আত্মবলিদানের ২৫ বছর

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

স্মৃতির সরণি বেয়ে ফিরে যাই ২৫ বছর আগের কমিউনিস্টদের অত্যাচার ও স্বৈরাচারের কলঙ্কিত কালো দিনটিতে। সেদিনও উঠেছি প্রখর রৌদ্র কিন্তু ইতিহাসের পাতায় স্থান হল;অ এক ভয়ংকর কালো দিন হিসাবে। বাংলা তথা ভারতবর্ষ দেখল কমিউনিস্টদের পৈশাচিক উল্লাস আর রক্তের বন্যার বাঝে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানুষের লাশ। সেদিন মনে হয়েছিল “বীরের এ রক্তস্রোত/ মাতার এ অশ্রুধারা/ এর যত মূল্য/ সে কি ধরার ধূলায় হবে হারা/ স্বর্গ কি হবে না কেনা”।

আজ পঁচিশ বছর পরেও মনে পড়ে যায় সেদিনের বামফ্রন্টের পুলিশের অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী বর্বতার কথা। ভারতবর্ষের ইতিহাসে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মম নির্মম হত্যাকান্ডের কথা মানুষ আজও ভোলেনি কিন্তু সে অত্যাচার সংগঠিত হয়েছিল বিদেশী শাসকের দ্বারা। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সুপরিকল্পিতভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করার জন্য গুলি করে তেরো জন যুবকের প্রাণ কেরে ণেওয়াড় ঘটনা বিরল।

সেদিন শহিদ হয়েছিল কেশপুরের আব্দুল খালেক, হুগলির অসীম দাস, কলকাতার দিলীপ দাস, যাদবপুরের কল্যাণ বন্দোপাধ্যায়, কলকাতার মুরারী চক্রবর্তী, কলকাতার প্রদীপ রায়, সোনারপুরের রতন মন্ডল, পূর্ব যাদবপুরের শ্রীকান্ত শর্মা এবং একজন যুবক যাকে শনাক্ত করা যায়নি। লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী রাইটার্সের চারপাশে নির্দিষ্ট স্থানে জমায়েত হয়েছিল মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আহ্বানে। ১৯৯৬৩ সালে বামফ্রন্ট যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল সমগ্র রাজ্যে তাকে উপেক্ষা করে এই বিশাল জমায়েত হতে পারে একথা তৎকালীন কংগ্রেসের কোনও নেতাই ভাবতে পারেনি কিন্তু যাঁরা বাংলা জুড়ে অত্যাচার, খুন, অগ্নিসংযোগ, লুঠ থেকে মানুষ মুক্তি চাইছিল সেটা বুঝতে পেরেছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়, যিনি বাংলার প্রতিবাদী মানুষদের মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন। অত্যাচারিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে।

মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল মমতা নিজের জীবন বাজি রেখেই তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। এই আস্থা ও বিশ্বাসের প্রথম সোপান ছিল শহিদ পরিবার ও আহতদের সাহায্যের জন্য কমিটি গঠিত হয়েছিল। মার্কসবাদী কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার আগে যারা শহিদ হয়েছে তাদের মৃত্যু নিয়ে তারা শুধু রাজনীতিই করেছে কিন্তু তাদের পরিবারের কথা ভাবেনি। নুরুল ইসলামকে নিয়ে গান বেঁধেছে, ছড়া বেঁধেছে কিন্তু তার পরিবার অভুক্তই থেকেছে। মমতা বন্দোপাধ্যায় ২১ জুলাই ১২ জন শহিদই শুধু নয়, পুলিশ ও মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির হার্মাদদের হাতে যাদের মৃত্যু হয়েছে পরবর্তীকালে তাদের পরিবারের একজনের চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে কমিটি অর্থ সংগ্রহ করেছিল শহিদ পরিবারগুলিকে কয়েক লক্ষ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। আজও ২১শে জুলাই সেই পরিবারগুলি মঞ্চে সংবর্ধিত হয়।

২১শে জুলাই-এর সভা প্রথম শুরু হয় এস্প্ল্যানেড ইস্টে। একবার মনুমেন্ট ময়দানে হয়েছে আর একবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে হয়েছে। যেহেতু জুলাই মাসে প্রবল বৃষ্টি হয় সেইজন্য পরবর্তীকালে ইলেকট্রিক সাপ্লাই অফিসের সামনে রাস্তার উপর সভা শুরু হয়। ২১শে জুলাই ১৯৯৩ শুধু ১৩ জন শহিদই হয়নি কয়েকশো যুবক আহত হয়েছিল। মমতা বন্দোপাধ্যায় পুলিশের রাইফেলের আঘাতে প্রায় সংজ্ঞা হারান। সেই অবস্থায় তাঁকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন আরেকটি পুলিশের গাড়ির দরজা সজোরে খুলে মমতা বন্দোপাধ্যায় যে গাড়িতে আহত অবস্থায় রয়েছেন তাকে ধাক্কা মারে। মমতা বন্দোপাধ্যায় জ্ঞান হারান ও তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মমতা বন্দোপাধ্যায় যেহেতু অত্যাচারিত, বঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদের মুখ, সেই জন্য ১৯৯০ সাল থেকেই তাঁকে হত্যা করা, আঘাত করাটা মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির এজেন্ডাতে পরিণত হয়েছিল। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, আল্লা এবং লক্ষ কোটি অত্যাচারিত মানুষের আশীর্বাদ যাঁর উপর আছে তাকে খতম করা সোজা নয় তাই আজও মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অদম্য সাহস, আদর্শে অবিচল। সততা এবং মানুষের প্রতি ভালবাসা তাঁকে দেশের মানুষ কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ব্যার্থতা, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারী মানসিকতার বিরুদ্ধে মুখ্য নেতা হিসাবে চিহ্নিত করেছে।

২০১৮ –র ২১ জুলাই আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে লড়াইয়ের ময়দানে মার্কসবাদীদের অত্যাচারে যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের অতৃপ্ত আত্মা চায় বাংলা দেশের শ্রেষ্ঠ রাজ্যে পরিণত হোক উন্নয়নের নিরিখে। সংখ্যালঘু, তপসিলি জাতি ও উপজাতির মানুষের জীবনে সুখের পরশ আসুক। রাজ্যের সব মানুষের জীবনে পরশ আসুক। রাজ্যের সব মানুষ দু-বেলা খাবার যেন পায়। সকল স্তরের মানুষের পড়াশোনার সুযোগ বৃদ্ধি হোক। রাস্তা, পানীয় জল এবং আবাসন যেন সবাই পায়। চিকিৎসার সুযোগ থকে কেউ যেন বঞ্চিত না হয় এবং দুটো সবল হাতে কাজ পায়। বাংলার সংস্কৃতি যেন বিশ্বের মানুষের কাছে স্বীকৃতি পায়। পঁচিশ বছর পর আমরা বলতে পারি শহিদদের সেই স্বপ্ন পুরণের জন্য বাংলাজুড়ে চলছে মহাযজ্ঞ। এরই মধ্যে জঙ্গল্মহল এবং পাহাড়ে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও হায়েনার দল চুপ করে বসে নেই।তারা পাহাড়ের শান্তির পরিবেশ ধ্বংস করার কাজে নেমে পড়েছিল এবং জঙ্গলমহলে আবার শান্ত মানুষের জীবন অশান্ত করে রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠার চক্রান্ত করে চলেছে।

মমতা বন্দোপাধ্যায়ের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হল চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। যে কোনও মূল্যে বাংলায় শান্তি রক্ষা তিনি করবেনই কারণ শান্তিই প্রগতির প্রথম এবং প্রধান শর্ত। ২১ জুলাই ’৯৩ সাল থেকে ২০১১ সাল। এক দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ সময়ের কিছু ঘটনা যা আজকের যুব ও ছাত্ররা ভাল্ভাবে জানে না। সেটা উল্লেখ না করলে ইতিহাস অসমাপ্ত থেকে যাবে। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন ১২ জানুয়ারি ১৯৬৩ সাল। ওই পবিত্র দিনটিকে বেছে নিয়েছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায় তাঁর জনসংযোগ যাত্রার জন্য। ১৯৯৪ সালে ১২ই জানুয়ারি থেকে ২৩ জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন পর্যন্ত এই কর্মসূচি নির্ধারিত হয়েছিল। আজও মনে পড়ে যায় মেদিনীপুরের বেল্পাহাড়ি থেকে সেই যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমিও সঙ্গী ছিলাম সেই জনসংযোগ যাত্রায়। অর্ধাহারে অনাহারে ক্লিষত মানুষদের মাটির বাড়ির দাওয়ায় বসে পড়লেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। সারা শরীরে লাল পিঁপড়ের কামড়ে ক্ষত, মমতা বন্দোপাধ্যায় জীজ্ঞাসা করলেন তোমাদের এই অবস্থা কেন? সরলভাবে জানাল যে ওরা পিঁপড়ের ডিম পাড়তে যায় আর লাল পিঁপড়ের কামড়ের ফলে সারা শরীরে ক্ষতের চিহ্ন। সেদিনের সেই অভিজ্ঞতা মমতা বন্দোপাধ্যাএর মনে দাগ কেটেছিল, যার বহিঃপ্রকাশ আজও আমরা দেখতে পাই তার কর্ম্পদ্ধতির মধ্যে। যার রাজনৈতিক জীবনের আদর্শ স্বামী বিবেকানন্দ, তিনি যে অবহেলিত, বঞ্চিত ও নিরন্ন মানুষের জন্য জীবনপন লড়াই করবেন এটাই সত্য।

মেদিনীপুর, হুগলি, হাওড়ায় প্রথম দফা শেষ করে দ্বিতীয় দফায় জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, কোচবিহার, মালদা জেলা, দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই–

(১) বালুরঘাটে ছাত্রদের মুক্তির জন্য মমতা বন্দোপাধ্যায় নিজে বিপ্লব মিত্রকে নিয়ে কোর্টে বেলমুক্ত করে ছাত্রদের ছাড়িয়ে দিলেন।

(২) দ্বিতীয় ঘটনার কথা কোনোদিনও ভুলব না। গাড়িতে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফিরছি। অন্ধকার। কোথাও আলো নেই। চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে গাড়ির আলোয় হঠাৎ চোখে পড়ল কিছু মহিলা কোলে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে। আমি মমতাকে বললাম দাঁড়ানো ঠিক হবে না। কিন্তু অকুতোভয় মমতা ড্রাইভারকে দাঁড়াতে বললেন। বিস্মিত হয়ে গেলাম যখন মহিলারা বলল, দিদি আপনি আমাদের বাচ্চাদের মাথায় হাত দিয়ে আশির্বাদ করুন। ওরা জীবনে অনেক বড় হবে। আজ ২৪ বছর পর মনে হচ্ছে চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকরা সেদিনই মমতা বন্দোপাধ্যায়কে চিনতে পেরেছিল কিন্তু অনেকেই পারেননি।

১৯৯৫ সালে গার্ডেন্রিচে আবারও মমতা বন্দোপাধ্যায়কে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। সিপিএম তখন মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে যেভাবে হোক মমতা বন্দোপাধ্যায়কে খতম করার। ঈশ্বর যাঁর সহায় তাঁকে খতম করা কারও সাধ্য নয়। ১৯৯৫ সালে লক আপে হত্যার বিরুদ্ধে ধর্মতলায় ২১ দিনের ধর্না বাংলার সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন সংযোজন। প্রায় সাত লক্ষ মানুষ ১৫ নভেম্বর ’৯৫ কারাবরণ করে, যা দেখে সিপিএম নেতৃত্ব প্রমাদ গুনেছিল। আজ মনে হয় ৯ আগস্ট , ১৯৯৭ আউটডোর না হলে হয়তো আজ আমরা স্বাধীন দেশেই পরাধীন থাকতাম। ১৯৯৭ সালের ২২শে ডিসেম্বর মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বাড়ির উঠোনে প্রেস কনফারেন্স করার পরই তৎকালীন বাংলার কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র একেবারে বহিষ্কার করলেন। আমাকে ও সুদীপকে ছ’বছরের জন্য বহিষ্কার করলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের প্রেস কনফারেন্সে থাকার জন্য।

১লা জানুয়ারি ১৯৯৮, নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসকে দল হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। নতুন উদ্যমে মমতা বন্দোপাধ্যায় লড়াই শুরু করলেন। ২০০১ সালের কেশপুরের সভা থেকে যখন কর্মীরা ফিরছিলেন তখন দলের বহু কর্মী মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির হার্মাদদের আক্রমণে আহত হয়েছিল। তার আগে গৌড় খাড়ার জিভ কেটে নিয়ে সন্মত্রাসের আবহাওয়া তৈরি করেছিল সিপিএম কিন্তু মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সভা বন্ধ করতে পারেনি। ওই দিন আমার গাড়িতে ছিল ফারজানা আলম, যার মাথা ফেটে গিয়েছিল হার্মাদদের ইটে । সারা বাংলায় এক ত্রাসের রাজত্ব শুরু করেছিল মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি। কেশপুর, শিহড়(বাকুড়া জেলা), বৈতাল, আরামবাগ, ক্যানিংসহ সারা রাজ্যেই তখন খুন, জখম বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, ডাকাতি লুঠও চলছে । সারা পশ্চিমবাংলায় মমতা বন্দোপাধ্যায় জীবঙ্কে তুচ্ছ করে ছুটে চলেছেন। আক্রান্তদের পাসে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। ওই সময় বীরভূমের সুঁচপুরে ১১ জন খেত মজুরকে হত্যা করল মার্কসবাদী জহ্লাদরা।

২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আমরা একটি আসন পেয়েছিলাম এবং সেই আসনটি পেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লোকসভায় আসনসংখ্যাকমে গেলেও স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আন্দোলন দমন করতে পারেনি। ২০০৬ সাল সিঙ্গুরে জমিহারাদের আন্দোলন শুরু হল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বিডিও অফিসে চেক বিলির দিন পুলিশ ও সিপিএম গুন্ডাদের হাতে প্রহৃত ও লাঞ্ছিত হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লক আপে মারা গেল, রাজ কুমার ভুলু নামে তরুণ কর্মী। শিল্পের নামে তিন ফসলি জমি টাটাদের গাড়ির কারখানা করার জন্য মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি দিয়ে দিল। মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি বলছি এই কারণেই যে বামফ্রন্টের অন্য শরিকদের ইচ্ছা না থাকলেও তাদের প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না। এরই মধ্যে সমগ্র সিঙ্গুরবাসীর জমি আন্দোলন ধ্বংস করার জন্য পাশবিকতার চূড়ান্ত নজির নজির স্পষ্ট করল সিপিএম। তাপসী মালিক যার বয়স মাত্র ১৪ বছর তাকে ধর্শোণ করে পুড়িয়ে দিল। পশ্চিম বাংলার ইতিহাস আরও একবার কলঙ্কিত করল সিপিএম।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মতলায় অনশন শুরু করলেন ৪ঠা ডিসেম্বর ২০০৬ সাল। টানা ২৬ দিন অনশন করে সারা দেশে এক নজির সৃষ্টি করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অনশন চলাকালীন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং, রাজনাথ সিং, গোপাল কৃষন গান্ধী, মহাশ্বেতা দেবী, মেধা পাটেকর-সহ বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ সহমর্মিতা জানাতে এসেছিলেন। এসেছিলেন বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগুরুরা। রাষ্ট্রপতি অনুরোধ করেন মময়তা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনশন প্রত্যাহার করার জন্য। রাষ্ট্রপতির সম্মান রক্ষা করার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৮ ডিসেম্বর রাত্রে অনশন ভঙ্গ করে হাস্পাতালে ভর্তি হন অসুস্থ অবস্থায়। ২০০৭ সাল আরও একবার বাংলার মায়ের রক্তক্ষরণের বছর। কয়েকদিন আগে একটা সংবাদপত্রে পড়েছিলাম কে বেশি অত্যাচারী, স্বৈরাচারী, পাশবিক এবং অমানবিক, স্ট্যালিন না হিটলার? লেখক প্রমাণ দিয়ে বলেছেন স্ট্যালিনই ইতিহাসের সব থেকে ঘৃণিত ব্যক্তি। বাংলার কমিউনিস্ট্রা সেই স্ট্যালিনপন্থী। নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ায় ৭ জানুয়ারি খুন হল বিশ্বজিৎ, সেলিম আর ভরত।

নন্দীগ্রামে জমি রক্ষার আন্দোলন গতি পেয়েছিল সিঙ্গুরের আন্দোলন থেকে। তিনজন কর্মীর মৃত্যু সেই জন্য আন্দোলনকে দমন করতে পারেনি। ন অন্দীগ্রামে একের পর খুন সন্ত্রাস, লুঠ, অগ্নি সংযোগ যত বেড়েছে আন্দোলনের তীব্রতা ততটাই বেড়েছিল। আমাদের দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা কোনও না কোনওভাবে এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল নন্দীগ্রামে জমি রক্ষার আন্দোলনের সমর্থনে। ৪ ফেব্রুয়ারি ভয়ংকর সন্ত্রাসের সামনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলেজ মাঠে বিশাল জনসভা করে আন্দোলঙ্কারীদের সমর্থন জানালেন। রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুধ্বদেববাবুর আহ্বানে নিহতদের পরিবারের কেউ এলেন না, কারণ তারা খুনি মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে সাহায্য নেবে না। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মানুষের যে মানসিকতা দেশেরভ মানুষ দেখেছিল সেই ত্যাগ ও সাহস দেখল দেশের মানুষ। ১৪ই মার্চ আবার কলঙ্কিত হল বাংলা, রক্ত ঝরল। হার্মাদদের আক্রমণে নিহত হল ১৪ জন। সেই ভয়ংকর রাত্রিতে আমাদের সামনে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে যাত্রা করলেন নন্দীগ্রামের উদ্দেশ্যে। রাস্তায় মমতা বন্দোপাধ্যায়ের গাড়ি আটকে চললো কুৎসিত গালাগালি। গায়ে থুতু ছিটিয়ে দেওয়া হল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সব প্রতিরোধ উপেক্ষা করে নন্দীগ্রামের দিকে এগোলেন পায়ে হেঁটে। দেশ জুড়ে শুরু হল ধিক্কার। মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির হার্মাদরা নেতাইতে নিরীহ গ্রামবাসীদের বিনা কারণে হত্যা করল, যার মধ্যে মহিলাই বেশি।

দীর্ঘ অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনা, অমানবিকতার থেকে মুক্তি চাইছিল মানুষ। নতুন সূর্যদয় হল ২০১১ সালে। মানুষ অন্তরে এবং বাইরে পরিবর্তন চেয়েছিল। এক ভেঙে পড়া অর্থনীতি, অনুন্নয়ন নিয়ে চ্যালেঞ্জও নিলেন রাজ্যকে গড়ে তোলার, সঙ্গে নিয়ে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস। তার পর সাতটা বছর আমরা পেরিয়েছি। মানুষ দেখেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানবিক মুখ আর অমানুষিক পরিশ্রম।

একের পর এক প্রকল্প, নিজে প্রতিটি দফতরের কাজের পর্যালোচনা, প্রসাসনিক বৈঠক আজ বাংলাকে দেশের ১৮ তম স্থান থেকে প্রথম ৪টি রাজ্যের অন্যতম রাজ্যে পরিণত করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বিদ্যুৎ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পরিকাঠামো, পানীয় জল, গরিবদের গৃহ নির্মাণ, পিছিয়ে পড়া ও সংখ্যালঘুদের স্টাইপেন্ড দিয়ে সমাজের মূল স্রোতে যুক্ত করা, কৃষকদের ঋণ ও বিমা, খেলাধুলার উন্নয়ন এবং সর্বোপরি ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাকে দেশের আদর্শ রাজ্যে পরিণত করেছে। ২০১৮র ২১ শে জুলাই ছিল একদিকে শহিদ স্মৃতি তর্পণ অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের চরম ব্যর্থতা ধর্মের ভিত্তিতে সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করার অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান যামমতা বন্দোপাধ্যায়কে দেশের বিরোধী শক্তির প্রধান মুখ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। শহিদদের আত্মত্যাগ আর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই করার প্রেরণা, যা আগামী দিনে দেশকে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, জাত-পাত থেকে মুক্ত করে উন্নত এক দেশ গড়ার কারিগর হিসাবে চিহ্নিত করবে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial