আদিবাসী-দলিত-মুসলিমের বধ্যভূমি এ কোন নূতন ভারত!

পূর্ণেন্দু বসু

আদিবাসী, দলিত এবং মুসলমানদের বধ্যভূমিতে পরিণত হচ্ছে মোদি-শাসিত দেশ। নরেন্দ্র মোদির প্রথম দফার শাসনে যে সব লিঞ্চিং বা পিটিয়ে হত্যার সূত্রপাত, তা ক্রমশই বাড়তে বাড়তে দ্বিতীয় দফায় একেবারে মাত্রাছাড়া রূপ নিয়েছে। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘সবকা বিশ্বাস’-এর স্লোগান। একের পর এক আদিবাসী-দলিত-মুসলমান হত্যার ঘটনায় এই স্লোগান হয়ে উঠেছে এক নিষ্ঠুর তামাশা। সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে দেশজুড়ে চলছে সংখ্যালঘুর নিধনযজ্ঞ। গড়ে তোলা হচ্ছে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের পরিবেশ। এটাই কি নরেন্দ্র মোদির নতুন ভারত? এটাই কি সকলের বিশ্বাস অর্জনের পথ?

উত্তরপ্রদেশে আদিবাসী হত্যা

১৭ জুলাই, ২০১৯। উত্তরপ্রদেশের যোগী-রাজ্যে গুলি চালিয়ে খুন করা হয়েছে ১০ জন আদিবাসীকে। জখম হয়ে অনেকে ভর্তি আছেন হাসপাতালে। কী হয়েছিল সেদিন? মূল বিবাদের কারণ ৩৬ একর জমি। উত্তরপ্রদেশের সোনভদ্র জেলার ঘোরাওয়াল গ্রামে ওইদিন জমির দখল নিতে যায় গ্রামপ্রধান যজ্ঞ দত্ত। তার সঙ্গে ছিল ৩২টি ট্রাক্টরে অন্তত ২০০ জনের সশস্ত্র বাহিনী। সেদিন এই বাহিনী নিয়ে জমি দখল করতে গেলে স্থানীয় আদিবাসী কৃষকরা বাধা দেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা ওই জমি চাষ করছেন। তাঁদের এভাবে উৎখাত করা যাবে না। তখনও ওই বাহিনী আধঘণ্টা ধরে গুলি চালায় ১০ জন মারা যান। যার মধ্যে কয়েকজন মহিলাও আছেন। ওই গুন্ডাদের হাতে মারাত্মকভাবে জখম হন আরও ২৮ জন।

এর বিরুদ্ধে কংগ্রেস দলের প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং পরের দিন ডেরেক ও’ব্রায়েনের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি দল নির্যাতিত পরিবারগুলির সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁদের আটক করা হয়। আদিবাসীদের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা আর কতদিন সহ্য করতে হবে?

উত্তরপ্রদেশে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে জানা যায় যে, উত্তরপ্রদেশ সংখ্যালঘু ও দলিতদের ওপরে নির্যাতনের ঘটনায় সব রাজ্যের থেকে এগিয়ে আছে। রিপোর্ট অনুসারে গোটা দেশে দলিত বা সংখ্যালঘুদের উপর হামলার যত ঘটনা ঘটে, তার ৪৩ শতাংশই ঘটে যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে। এই ঘটনা যে সত্যি তার প্রমাণ পাওয়া যায় কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রী মুখতার আব্বাস নকভি বা আরএসএসের তরফে বিজেপি শীর্ষনেতাদের যে হুশিয়ারি পাঠানো হয়েছে তা থেকেই। উগ্র হিন্দুত্ববাদ যে বিজেপির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে, তা কবে বুঝবেন বিজেপি নেতৃত্ব?

উল্লেখ্য যে, ২০১৬ থেকে ২০১৯-এর জুন মাস পর্যন্ত দেশে ২০০৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তারমধ্যে ৮৬৯টি ঘটনা উত্তরপ্রদেশে। ২০১৯-এ এখন পর্যন্ত ৯৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। গো-বলয়ের পাঁচ রাজ্যেই ৬৪ শতাংশ হামলার ঘটনা। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার হরিয়ানা এবং মধ্যপ্রদেশ-এই পাঁচ রাজ্যেই গোটা দেশের দলিত এবং সংখ্যালঘুদের উপরে হামলার ঘটনার ৬৪টি শতাংশ ঘটেছে।

দলিত নির্যাতনের আর একটি ঘটনার উল্লেখ করব। গত ১১ জুলাইয়ের ঘটনা। উত্তরপ্রদেশের এক বিধায়ক কন্যা একজন দলিত ছেলেকে বিয়ে করায়, নিজের মেয়ে – জামাইকে খুন করার পরিকল্পনা করেন ওই বিধায়ক। ২৩ বছরের ওই তরুণীর নাম সাক্ষী মিশ্র। উত্তরপ্রদেশের বরেলির বিজেপি বিধায়ক রাজেশ মিশ্রর মেয়ে তিনি। সাক্ষীর অভিযোগ, পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি নিজের পছন্দের একজনকে বিয়ে করেছেন। সেই যুবক দলিত। তাঁর নাম অজিতেশ কুমার। পাত্র দলিত হওয়ায় বিয়েটা মেনে নেয়নি সাক্ষীর পরিবার। এরপরই তাঁর বাবা রাজেশ মিশ্র ওরফে পাপ্পু ভারতৌল এবং ভাই ভিকি ভারতৌল স্বামী-সহ তাঁকে খুনের ছক কষছেন বলে মারাত্মক অভিযোগ করেন সাক্ষী। একজন বিধায়ক, যিনি সংবিধানের নামে পক্ষপাতহীনতার শপথ নিয়েছেন, তাঁর এহেন আচরণ থেকে বোঝা যায়, বিজেপি দলে কারা আছেন!

গো-রক্ষার নামে বিহারে খুন ৩ মুসলিম

গোরক্ষকদের তাণ্ডব অব্যাহত। তথাকথিত গোরক্ষকদের পিটুনিতে ফের ঘটল মৃত্যুর ঘটনা। এবার বিহারের সারণ জেলায় গরুচোর সন্দেহে পিটিয়ে মারা হল ৩ জনকে। মৃতদের নাম রাজু নাথ, বিদেশ নাথ ও নওশাদ কুরেশি। মৃত ৩ জনই পয়গম্বরপুর গ্রামের বাসিন্দা। গোরক্ষকদের গণপিটুনিতে ২ জন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। অন্যজন প্রাণ হারান হাসপাতালে চিকিৎসা চলার সময়। পিটুনিতে গুরুতর জখম আরও একজন ছাপড়া হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

মৃতের পরিবার ও আত্মীয়রা পুলিশকে জানিয়েছেন, এরা কেউ চোর নন। এঁরা পিক আপ ভ্যানের চালক। কেবল সন্দেহের বশে তাঁদের পিটিয়ে মারা হল। ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ একটি পিক আপ ট্রাক ও তিনজনের উপর নজর পড়ে স্থানীয়দের। তাদের দাবি, ওই ট্রাকে একটি বাছুর ছিল। তখন তাদের মনে হয় এই বাছুর বুঝি চুরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারা চতুর্দিকে খবর ছড়িয়ে দেয়। লোকজন লাঠি-সোঁটা নিয়ে হাজির হয়ে যায়। ওই তিনজন কিছু বোঝার আগেই তাদের উপর বেধড়ক মারধর শুরু হয়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তাঁরা।

উল্লেখ্য যে, দাদরির আখলাক দিয়ে গোনা শুরু করলে গণপিটুনিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৯৮। অধিকাংশ হামলা হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে। গত সপ্তাহে শিরোনামে ছিল উত্তরপ্রদেশ ও তামিলনাড়ু। এবার বিহার। সারনের এসপি মানতেই চাননি যে এটি পিটিয়ে খুনের ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই সংযোগও।

গোরক্ষার অজুহাতে ভুয়া গুজব ছড়িয়ে সংখ্যালঘু ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের উপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণ কোনও নতুন ঘটনা নয়। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশজুড়ে চলছে এই তান্ডব। স্থানীয় সুত্রে জানা গিয়েছে, দু’দিন ধরে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ক্রমাগত গুজব ছড়াচ্ছিল। বনিয়ারপুর থানার অন্তর্গত পিথোরি নন্দলাল গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে গুজব ছড়ানো হচ্ছিল, গ্রামে গরু চুরি হতে পারে। ফলে গরু চোর সন্দেহে পিটিয়ে মারার পরিস্থিতি তৈরি ছিল।

গোটা দেশেই পিটিয়ে খুনের ঘটনা বেড়ে চলেছে। নরেন্দ্র মোদি বাহিনী একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধেও উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়নি। একইভাবে বিহারে, বিশেষত গ্রামীণ বিহারে গত ছ’মাসে এই ধরনের ২ ডজনেরও বেশি ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ। যার অধিকাংশই ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে।

এদিনের ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ায় তা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহে উত্তরপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুতে মুসলিম যুবকদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ চালায় একদল উগ্র হিন্দুত্ববাদী। বেধড়ক মারধর করে জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর চেষ্টা করে তারা। উন্নাওয়ের তিনজন মাদ্রাসা পড়ুয়া উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের শিকার হন। তামিলনাড়ুতে ‘বিফ স্যুপ’ খাওয়ার ‘অপরাধ’-এ নির্যাতনের মুখে পড়তে হয় আর এক যুবককে। কয়েকদিন আগে ঝাড়খন্ডে হিন্দুত্ববাদীদের অত্যাচারে প্রাণ হারান তাবরেজ আনসারি।

জাতীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান

কর্নাটকের প্রখ্যাত নাট্যপরিচালক এস রঘুনন্দন এবারের জাতীয় সংগীত নাটক আকাদেমির পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা প্রতিবাদ নয়, এই সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন তীব্র হতাশা ও অসহায়তার কারণে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অসহিষ্ণুতার পরিবেশ দেখেই তার এই সিদ্ধান্ত। ধর্মের নাম করে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। এমনকী খাদ্যের ভিত্তিতে হানাহানি ও গণতন্ত্রের সংঘটিত হচ্ছে। এতে তিনি ব্যথিত। তাই পুরস্কার গ্রহণের ইচ্ছা তাঁর নেই।

উল্লেখ্য যে, ইতিপুর্বেও শিল্পী-সাহিত্যিকরা জাতীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে তাঁদের সঙ্গে রঘুনন্দনের বক্তব্যের তফাতটি গুরুত্ব বহন করে। তিনি প্রতিবাদের বদলে অসহায়তার উপর জোর দিয়েছেন।

বিজেপির শাসনে ভারত-রাষ্ট্রের দমন প্রবণতা ক্রমশই প্রবল আকার ধারণ করছে। নতুন করে নিরাপত্তা আইনগুলিকে আরও কঠোর করা হচ্ছে। আইনের রাজনৈতিক অপব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা প্রবলভাবেই থাকে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে, সিবিআই, ইডি অথবা আয়কর বিভাগ-কার্যত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই যেভাবে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে ভয় হতেই পারে। বিশেষ করে একটি দিকের উল্লেখ করতেই হয়। বর্তমানে, এদেশে শাসকের বিরোধিতার সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধিতার মধ্যে ফারাক মিলিয়ে যাচ্ছে। ফলে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার তথা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা রাষ্ট্রের হাতে বলি হচ্ছে অধিকমাত্রায়।

রাষ্ট্রের দমনমূলক আচরণ বাড়তে থাকলে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর রোধ করার প্রবণতা বাড়ে নাগরিক স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে মানুষ তখনই অসহায় বোধ করেন, যখন দমনমূলক আইনের প্রাবল্য লক্ষ করা যায়। বলার বিষয় হল, শাসকের বিরোধিতা মানে রাষ্ট্র বা দেশের বিরোধিতা নয়। এই সত্য আজ ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্রমশই স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠছে। আম্বেদকরের নাম করে চলছে দলিত নিধন।

পিটিয়ে খুন, জীবন্ত জ্বালানো হল দলিতকে

দেশজুড়ে হিংসা এবং অসহিষ্ণুতার এক ভয়ংকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পিটিয়ে হত্যার ঘটনা নিয়মে পরিণত হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশে দুই দলিতের উপর ভয়ংকর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। যোগী রাজ্যের বারাবারিতে এক দলিত যুবককে চোর সন্দেহে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তিনি। অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশের নীমাচ জেলার লাসুডিয়া আত্রি গ্রামে হিরালাল বানচাদা নামে এক বছর ষাটের প্রৌঢ়কে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বিহারেও এক ব্যক্তির গবাদি পশু অন্যের ক্ষেতে ঢুকে ফসল খেয়ে ফেলায় তাঁকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদে এক মুসলিম ব্যক্তিকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর জন্য বেধড়ক মারধর করে হিন্দুত্ববাদীরা। তবে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন ওই ব্যক্তি।

বিজেপি এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলির মদতে দলবদ্ধভাবে কোনও মানুষকে পিটুনির ঘটনা নিয়মে পরিণত করা হয়েছে। আইন, আদালত, বিচারের কোনও প্রশ্ন নেই। লাগাতার এরকম ঘটনা ঘটেই চলেছে। দলিত, আদিবাসী এবং মুসলিমরা সাধারণভাবে এই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের পাশে সঙ্ঘ পরিবারের নেতারা দাঁড়িয়ে যাওয়ায় ন্যায় বিচার পাচ্ছে না পীড়িতদের পরিবারগুলি। ফলে কখনও গোরক্ষার নামে, কখনও রামের নামে, কখনও চুরির অপবাদে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটেই চলেছে। এর অবসান হওয়া দরকার কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি সরকারগুলি এসব ক্ষেত্রে প্রায় নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে। এর অবসান হওয়া দরকার। সরকারের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। জাত-পাত-ধর্মের রাজনীতি ত্যাগ করে দেশে সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে মুখর হতে হবে সবাইকে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial