আসলে অর্থনীতি রোগ নির্মাণে ভুল হচ্ছে, তাই প্রেসক্রিপশনও কাজে আসছে না

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

ডঃ দেবনারায়ন সরকার

স্বাধীন ভারতে কোনও নির্দিষ্ট অর্থবর্ষে ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ইতিহাসে সাত মাসের মধ্যে ভারতের আর্থিক সমৃদ্ধির হার চারবার পরিবর্তন করে প্রায় আড়াই শতাংশ কমিয়ে আনার নজির নেই। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক চলতি অর্থবর্ষে ভারতের সমৃদ্ধির হার গত ফেব্রুয়ারিতে ধার্য করেছিল ৭.৪ শতাংশ। এরপর এপ্রিলে কমিয়ে করল ৭.২%। এক মাস আগে আরও কমিয়ে করল ৬.১%। গত ৫ ডিসেম্বর তা আবার কমিয়ে করল ৫%। সমস্যা যে মারাত্মক তা সুস্পষ্ট।

শুধু ভারতের সরকারি ব্যাঙ্কই নয়, বিশ্ব ব্যাঙ্ক আইএমএফ ছাড়াও মুডিজ, ওইপিভি, স্টেট ব্যাঙ্ক, ক্রিসিল, গোল্ডম্যান স্যাক ইত্যাদি সংস্থাও অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস করেছে বর্তমান বছরে ভারতের আর্থিক সমৃদ্ধির হার। শুধু বর্তমান অর্থবছরেই নয়, আগামী বছরেরও আর্থিক সমৃদ্ধির হারের লক্ষ্যমাত্রাও যথেষ্ট কমিয়েছে তারা।

এদিকে, বর্তমান অর্থবছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে দেশের আর্থিক সমৃদ্ধির হার ৬ বছরের তলানিতে নামায় এবং অন্যদিকে দ্বিতীয়ার্ধে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ৫%-এর বেশি মাথা তোলার আশঙ্কা প্রকাশ করায় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বর্তমান মাসে রেপো রেট ও রিজার্ভ রেপো অপরিবর্তিত রাখল। অন্যদিকে সরকারের কোষাগারের অবস্থা যে ক্রমশ আরও বিবর্ণ হচ্ছে তা একদিকে প্রত্যক্ষ কর আদায় এবং অন্যদিকে জিএসটি আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে যথেষ্ট কম হওয়ার চিত্র থেকেই স্পষ্ট। বর্তমান বছরে জিএসটি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা গড়ে প্রতি মাসে ১.১৪ লক্ষ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও বর্তমান অর্থবর্ষের প্রথম ৭ মাসে গড়ে মাসিক আদায় ১ লক্ষ কোটি টাকারও কম। জিএসটি আদায় কম হওয়ায় শুধু কেন্দ্রের রাজস্বে আয় কমেনি, রাজ্যের রাজস্ব আয়ে প্রবল ধাক্কা দিয়েছে। এমনকী, রাজ্যগুলির জিএসটির ক্ষতিপূরণ কবে দেওয়া হবে তারও আশ্বাস দেননি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন।

শুধু বিরোধী রাজ্যগুলিই নয়, গত আগস্ট থেকে জিএসটির ক্ষতিপূরণ মেলেনি বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিরও। জিএসটি চালুর সময় ঠিক হয়, ২০১৫-১৬ সালে রাজ্যগুলির আয়কে ভিত্তি করে প্রতি বছর জিএসটি থেকে ১৪% হারে রাজ্যগুলির আয় বাড়াতে হবে। না হলে ক্ষতিপূরণ দেবে কেন্দ্রে। সেজন্য বিলাসবহুল ও পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিপূরণ পণ্যে জিএসটির উপরে বাড়তি সেস বসিয়ে তহবিল তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। সরকারি তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে আগস্ট পর্যন্ত সেস বাবদ আয় ও ক্ষতিপূরণের মধ্যে ঘাটতি প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। আগস্ট থেকে এই ক্ষতিপূরণের টাকা রাজ্যগুলির না মেলায় রাজ্যগুলির খরচেও টান পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের কাছে জিএসটি বাবদ অর্থ বাকি দু’হাজার কোটি টাকার অনেক বেশি। পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিরোধী রাজ্যগুলি পাঞ্জাব, দিল্লি, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশে জিএসটি বাবদ ক্ষতিপূরণের অর্থ রাজ্যগুলিকে দ্রুত মেটানোর জন্য কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে দাবি করায় অর্থমন্ত্রী কবে টাকা মেটানো হবে সে আশ্বাস রাজ্যগুলিকে দেয়নি। ফলে সমস্যা যে সবদিক থেকে শোচনীয় তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

কেন্দ্রের অবস্থা হল ভাঙব তবে মচকাব না। আসলে বাজারে চাহিদা ঘাটতি, কারখানার উৎপাদনে ঘাটতি। চাকরি ঘাটতি, বিনিয়োগে ঘাটতি ইত্যাদি একটা দুষ্টচক্র অর্থনীতিকে গিলে ফেলেছে। নোটবন্দি, ক্রটিপূর্ণ জিএসটি, কর সন্ত্রাস, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, রুক্ষণশীলতা যে দেশের অর্থনীতিতে একটা খাদের কিনারে দাঁড় করিয়েছে, তা কেন্দ্র সম্মুখে স্বীকার করছে না। এর পরও সরকারি তথ্যকে ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক এনএসএসও রিপোর্ট বলেছে, গ্রামে কেনাকাটা গত ৪০ বছরের মধ্যে বর্তমান সময়ে কমেছে সব থেকে বেশি। এর ফলে বেকারত্বের মাত্রা ২০% থেকে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩০%। অনিশ্চয়তার ভয়ে কেনাকাটার খিদেও কমেছে।

অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ শিল্পপতিদের ক্ষেত্রেও। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সামনে শিল্পমন্ত্রী রাহুল বাজাজ মোদি জমানায় ভয়ের আবহাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, কেন সরকারের বিরুদ্ধে লোকে মুখ খুলতে ভয় পায়। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও বলেছিলেন, পুরো শিল্পমহল আতঙ্কিত। ভয়ের কারণ ইডি, আয়কর দফতরের হেনস্তা। সে কারণে শিল্পপতিরা বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। লোকসভায় বিরোধীরা এই ভয়ের আবহ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রশ্ন তুলেছেন। এতদসত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার আশ্বাস দিয়ে চলেছে। সংসদে অর্থমন্ত্রী জানালেন, গত সেপ্টেম্বরে কর্পোরেট কর অনেকটাই ছাঁটাই করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর সাফাই চিনের থেকেও কমেছে কর্পোরেট কর। এবার জানালেন, ভারতে কম করের সুবিধা নিতেই ১২টি বহুজাতিক সংস্থা চিন ছেড়ে ভারতে আসতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই সব বহুজাতিক সংস্থা ভারতে বিনিয়োগ করবে কেন? দেশে চাহিদা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা কোথায়? এদিকে সদ্য লোকসভায় পেশ হয়েছে ‘শিল্প মালিক শ্রমিক সম্পর্ক বিধি’। এর ফলে স্থায়ী চাকরির সংখ্যা কমে দাঁড়াবে ঠিকায় নিয়োগের প্রবণতা। এর ফলে স্থায়ী চাকরির সংখ্যা কমবে। বাড়বে স্বল্পমেয়াদে ঠিকায় নিয়োগের প্রবণতা। এর ফলে কাজে বাড়বে আরও অনিশ্চয়তা। পরিণতিতে চাহিদায় ভাটার টান আরও বাড়বে। পরিণতিতে অর্থনীতির আরও অধোগতি। আসলে রোগ নির্ণয়ে ভুল হচ্ছে। তাই প্রেসক্রিপশনেও কাজে আসছে না।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial