আলোকপুরুষ নানক

রাজ চক্রবর্তী

দুঃখভারাতুর পৃথিবীকে ধর্মের আলোয় সত্যপথ দেখানোর জন্য বারেবারে যেসব ক্ষণজন্মা ব্যাক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে, পুণ্যশ্লোক নানক তাঁদের অন্যতম। আজ থেকে সাড়ে পাঁচশো বছর আগে তাঁর আর্বিভাবে ধন্য হয়েছিল মানবসভ্যতা। আর তাঁর ৭০ বছরের জীবন আজও এক লাইট হাউস।

এখনকার পাকিস্থানের লাহোরের কাছে নানকানা সাহিবে নানকের আবির্ভাব। সে সময় সে গ্রামটির নাম ছিল তালবন্দি। গ্রামেরই হিসেবপত্তর দেখাশোনা অর্থাৎ পাটোয়ারির কাজ করতেন নানকের বাবা মেহতা কালু (ভাল নাম কল্যাণচাঁদ দাস বেদী)। ঘরোয়া মানুষ মাতা তৃপ্তা ছিলেন নানকের জননী। হিন্দু ক্ষত্রিয় বংশে জাত নানক উত্তরকালে পৃথিবীতে শিখধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে স্মরনীয়তা অর্জন করেন।

আজকের বহু বিতর্কিত ধর্মীয় বিবাদের দিনে নানক পৃথিবীকে একেশ্বরবাদের কথা শুনিয়েছিলেন। বহু অলৌকিকতার আখ্যান ছড়িয়ে আছে নানকের জীবন ঘিরে। কিন্তু সেসবের ঊর্ধ্বে মানুষ নানক পৃথিবীর ধ্রুব আলোকবর্তিকা। গুরুগ্রন্থসাহিব গ্রন্থে নানকের ৯৭৪টি শ্লোক গুরুমুখী ভাষায় লিপিবদ্ধ আছে। একেশ্বরবাদী ধারণা ছাড়াও নানকের বার্তার একটি দিক হল বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

তাঁর মতে, যেকোনও মানুষই সরাসরি ঈশ্বরের আশীর্বাদ চাইতে বা আরাধনা করতে পারেন। অর্থাৎ এক্ষেত্রে কোনও মধ্যস্থতাকারী বা পুরোহিত ইত্যাদির ভূমিকা অস্বীকার করেছেন তিনি। গুরু নানক শিখধর্মের যে যাত্রা শুরু করেছিলেন তাঁর উত্তরকালের গুরুরা তাকেই উত্তরোত্তর সমৃদ্ধিদান করে গিয়েছেন। তাঁরা সকলেই মানবজীবনে ভক্তিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই ভক্তিমার্গের কথাই অনেককাল বাদে বাংলায় বসে শুনিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। এ এক সার্থক ও সুন্দর পরম্পরা।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে গুরু নানক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিখধর্ম। আজও সেই শিখরা ভারতের বিপুল জনজাতির ভিড়ে নিজেদের এক গৌরবময় সত্তা হিসাবে তুলে ধরতে সফল হয়েছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে শিখদের অবদানের কথা সকলেরই জানা। স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীতে শিখ রেজিমেন্ট বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীতে শিখ রেজিমেন্ট বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নানক তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে শিষ্য ভাই লেনাকে গুরু অঙ্গদ নামে দায়িত্ব দিয়ে যান। এই উত্তরাধিকত্ব প্রদানের কিছুকাল পরেই নানক পাঞ্জাবের কর্তারপুরে সত্তর বছর বয়সে প্রয়াত হন। তাঁর অন্যতম শিষ্য মর্দানার নামও ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।

নানক তাঁর সারাজীবন বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন। একালের কেউ কেউ বলেন, নানক তিব্বত, দক্ষিণ এশিয়ারসিংহ ভাগ এলাকা এবং আরব ঘুরেছেন। ২৭ বছর বয়সে নানক এই পরিক্রমা শুরু করেন। তার আগে জীবনের অনেকটা সময়ই নানক গভীর ধ্যানে কাটাতেন। বাগদাদে প্রাপ্ত একটি তুর্কি ভাষায় খোদিত শিলালিপিতে জানা যায় যে ‘বাবা নানক ফকির’ সেখানে অবস্থান করেছিলেন ১৫১১-১২ সালে। এই সাল-তারিখ নিয়ে অবশ্য কিছু মতভেদ রয়েছে। তবে মক্কা, জেরুজালেম, ভ্যাটিকান, আজারবাইজান, সুদান প্রভৃতি এলাকায় অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে নানকের উপস্থিতির বিষয়ে কিছু প্রমাণ রয়েছে।

পৃথিবীকে গুরু নানকের উপহার শুধুমাত্র শিখ ধর্মমতই নয়। আসলে এর মধ্য দিয়ে যে বার্তাটি তিনি দিতে চেয়েছিলেন তা হল এই যে, এক ঈশ্বরই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা এবং পালনকর্তা। এটাই শাশ্বত সত্য। ভ্রাতৃত্বের ভালবাসা, সত্যতা ও সমতার ভিত্তির উপর এক আদর্শ আধ্যাত্বিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাকে ত্বরান্বিত করাই ছিল নানকের উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর নিজের পবিত্র জীবনকেই বাজি রেখে গিয়েছিলেন।

কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পৃথিবীতে আবির্ভাব ঘটেছিল আলোকপুরুষ নানকের। সেই পূর্ণিমার আলোই মরজগতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এই মহামানব। আজও তাঁর দেখানো পথের আলো আমাদের আলোকিত করে চলেছে। আগামীতেও এই আলো মলিন হওয়ার নয়।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers