ইভিএম নয়, ভোট চাই ব্যালটে

মেঘাংশী দাস

শহিদ দিবস ২১ জুলাইকে সামনে রেখে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, ব্যালট ফিরিয়ে দাও’ এবং ‘ ইভিএম চাই না, মেশিন চাই না, ব্যালট চাই’ স্লোগাম সামনে রেখে পথে নামছে তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলার পাশাপাশি দেশজুড়ে এই স্লোগান সামনে রেখে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে ঘোষণা করেছেন জননেত্রী মুখ্যমন্যরী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জননেত্রীর দাবি, “মানুষের সমর্থনে বিজেপির জয় হয়নি। এটা পুরোপুরি কৃত্রিম জয়। আম্রেরিকাতেও ইভিএম বাতিল করা হয়েছে। তাই দেশজুড়ে ইভিএম হঠাও, ব্যালট ফেরাও দাবিতে সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পথে নামা হচ্ছে।” উল্লেখ্য, ভোটে সচিত্র পরিচয়পত্র দাবি করে ‘নো আইডেন্টিটি কার্ড, নো ভোট’ স্লোগান সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আন্দোলন করেছিলেন, তার জেরেই আজ দেশজুড়ে সবার হাতে হাতে ভোটার কার্ড। তাই এবারও নেত্রীর এই ব্যালট ফিরিয়ে আনার আন্দোলন যে গোটা দেশে নতুন দিকনির্দেশ করতে চলেছে, তা স্বীকার করে নিয়েছে রাজনোইতিক মহল।

দলের সমস্ত বিধায়কদের নিয়ে নবান্নের সভাঘরে বৈঠকের পর জননেত্রী ইভিএমে কারচুপি সন্দেহে বলেছেন, “আমি তো সন্দেহ করি। তার কারণ ২ শতাংশ মেশিনে কেবল ভিভিপ্যাটের ভোট গুনতে দেয়। বাকি ৯৮ শতাংশ মেশিনে যে কোনও প্রোগ্রামিং করা নেই, কী করে প্রমাণ করবেন? এটা নির্বাচন কমিশনের দেখা উচিত ছিল, দেখেনি। আমরা সুপ্রিম কোর্টে কেস করেছিলাম খারিজ করে দিয়েছে। ২৩টি বিরোধী দল তো একসঙ্গে বলেছিল, বিচার পাওয়ার জায়গাগুলিতে আমরা বিচার পাইনি। কিন্তু কথাগুলি উঠছে। একটা মেশিনে আমার যদি এক হাজার ভোট থাকে, আপনি কেবল আমাকে শতাংশ গুনতে দেবেন, বাকি ৯৮ শতাংশতে যে জল মেশানো নেই, আমি জানব কী করে? আগে রাজনৈতিক দলের ভোট ১০০ শতাংশ পর্যন্ত গুনতে দেওয়া হত। এই ইলেকশন কমিশন এসে তা বন্ধ করে দিয়েছে।”

এরপরই ইভহিএম মেশীন লোপাট থেকে শুরু করে নতুন প্রোগ্রামিং-সহ নানা অসামঞ্জস্য নির্বাচনী কাজকর্ম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জননেত্রী। বলেছেন, “অনেক মেশীন ভোটের দিন খারাপ হয়ে গিয়েছিল, নতুন মেশিন নিয়ে আসা হয়, সেগুলির কোনও মক পোল হয়নি। বাইরে থেকে এসে সটান বুথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলোতে যে কারও পক্ষে সুবিধা দিতে বিশেষ প্রোগ্রামিং করা ছিল না, তা কীভাবে বুঝব?”

প্রায় কুড়ি লক্ষ ইভিএম লোপাট নিয়েও সরব হয়েছেন জননেত্রী। বলেছেন, “কয়েক্লক্ষ মেশিন খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। সেগুলি কোথায় গেল? কারা নিয়ে তা ভোটের কাজে লাগিয়ে দিল? এগুলি নিয়ে এবার পথে নামা হচ্ছে। মানুষই আমাদের সবচেয়ে বড় আদালত, তাঁদের কাছেই যাবে তৃণমূল।” নেত্রীর এই ঘোষণা যে কতটা বাস্তবোচিত তার প্রমাণ মিলেছে মুম্বই হাই কোর্টে এফিডেভিট করে নির্বাচন কমিশন স্বীকার করে করে নিয়েছে, ১৯ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯৩২টি ইভিএম রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গিয়েছে, কারা কাজে লাগিয়েছে? তার কোনও তথ্য কমিশন মুম্বই হাই কোর্টকে দিতে পারেনি। অভিযোগ, এই ইভিএমগুলি একটি বিশেষ দল লোপাট করে দিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো প্রোগ্রামিং করে দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজে লাগিয়েছে। বিশেষ করে যে সমস্ত বুথে বা কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থী হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা সেখানেই এই ইভিএম পাঠিয়ে ভোটকে প্রভাবিত করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, প্রশ্ন উঠেছে, ইভিএম তোইরী করা দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে সরকারের তরফে পাওনা মেটানো নিয়েও। কমিশন সূত্রে খবর, সরকারের তরফে ১৭০০০ কোটি টাকা মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই দুই সংস্থা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছিল, পাওনা মাত্র ১১০০০ কোটি টাকা। আর রহস্য এখানেই। কেন সরকারের তরফ থেকে ৬০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত দেওয়া হল। রহস্য আরও জটিল মুম্বই হাই কোর্টে নির্বাচন কমিশনের প্রায় কুড়ি লক্ষ ইভিএম লোপাট স্বীকার করে নেওয়ার।

দলীয় বিধায়কদের নিয়ে বৈঠকে দলের আগামী দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে মা-মাটি-মানুষের নেত্রী বলেন, “২১শে জুলাইকে কেন্দ্র করে আমরা সাগর থেকে পাহাড়, কলকাতা থেকে জঙ্গল্মহল সবটা ঘিরে একটা জনসম্পর্ক যাত্রা করব। তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে ছাত্র, যৌবন, জয়হিন্দ বাহিনী থেকে শুরু করে সবাইকে নিয়ে করা হবে। স্থানীয় বিধায়করা যোগ দেবে।” নবান্ন সভাগৃহে তৃণমূল বিধায়কদের নিয়ে দলনেত্রীর বৈঠকে প্রায় সবাই হাজির ছিলেন। অসুস্থতার কারণে মাত্র কয়েকজন আসেননি। যাঁরা আসেননি তাঁরা কেন আসতে পারবেন না, তা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। সভায় দুশোর বেশি বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন.। জননেত্রী বলেন, “বাম ভোট বিজেপিতে শিফট হয়েছে। এটা পঞ্চায়েত ভোট থেকেই হচ্ছে। তাও রাজ্যে বিধানসভায় ১৬৪ আসনে আমাদের লিড আছে। লোকসভার ১৮ আসনে জিতে নাচানাচি করছে। এত করেও আমাদের চার শতাংশ ভোট বেড়েছে।” মমতা বলেন, “১৯৮৪ তে ইন্দিরা গান্ধী মারা গিয়েছিলেন। ১৬টি সিটে কংগ্রেস জিতেছিল। তখন কিন্তু জোর করে পার্টি অফিস দখল করতে হয়নি। অত্যাচার করতে হয়নি। পার্টি অফিস ভাঙতে হয়নি। মানুষের রায় স্বতঃস্ফূর্ত ছিল। মানুষ মেনে নিয়েছিল সেই রায়। ২০০৯ সালে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের জোট হয়েছিল। সেই রায়ও ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু আজকে হঠাৎ ১৮টা পেয়েছে। ২৬টা তো পায়নি। তাও সিপিএমের দয়ায়। টেম্পোরারি। মানি পাওয়ার, মাসল পাওয়ার, কমিউনাল পাওয়ার, মিডিয়া পাওয়ার। মানুষের সাপোর্টে নয়। তাই ভয় পাচ্ছে। কাল যদি এটা না থাকে! তাই বাইক বাহিনী নিয়ে মিছিল করো। পার্টি অফিস দখল করো।” মা-মাটি-মানুষের নেত্রী বলেন, “আমরা বাংলায় বলব। এই সংস্কৃতির প্রচার বাংলায় চলবে না। আমরা পার্টিতে আমাদের মতো চলব। সরকার সরকারের মতো চলবে।” জননেত্রীর কথায়, “বাংলা আমাদের গর্ব। বিজেপি ভুয়া খবর সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারা বলছে বাংলায় শূধু গুন্ডাগিরি হয়। বাংলায় নাকি মা-বোনেরা রাস্তায় বেরোতে পারেনা। বাংলায় নাকি সারাক্ষণ ধরে স্টেনগান হাতে ঘুরে বেড়ায়। বাংলায় শুধু সন্ত্রাস হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়করা ডোর টু ডোর প্রচার করবেন। বাড়ি বাড়ি যাবেন। সরকারের উন্নয়ন্মূলক সামাজিক প্রকল্প থেকে শুরু করে বাস্তব চিত্র তুলে ধরুন। সবাইকে বোঝান, বিজেপি কী হারে মিথ্যা প্রচার করছে, তৃণমূলের নামে কুৎসা করছে।”

তারকেশ্বরে এক সরকারি অফিসে জাতীয় পতাকা খুলে ফেলে দেওয়া ও কাঁকিনাড়ায় একটী মন্দিরের ভিতরে পার্কে সরকারি লোগো বিশ্ববাংলার গ্লোবের গায়ে ‘রাম’ লিখে দেওয়ার খবর এসেছে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। সেগুলি নিয়ে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তা নিয়ে ক্ষুব্ধ মমতা বলেন, “এটা কি কোনও রাজনৈতিক দলের কাজ? কয়েকটা সিন্ডিকেটকে সামনে রেখে একটা বিশেষ রাজনৈতিক দল একটা বিশেষ রাজনৈতিক দল এই কাজগুলো করছে।”

মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, বিদ্যাসাগরের দ্বিশতবর্ষ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজ্যের পক্ষ থেকে বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হবে। বিদ্যাসাগরের ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন হবে। তিনি নিজে ঘাটালে বিদ্যাসাগরের গ্রামে যাবেন। এছাড়াও কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজকেও নতুন করে সাজানো হবে। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ও আশুতোষ মুখোপাধ্যাইয়ের মূর্তিও স্থাপন করবে রাজ্য সরকার।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial