কম্পিউটার ব্যবস্থার উপর নজরদারি সাধারণ জরুরি অবস্থা চাইছে কেন্দ্র

তীর্থ রায়

দেশে কার্যত জরুরি অবস্থা অনেক দিন আগেই লাগু করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নোটবন্দির মধ্য দিয়ে তিনি আর্থিক জরুরি অবস্থা লাগু করেছিলেন। নোটবন্দির মধ্য দিয়ে তিনি আর্থিক জরুরি অবস্থা লাগু করেছিলেন। এবার দেশের সমস্ত কম্পিউটার ব্যবস্থার উপর নজরদারি চালু করে তিনি সাধারণ জরুরি অবস্থা চাইলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক কয়েকদিন আগে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দশটি কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে অনুমতি দিয়েছে দেশের যে কোনও কম্পিউটার ব্যবস্থার তথ্য প্রয়োজনমতো নজরদারি করার। এর অর্থ আমার-আপনার ব্যক্তিগত কম্পিউটারে ঢুকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি সমস্ত তথ্য হাতাতে পারবে। ব্যক্তিগত ই-মেল দেখতে পারবে। দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত পরিসরে অনুপ্রবেশের এইরকম দৃষ্টান্ত অতীতে কখনও দেখা যায়নি। দেশের সরকার যখন নাগরিকদের ব্যক্তিগত পরিসরে এইভাবে অনুপ্রবেশ করে, তখন সেটা জরুরি অবস্থা ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। কেন্দ্রীয় সরকার এই ফতোয়া জারি করার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিনি নির্দেশিকা জারির কথা জানার সঙ্গে সঙ্গে টুইট করে বলেন, এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক ঘটনা।

মোদি সরকার চাইছে দেশের সমস্ত মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে। জননেত্রী বলেন, “ওরা যদি আড়ি পেতে নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে সব তথ্য হাতিয়ে নেয়, তাহলে সেটা পরাধীনতা ছাড়া কি?” এখন লোকে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন। এই স্মার্টফোনগুলি চলে কম্পিউটার নজরদারির নামে কেন্দ্রীয় সরকার বস্তুত ফোনের উপর নজরদারি চালাতে পারবে। মুখ্যমন্ত্রী অবিলম্বে এই নির্দেশিকা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকার যে নির্দেশিকা দিয়েছে, তাতে দশটি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নাম করে বলা হয়েছে, এরা যে কোনও কম্পিউটারে আড়িপাততে ও নজরদারি করতে পারবে। কম্পিউটারে যে কোনও তথ্য পাঠোদ্ধার করতে পারবে। ইন্টারনেট পরিষেবা সংস্থা বা কম্পিউটারের মালিক তদন্তে সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে। যদি কেউ তদন্তে সাহায্য না করতে চায়, তাহলে তার সাত বছরের কারাদন্ড হবে। যে তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে আইবি, ইডি, সিবিআই, এনআইএ, দিল্লি পুলিশ ইত্যাদি।

এই নির্দেশিকাকে কালো নির্দেশিকা বললেও কম বলা হয়। স্বাধীন ভারতবর্ষে এই ধরনের ভয়ংকর নির্দেশিকা আর একটিও বেরয়নি। এই নির্দেশিকার মধ্য দিয়ে দেশকে শুধু পুলিশ রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টাই হয়নি, নাগরিকদের সমস্ত মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এই নির্দেশিকা জারি করার পর বিরোধীদের প্রতিবাদের মুখে সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বলা হয়েছে, এটি নাকি একটি পুরনো নির্দেশিকা। ২০০৯ সালেই নাকি এই নির্দেশিকা জারি হয়। কেন্দ্রীয় সরকার যা বলছে, সেটি সবৈব মিথ্যা। ১৮৮৫ সালে টেলিগ্রাফ আইন এবং ১৯৫১ সালে টেলিগ্রাফ বিধি অনুযায়ী কেন্দ্র ও রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিবের অনুমতি সাপেক্ষে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে টেলিফোনে আড়ি পাততে পারে। ২০০৯ সালে যে নির্দেশিকা জারি হয়, তাতে তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও তথ্যপ্রযুক্তি বিধির মাধ্যমে আড়ি পাতা যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বা স্বরাষ্ট্র দফতরের অনুমতি সাপেক্ষে। এই আইনের ফলে ডিজি বা তার ঊর্ধ্বতন কোনও সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান নির্দেশিকার কোনও তুলনাই হয়না। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় দশটি গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্ল্যাঙ্ককেট আড়িপাতার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যা এককথায় সম্পূর্ণ এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। আগে সব নির্দেশিকায় বলা ছিল, স্বরাষ্ট্রসচিব অনুমতি দিলে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আড়ি পাতা যেতে পারে। এক্ষত্রে স্বরাষ্ট্রসচিবের অনুমোদনের কোনও বিষয় নেই। জাতীয় নিরাপত্তার কোনও প্রশ্নও নেই।

 

রাজনোইতিক উদ্দেশ্যে বা অন্য যেকোনও তুচ্ছ কারণে কোনও ব্যক্তির উপর এখন কেন্দ্র ইচ্ছা করলেই তার এই দশটি এজেন্সির মাধ্যমে ই-মেলে বা ফোনে আড়ি পাততে পারবে। কোনও স্বাধীন দেশে এই জিনিস কল্পনাও করা যায় না। স্বাধীনতা মানে দেশের প্রতিটি মানুষের কতগুলি মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখা। যার মধ্যে অবশ্যই অন্যতম বাক-স্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করা। আর একটু সোজা করে বললে বলা যেতে পারে যে, কেন্দ্রীয় সরকার দেশের নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণ করতে চাইছে। যা সম্পূর্ণ সংবিধান বিরোধী। দেশের সংবিধানকে তোয়াক্কা করেনা মোদি সরকার। তাদের কাছে নাগরিকদের স্বাধীনতা, অধিকারের কোনও অর্থ নেই। কিন্তু এইভাবে সংবিধানকে যদি কোনও সরকার অগ্রাহ্য ও অস্বীকার করার চেষ্টা লাগাতারভাবে করে যেতে পারে, তাহলে দেশের ঐক্য ও সংহতি সম্পূর্ণ বিপন্ন হয়ে যাবে। এটা মনে রাখতে হবে যে, আমাদের দেশে ঐক্য ও সংহতিকে ধরে রেখেছে আমাদের সংবিধান। ফলে সেই সংবিধানকে যদি প্রতি মুহুর্তে আমরা পদদলিত করার চেষ্টা করি, সংবিধান দেশের নাগরিকদের যে অধিকার ও সুযোগ দিয়েছে, সেগুলি যদি আমরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে সবার আগে আমরা কিন্তু বিপন্ন করছি আমাদের দেশের অখন্ডতা ও ঐক্যকে। মোদি সরকার চাইছে, জোর করে দেশের মানুষের উপর একটা একদেশদর্শী ভাবনা চাপিয়ে দিতে।

তার জন্য তারা নাগরিকের  ব্যক্তি পরিসরে সব সময় ঢুকতে চায়। তারা মানুষকে ভয় দেখিছে চুপ করিয়ে রাখতে চান। মোদি সরকারের মন্ত্রীরা যে সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করুন না কেন, মোবাইল ও কম্পিউটারে আড়ি পাতা এবং নজরদারির একমাত্র কারন হল মানুষকে ভয় দেখানো। মানুষকে ভয় দেখিয়ে তারা সবাইকে একটি একদেশদর্শী ধারনার দ্বারা চালিত করতে চায়। জাতীয় নিরাপত্তা বা জাতীয় স্বার্থ এই সরকারের কাছে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়। মোদি সরকার তার দলের ভোটব্যাঙ্ক তৈরির স্বার্থে পরিচালিত হয়। এই ভোটব্যাঙ্ক তৈরির জন্য সরকারি প্রশাসনকে ব্যবহার করে তারা যা খুশি তাই করার একটা প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আড়িপাতার নির্দেশিকা তাদের এই চক্রান্তেরই ফসল। বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঠিকভাবেই বলেছেন ইডি, সিবিআই ইত্যাদি কেন্দ্রের তাঁবেদার সংস্থাগুলি কোনও কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের উপর আড়িপাততে পাততে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিবের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছে করলে রাজ্যের যেকোন তথ্যের উপর আড়িপাততে পারবে। রাজ্য সরকারের সব গোপন তথ্য তাদের হাতে চলে যাবে। রাজ্যের মন্ত্রীরা যখন শপথ নেন, তখন তাঁরা মন্ত্রগুপ্তির শপথও পাঠ করেন। অর্থাৎ তাদের এই শপথ নিতে হয় যে, সরকারি কাজ করতে গিয়ে তাঁরা যে সমস্ত তথ্য জানতে পারছেন, সেগুলি গোপন রাখবেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার যদি আড়ি পেতে রাজ্য সরকারের গোপন তথ্য সংগ্রহ করে নেয়, তাহলে মন্ত্রীদের আর মন্ত্রগুপ্তির শপথ নেওয়ার মানে কী? বাংলার যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেই প্রশ্নের উওর দেওয়ার ক্ষমতা বিজেপির কোনও মন্ত্রীর নেই। সেই কারণে তাঁরা কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা নিয়ে মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব হাজির করছেন।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers