আলোর পথে সুন্দরবন

আদৃতা ভট্টাচার্য

শ্বাপদ অরণ্যকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার জোরে কীভাবে উন্নয়নের পরশ দেওয়া যায় তার নিদর্শন সুন্দরবন। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে কুসংস্কার দূর করার কাজ শুরু হয়েছিল এখন থেকে আট বছর আগে। সেই কাজ এখনও চলছে জোরকদমে।

সুন্দরবনের উত্তরন : বাম আমলে বঞ্চনার আর এক নাম ছিল সুন্দরবন। না ছিল বিদ্যুৎ, না ছিল যোগাযোগ। পানীয় জলও ছিল অমিল। শুধুমাত্র নোনা জল আর কুসংস্কার ঘিরে রেখেছিল রাজ্য তথা দেশের অন্যতম বনজসম্পদ নির্ভর সুন্দরবন। আবার অবহেলারও অন্য নাম ছিল সুন্দরবন। অভিযোগ, দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদকে কোনওভাবেই কাজে লাগায়নি বাম সরকার। ফলে সীমান্তবর্তী এই এলাকায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠেছিল। তবে রাজ্যে পালাবদলের পর অপরিসীম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও দক্ষতার মাধ্যমে মা-মাটি-মানুষের নেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুন্দরবনকেই ক্রমশ স্বনির্ভরশীল এলাকা হিসাবে তুলে ধরেছেন। আর এই ক্ষেত্রে যোগ্য ও কুশলী নৈপুণ্য দেখাচ্ছে সুন্দরবন উন্নয়ন দফতর। এই দফতরের পাশাপাশি জলসম্পদ উন্নয়ন দফতরও রীতিমতোকুশলী ভূমিকা নিয়েছে। সরকারি তথ্য পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখলেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে।

সরকারি তথ্য বলছে, ২০১১ সালে বাজেট পরিকল্পনা খাতে সুন্দরবন উন্নয়ন দফতরের জন্য বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২২৬.৮২ কোটি টাকা। ঠিক ছয় বছরের মাথায় বাজেট বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা। আর আট বছরে তা কয়েকগুণ বেড়েছে।

ফসল উৎপাদনে সাফল্য : গত কয়েকবছরে ধান উৎপাদন সহ কৃষিকাজে যেসব আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র যেমন পাম্পসেট প্রাপকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এখন নোনা জলেই ধান উৎপাদন হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, সরকারি পরিকাঠামো ব্যাবহার করে আরও উন্নতভাবে সুন্দরবনের মানুষ ও প্রকৃতির সার্বিক উন্নয়ন করা। এই কাজ সম্ভব হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরলস অনুপ্রেরণায়। দফতরের আধিকারিকদের অভিমত অগ্রাধিকারভিত্তিতে এলাকাগুলিকে চিহ্নিত করে সুন্দরবন এলাকার প্রান্তিক মানুষটির কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য।

২০১১ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত সুন্দরবন উন্নয়ন দফতর যেসব উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে তা এইরকম।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন : পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ১৬৭৬.০২৫ কিলোমিটার ইটের রাস্তা তৈরি হয়েছে। কংক্রিটের রাস্তা তৈরি হয়েছে ২৯০.৫৮২ কিলোমিটার। বিটুমিনাস রাস্তা তৈরি হয়েছে ৩১৫.৮৩২ কিলোমিটার।

সেতু তৈরির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে সুন্দরবন উন্নয়ন দফতর। গত ছয় বছরে আরও ৬টি নতুন সেতু তৈরি হয়েছে সুন্দরবন এলাকায়। এইগুলি হল, সপ্তমুখী ও গঙ্গাধরপুর নদীর উপর সপ্তমুখী সেতু। সুতারবাগ নদীর উপর বাঁশতলায় সুতারবাগ সেতু। পাথরপ্রতিমা ব্লকে সিক্রিহাট খালের উপর সিক্রিহাট সেতু। জয়নগর ২ নম্বর ব্লক এবং কুলটি ব্লককে যুক্ত করে মৃদঙ্গভাঙা নদীর উপর তৈরি হয়েছে মৃদঙ্গসেতু। পাথরপ্রতিমা ব্লকে আদিবাসী বাজারে আয়েত্রগাছি খালের উপর তৈরি হয়েছে সেতু। তথ্য বলছে, গত ছয় বছরে অন্তত ১৩১টি আরসিসি জেটি তৈরি হয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি রায়দিঘি এবং ক্যানিংয়ে দু’টি স্পোর্টস কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে। খেলাধুলার মানোন্নয়নে অন্তত চার লক্ষ ছোট ও প্রান্তিক কৃষককে বীজ, সার, ও যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে চাষবাসের উন্নয়নের জন্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি সরকারের সমস্ত দফতরকে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর এই কাজ সম্ভব হয়েছে জননেত্রী তথা মা-মাটি-মানুষের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরলস অনুপ্রেরণার ফলে।

এখনও পর্যন্ত অন্তত ৩৫ হাজার মৎস্যজীবীকে সাহায্য দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মৎস্যজীবীর সংখ্যাই বেশি। এইসব মৎস্যজীবীদের মধ্যে জাল, মাছের খাবার এবং অন্যান্য জিনিস বণ্টন করা হয়েছে। এরই পাশাপাশি সামাজিক বনসৃজনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অর্জন করেছে। ম্যানগ্রোভ, ঝাউ গাছ বিলি করা হয়েছে। অন্তত ছয় হাজার হেক্টর জমিতে সামাজিক বনসৃজন করা হয়েছে।

সুন্দরবন উন্নয়ন দফতরের পাশাপাশি জলসম্পদ উন্নয়ন দফতরও রাজ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এরমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল ‘জল ধরো, জল ভরো’ প্রকল্প। সরকারি তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে অন্তত ৫০ হাজার জলাশয় বা পুকুর খনন করা হয়েছে। রাজ্য বাজেটের পরিকল্পনা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ১,৯৩৯.৩৬ কোটি টাকা। ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের আওতায় অন্তত ৩,০৯,১৭১ হেক্টর জমিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। গভীর নলকূপ খনন করা হয়েছে ১৫,৪১৮টি। এরমধ্যে ১,২৮০ নদীর থেকে সেচ সেবিত এলাকায়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৬.২৭ লক্ষ হেক্টর জমি সেচ সেবিত করা হয়েছে। আট বছরে সংখ্যাটা আরও বেড়েছে।

রাজ্য সরকারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প জলতীর্থ। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩৬ হাজার হেক্টর জমিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। সরকারি তথ্য বলছে, অন্তত ৪৭১ কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্তত ২০,১১৫ হেক্টর জমি এই প্রকল্পের আওতায় এসেছে। এখনও পর্যন্ত ৪৮৮টি প্রকল্প সম্পূর্ণ করা হয়েছে। সেচসেবিত জমির পরিমাণ প্রায় ১৬,২৪৪ হেক্টর জমি। বাকি প্রকল্পগুলি খুব দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। জলতীর্থ প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সুন্দরবন এলাকা। একইসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলাকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দানের জন্য এগিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাঙ্কের মতো আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনার মতো প্রকল্পগুলির কাজ জোরকদমে। আর এই উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায়।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial