আমরা কি সভ্যতার যুগ থেকে বর্বরতার যুগে ফিরে যাচ্ছি?

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ভারতের ইতিহাসে এক কালো দিন হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই গাড়িবোমা বিস্ফোরণে প্রায় ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এই আক্রমণ সংগঠিত  করেছিল জইশ-ই-মহম্মদ নামক এক সন্ত্রাসবাদী। আদর্শহীন, মানবতাহীন, শুভবুদ্ধহীন কিছু পথভ্রষ্ট মানুষ আজ সারা বিশ্বে ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। উদ্দেশ্য কি শুধুমাত্র মানুষ খুন করে সর্বত্র এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে জনগণকে এক ভীতির আবহাওয়ায় রেখে ধর্মের নামে স্বেচ্ছাচারিতা চালানো। ধর্ম মানুষের আবেগ তা সে যে কোনও ধর্মের মানুষের মধ্যেই বিরাজমান। কিন্তু কোনও ধর্মই মানুষকে খুন, জখম, বিস্ফোরণ ও গণহত্যায় উৎসাহিত করে না। হিন্দুদের বেদ, গীতা, পুরাণ, মুসলমানদের কোরান, খ্রিস্টানদের বাইবেল, বৌদ্ধদের ত্রিপিটক শিখদের গ্রন্থসাহেব-সহ কোন ধর্মে মানুষকে খুন করার কথা শেখায় না বরং সব ধর্মেই মানুষকে দেবতা, আল্লা, গড-এর কাছে নিজেকে সমর্পণ করার কথাই বলা হয়েছে। বিশ্বের প্রখ্যাত ধর্মীয় গুরুরা বলেছেন সাধারণ জীবনের কথা, বিশ্বের সম্পদ ভাগ করে নেওয়া, পরস্পরের সঙ্গে ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের সম্পর্ক। অন্যকে সহ্য করা এবং শান্তিতে বসবাস করা। ধর্মীয় গুরুরা অনেকেই শক্তিকে অর্জন করে নানাভাবে সংস্কারবদ্ধ করে জনগণকে।

কাশ্মীরের সমস্যা জন্মগত। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাশ্মীর ভারতবর্ষ না পাকিস্তান কোন পক্ষে যাবে সেই নিয়ে তীব্র সংকট তৈরি হয়। পাকিস্তানের দাবিদার মহম্মদ আলি জিন্না লাহোর অধিবেশনে দাবি করেছিলেন যে, “হিন্দু ও মুসলমান কথাগুলি কোনও ধর্মের নাম নয়, এগুলি দু’টি ভিন্ন সমাজের নাম। এই দুই পৃথক সমাজ মিলিয়া একটি এক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হবে একথা স্বপ্নের অতীত।” প্রাক্‌-স্বাধীনতা থেকেই হিন্দু-মুসলিম বিরোধের বীজ বপন করেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের স্বপ্ন ছিল ভারত ও পাকিস্তান দুটি দেশই তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে চিরদিন। লর্ড লিনলিথ গাও এবং ক্রিপস-এর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে একথা স্পষ্ট হয় যে তারা দু’জনেই শুধু ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত নয় বহুখণ্ডে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। যাতে অখণ্ড ভারতবর্ষ না হতে পারে তার জন্য ১৯৪৭ সালের ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত ভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। উত্তর পশ্চিম ভারত এবং পূর্ববঙ্গ নিয়ে হল পাকিস্তান এবং পুর্ব পাঞ্জাব ও ভারতের অবশিষ্ট অংশ নিয়ে তৈরি হল ভারতবর্ষ।

মহম্মদ আলি জিনার দ্বিজাতি তত্ব বহু নিরপরাধ মানুষের জীবন, ধন, সম্পত্তি ধ্বংস হল কিন্তু উভয় দেশেই হিন্দু ও মুসলমান তাদের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। ফলে জিন্নার দ্বিজাতি তত্বের মূল যুক্তিই নস্যাৎ হয়েছিল।

কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি এক ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনল। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল বলেছিলেন যে কাশ্মীরের সীমানা ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে রয়েছে। মহারাজা যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তাই গ্রহণ করা হবে। মহারাজা হরি সিং জানান যে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছেন না। অতএব স্থিতাবস্থা থাকুক। পাকিস্তান এই যুক্তি লঙ্ঘন করে এবং পাকিস্তানের আদিবাসীরা কাশ্মীর আক্রমণ
করে। যেহেতু কাশ্মীরের মহারাজার প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না, সেই সুযোগে পাকিস্তান তার সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে

দেয় কাশ্মীর জয় করার জন্য। এই সময় মহারাজা হরি সিং এই আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করেন। একইসঙ্গে ভারত সরকারকে জানান কাশ্মীরের ভারতভুক্তি যেন তারা মেনে নেয়। একই সঙ্গে কাশ্মীরের ভারতভুক্তি দাবি করে। ভারতবর্ষ এই অন্তুভুক্তি প্রসঙ্গে শেখ আবদুল্লা ‘প্রধানমন্ত্রী’ জম্মু ও কাশ্মীর বলেন, “যখন পাক আক্রমণকারীরা দ্রুত শ্রীনগরের দিকে এগোচ্ছে তখন রাজ্যকে বাঁচানোর জন্য এবং ব্যাপক হত্যা থেকে বাঁচানোর জন্য বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সাহায্য প্রয়োজন। শেখ আবদুল্লার প্রতিনিধিরা দ্রুত দিল্লি আসেন এবং সাহায্য চান। ভারত সরকার জানায়, যেহেতু কাশ্মীরের সঙ্গে ভারতের কোনও সাংবিধানিক চুক্তি নেই সেইজন্য তারা সাহায্য দিতে অপারগ। কিন্তু যেহেতু জনপ্রতিনিধিরা এই সাহায্য চাইছেন, তাই ভারতের অন্তর্ভূক্তির চুক্তি করতে হবে যা মহারাজা হরি সিং করেছিলেন।

পাকিস্তান কাশ্মীরের ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে কিন্তু স্বাধীনতার প্রাক্কালে সিদ্ধান্ত হয়েছিল কোনও সরকার অথবা শাসক যদি সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্ভুক্তির তাহলে সেটাই গ্রহণীয় এবং এক্ষেত্রে শাসকদল ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং মহারাজা হরি সিং চুক্তি করেছেন তাই পাকিস্তানের দাবির কোনও যৌক্তিকতা নেই। এরপর ভারতবর্ষের সৈন্যবাহিনী দ্রুত পৌঁছয় কাশ্মীরে উড়োজাহাজে এবং সাঁজোয়া বাহিনীও পৌঁছয়। এই প্রসঙ্গে
শেখ আবদুল্লা বলেছিলেন (১৯৫২ সালের ২৭ জুলাই) “যখন কাশ্মীরের মানুষ দেখল ভারতীয় সৈন্যবাহিনী আসছে তখন কাশ্মীরবাসীর হতাশা ও দুশ্চিন্তা দূর হয়ে তারা আনন্দে মেতে ওঠে যেখানে মুসলমান, হিন্দু ও শিখরা এই আনন্দে অংশগ্রহণ করেছিল। ফিরে আসি ১৪ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় যার শিকড় রয়েছে ১৯৪৭ সালে কাশ্মীরের ভারতভুক্তির সঙ্গে। পাকিস্তান কাশ্মীরের যে অংশ দখল করে আছে সেই অংশ তারা ছেড়ে দেবে যা রাষ্ট্রপুঞ্জের দ্বারা গঠিত কমিশন অন ইন্ডিয়া আ্যান্ড পাকিস্তানে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু আজও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরকে ব্যবহার করে কাশ্মীরে ক্রমাগত আঘাত হানছে। শতশত জওয়ান, সাধারণ নাগরিকের প্রাণ যাচ্ছে। সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস হচ্ছে ফলে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কাশ্মীরের অনেকগুলি জঙ্গি গোষ্ঠী আছে যারা ভারত-বিরোধী তারা মদত পাচ্ছে পাকিস্তানের কাছে। ফলে মৃত্যুর মিছিল চলছেই। বাংলাদেশের এক কবি আসলাম সানি মৌলবাদী জঙ্গিদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, “ওরা পাপিষ্ঠ অধম পাখগুখুনী/ ওরা অভিশপ্ত নরকের কীট ছিলো/ওদের চোখ অন্ধ, মুক বধির, কর্ণযুগল কালা/অনুভূতি-বিবেক-বোধশক্তি-সংবেদনশীলতা/সব লোপ পেয়েছিল।

১৪ ফেব্রুয়ারি এবং তার পরেও দেশের আরও চারজন নিহত হল জঙ্গি দমনে। ১৯৪৭ সালের পর থেকেই

১৪ তারিখে যে বিশাল কনভয়ে প্রায় ২৫০০-র বেশি সৈন্য জম্মু থেকে কাশ্মীর রওনা হলেন তারা নিরাপদ কি না? কোনও জঙ্গি হামলা হবে কি না, সৈন্যরা যাওয়ার আগে কোনও রেইকি হয়েছিল কি না এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ইনটেলিজেন্স থেকে জঙ্গি আক্রমণের সতর্কবার্তী অনেক আগেই জানানো সত্বেও সেনা কর্তৃপক্ষ কোনও সাবধানতা কেন নেয়নি যার পরিণতিতে বিশাল কনভয়ে গাড়ি বোমার ধাক্কায় ৪০ জন সেনার জীবন শেষ হয়ে গেল। প্রশ্ন অনেক আছে, কারণ কাশ্মীর উপদ্রত অঞ্চল এবং প্রায়শই জঙ্গিহানায় প্রাণ দিতে হয় সেনা ও আধাসেনা জওয়ানদের, সেখানে এই বিশাল বাহিনী-সহ কনভয় আক্রান্ত হতেই পারে।

অনেক প্রশ্ন থাকলেও এই মুহূর্তে আমরা সব ধরনের বর্বরতার বিরুদ্ধে এবং সমস্ত ভারতবাসী মাতৃভূমি রক্ষার্থে এক্যবদ্ধ। ভারতের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভারতবাসীর প্রাণ দিতেও প্রস্তত। সমগ্র বিশ্বজুড়েই চলছে অমানবিক জঙ্গিহানা। বর্বরতার হাত থেকে মানব সভ্যতাকে রক্ষা করতেই হবে যে কোনও মুল্যে।

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers