আসনে জিতে গেলাম। পরে অবশ্য আর একটা আসনে জিতেছিলাম। অটলজি বললেন, এবার তোমাদের মন্ত্রিত্ব নিতেই হবে। আমি রেলমন্ত্রী হলাম আর অজিতদা হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। খুব সম্মানের সঙ্গে আমরা কাজ করতাম। কিন্তু বছর দু’ –এক কাজ করার পর বুঝতে পারলাম কিছু কিছু ক্ষেত্রে অটলজিকে কিছু সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ১৯৯৯ –এর সরকারের মধ্যে পার্থক্যে ছিল। ১৯৯৮ –এর সরকার মধ্যে এনডিএ সরকার আর ১৯৯৯ –এর সরকারের মধ্যে পার্থক্য ছিল। ১৯৯৮ –এর সরকার অত্যন্ত ভালভাবে কাজ করছিল। ১৯৯৯-২০০০-২০০১ –এর প্রথম পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু তখন কখনও কখনও মনে হচ্ছিল যে অটলজির হাতে সবটা হয়তো নেই। কোথাও কোথাও দলের কারও কারও বেশি সক্রিয় ভূমিকা এনডিএ সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়িয়েছিল। অটলজির মতো মানুষের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়িয়েছিল। অটলজির মতো মানুষের সঙ্গে আমরা ঝগড়া চাইনি। তাই ছেড়ে চলে এসেছিলাম। আমি আর জর্জ ফার্নান্ডেজ তখন খুব Close। জর্জকেও অটলজি খুব ভালবাসতেন। জর্জ ও আমার সঙ্গে উনি সবসময় আলোচনা করতেন। আমি যখন ছেড়ে চলে আসি, তখন জর্জকেও বলেছিলাম ছেড়ে আসতে। জর্জ আজ জীবিত থেকেও দীর্ঘদিন বিছানায়, প্রায় কোমায়। মাথার একটা ছোট্ট অপারেশনের পর থেকে প্রায় শয্যা নিলেন। তাঁর মতো একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদও রাজনীতির থেকে অনেক দূরে সরে গেলেন। তাই তিনিও ২০০৬ থকে ২০১৮ সাল –মৃত্যু অবধি প্রায় শয্যাগত অবস্থায় কাটিয়ে গেলেন।

অনেক আছে না-বলার কথা। আজ এই পরিসরে সব কিছু আলোচনার জায়গা কম। অনেক কথা স্মৃতির সরণিতে থাকলেও সে কথা বিকশিত হতে পারে না নানা কারণে। কথা কখনও ব্যথা হয়ে মনের রুদ্ধদুয়ারে ঘোরাফেরা করে। যা হয়তো বলতে চাইলেও বলা যাই না। কখনও হয়তো কেউ কোনও গবেষণায় এই না-বলা না-জানা কথাগুলো খুঁজে বের করে কাজে লাগাতে পারে।

যদিও আজকে আমার আলোচ্য বিষয় এটা নয়। আলোচ্য বিষয় ‘রাজনৈতিক সৌজন্য’। অটলজি কোনওদিন কোনও অসম্মানজনক কথা আমাদের বলেননি। অনেক ব্যাপারে তিনি তাঁর মনের কথা আমাকে share করতেন। যা আমি publicly বলব না, কারণ এটা বিশ্বাসের ধর্ম। আমি মনে করি, বিশ্বাস করে কেউ কোনও কথা বললে তা নিজের মধ্যেই রাখা উচিত।

অটলজির মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন এমন একজন বিশ্বস্ত অফিসারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, জানো তো তোমার সম্বন্ধে অটলজি আমাদের একদিন বলেছিলেন যে, “মমতাকে তোমরা জোর করে কিছু করাতে পারবে না। ও নিজে থেকে বোঝে কাজটা করার দরকার, তবেই ও করবে। ওকে জোর কোরো না”।

আমি বললাম, উনি আমাকে বুঝতে পারতেন, এটাই তো বড় কথা। সেই সময় অনেকে চাইত বেশ কিছু Public Sector বন্ধ করে দিতে। Rail Privatise করে দিতে। আমি এর তীব্র বিরোধিতা করতাম। বাধা দিতাম। ফলে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু লোক তো ছিলই।

অটলজি মালপোয়া খেতে খুব ভালবাসতেন, আকবর তখন এমপি। শ্রীরামপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতেছিল। আকবরকে দিয়ে হুগলির সূর্য মোদকের দোকান থেকে আমরা মালপোয়া বানিয়ে নিয়ে যেতাম অটলজির জন্য।

পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর পর পরিবর্তন হওয়ার পরও আমি অটলজির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তখন উনি একেবারে শয্যাগত। আমাকে দেখে চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছিল। তিনি কথা বলতে চেষ্টা করছিলেন কিন্তু প্যারালিসিস থাকার ফলে পারছিলেন না। বুঝতে পারছিলাম কষ্ট হচ্ছে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। তারপরও অনেকবার দেখতে গিয়েছি। উনি আজ নেই, কিন্তু ওঁর সৌজন্যবোধ আজও আমাকে বারবার Old is Gold–এই কথাটা মনে করিয়ে দেয়।

সাহিত্যিক ও বাংলার খুব আপনজন মহাশ্বেতাদিকেও হারিয়ে খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে খুব ভালবাসতেন ও স্নেহ করতেন। জন্মদিন এলেই মহদির বাড়িতে যাওয়া, কেক কাটা, গান গাওয়ার অনেক স্মৃতিই আজ আমার স্মৃতিভূমিতে বিচরিত। হারিয়েছি অনেককে। কেউ কেউ হারিয়ে গেলেও স্মৃতির সরণিতে থেকে যান, আর মাঝে মাঝেই ভগবান।

ইন্দিরা গান্ধীকে দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু তার পরের সব রাজনৈতিক নেতাদের আজ ভারতবর্ষ জুড়ে চিনি। রাজনীতি যাই হোক, সৌজন্য সবার জন্য আমার রয়েছে। সংসদের Central Hall –এ গেলে সবার সঙ্গে দেখা হয়। সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই আমরা কথা বলি। দেখা হলেই হেসে কথা বলাটা আমাদের রাজনৈতিক সৌজন্য। এমনকী, যাঁরা আমাকে পছন্দও করেন না তাঁদেরও সম্মান করি। কারণ এটাই আমরা শিখেছি।

কিন্তু খুব খারাপ লাগে যখন দেখি ইদানীং কিছু ভুঁইফোঁড় নেতা, যাদের জীবনে না আছে কোনও সংগ্রাম, না আছে কোনও আদর্শ বা Sacrifice, তারা যখন ইনিয়ে কিনিয়ে কুৎসা করে, চোখ রাঙায় আর গুন্ডা সর্দারদের মতো কথা বলে, তখন মনে হয় রাজনৈতিক সৌজন্যের হাতেখড়ি পাঠ এদের হয়নি। এদের Brainটাতে শুধু নেতিবাচক, কুৎসার গাছ জন্ম নিয়ে চিন্তাভাবনার স্তরকে একেবারে অনুর্বর করে দিয়েছে। এরা চালাবে দেশ? ভাবতে অবাক লাগে।

সৌজন্য শেখার পাঠ এদের অটলজির কাছে নেওয়া দরকার। শারদীয়ার সর্বোচ্চ অভিনন্দন মা-মাটি-মানুষকে জানিয়ে আবার বলি আমার প্রাণের ভাষায়–

“জাগো বাংলা
জাগো মা
জাগো মা-মাটি-মানুষ
জাগো-জাগো-জাগো।”

সবাই ভাল ও সুস্থ থাকুন। মা আপনাদের সবাইকে খুব ভাল রাখুন।

জয় হিন্দ
জাগো বাংলা
মমতা

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial