আইন সংশোধনের নামে অধিকার সঙ্কোচন ও গণতন্ত্র নিধন

পূর্ণেন্দু বসু

নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিসরটি ক্রমশই ছোট করে ফেলেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদির সরকার। একটার পর একটা আইন সংশোধনের নামে নাগরিক স্বাধীনতা তথা গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে। আইন সংশোধনী বিলগুলি শুধুমাত্র সংখ্যার জোরে পাস করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বাড়ানো হচ্ছে সরকার তথা শাসকের কর্তৃত্ব। বাড়ছে স্বৈরাচারী প্রবণতা। সরকার দ্রুততার সঙ্গে সেই দিকে এগোচ্ছে। প্রথম মোদি সরকার তথা বিভিন্ন কাজের মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলিকে কেড়ে নেবার চেষ্টা করেছে। নাগরিকের বাকস্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ, মত প্রকাশের অধিকার, সরকার-বিরোধিতার অধিকার, ভিন্নমত জানানোর অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকার। সংসদের অধিকার খর্ব করা, বিচার ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ধর্মাচরণ ও নিজ নিজ সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ– এসবের কোনও কিছুতেই ছাড় দেয়নি শাসকরা। সমাজে সার্বিকভাবে অসহিষ্ণুতাকে মদত জোগানো এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ভেঙে দেওয়ার কাজ করেছে মোদি সরকার।

দ্বিতীয় দফায় মোদি সরকার ওইসব কর্মকাণ্ডকে আইনি ও বিধিসম্মত করে তুলতে একটার পর একটা বিল এনে আইন সংশোধন করছে। তথ্যের অধিকার আইন, মানবাধিকার রক্ষা আইন, এনআইএ আইন, ইউএপিএ আইন–ইত্যাদির সংশোধন করে মানুষের অধিকার হরণ করা এবং মানুষের উপর শাসকের কর্তৃত্ব কায়েম করার লক্ষ্যে কাজ করছে দ্বিতীয় মোদি সরকার। এক কথায় কেন্দ্রের সরকার সর্বত্র বিরোধিতার পরিসর কেড়ে নিতে উদ্যোগী হয়েছে।
|
ইউএপিএ সংশোধনী বিল

২৪ জুলাই, ২০১৯ লোকভায় “আনলফুল অ্যাক্টভিটিস (প্রিভেনশন) আমেন্ডমেন্ড বিল–২০১৯ পাস করানো হয়েছে। বেআইনি কার্ধকলাপ রোধ আইনের এই সংশোধনী বিলের বিষয়ে বিরোধীরা প্রবল আপত্তি জানালেও সংখ্যার জোরে সেই আপত্তি উড়িয়ে দিয়েছে সরকারপক্ষ। বিতর্কে অংশ নিয়ে বিলের বিষয়ে গুরুতর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিরোধী সাংসদরা। বিশদ বিবেচনার জন্য স্থায়ী কমিটিতে বিলটি পাঠানোর জন্য বিরোধীদের দাবি খারিজ করেছে বিজেপি সরকার।

আলোচ্য বিলে সংশোধনী আনা হয়েছে মূল আইনের চতুর্থ তফসিলে বলা হয়েছে কোনও ব্যক্তির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের যোগাযোগ রয়েছে মনে করলে তাকে সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করতে পারবে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। আমরা জানি ২০০৮-এ মুম্বইয়ে সন্ত্রাসবাদী হানার পর বিশেষ আইনের প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই সময় তৈরি হয় এনআইএ আইন। সংসদের চলতি অধিবেশনে এনআইএ-র ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নারী পাচারের মতো বিষয়গুলিকেও এনআইএ তদন্ত করতে পারবে। এবার বলা হচ্ছে, এনআইএ যে-কোনও ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে চিহ্নিত করতে পারবে। ইউএপিএ আইনে এখনও চালু নিয়ম হল, সন্ত্রাসবাদী হিসাবে ঘোষনা করতে হয় কোনও গোষ্ঠীকে। ব্যক্তিকে নয়।

সংসদে বিতর্কের সময়, “শহুরে মাওবাদী” বা “আরবান নক্সাল’ প্রসঙ্গে কড়া হওয়ার কথা ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং বিজেপি  সভাপতি আমিত শাহ। উল্লেখ্য যে, ইউএপিএ আইন নিয়ে অতীতেও অনেক বিতর্ক হয়েছে। বিতর্কের মধ্যে দিয়ে আইনকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ করার চেষ্টা হয়েছে। এমন আইনে মোদি সরকার খুশি নয়। জনগণকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে আরও কঠোর শাসনের ব্যাবস্থা তাদের প্রয়োজন। মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে শাসকের অনুগত করাই এই আইন সংশোধনের লক্ষ্য। সংশোধিত আইন সরকারকে অধিকার দেবে দেশের যে কোনও নাগরিককে গ্রেফতার করার। পর্যাপ্ত অভিযোগ না থাকলেও, অভিযোগের কোনও ভিত্তি না থাকলেও শুধুমাত্র সন্দেহের বশে দেশের যে-কোনও জায়গা থেকে যে-কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যাবে। আসলে বিনা বিচারে কোনও নাগরিককে বন্দি করে রাখার আইনি অধিকার চাইছে মোদি সরকার। যারা সরকার বিরধিতায় মুখর সেই সমালোচকদের জব্দ করার এটা একটা সহজতম পন্থা। যারা সরকার বিরোধী, যারা গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের সমালোচনা বা বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধে কখনও কখনও কড়া ব্যবস্থা নিতে পারছে না। তাদের মুখ বন্ধ করা এবং তাদের কর্মকাণ্ড স্তব্ধ করার জন্যই চালু আইনে নতুন সংযোজন। এবার যে কাউকে সরকার দেশদ্রোহী বা দেশের শক্র সন্ত্রাসবাদী সন্দেহ করে জেলে পুরে দিতে পারবে।

এ কাজে যাতে রাজ্যগত কোনও বাধা না থাকে তার জন্য রাজ্যগুলির অধিকারের উপরও হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের এক্তিয়ারভূক্ত। এতদিন রাজ্যে কোনও ব্যক্তিকে কেন্দ্রীয় সংস্থা গ্রেফতার করতে চাইলে রাজ্যকে জানানো বাধ্যতামূলক ছিল। আইনটি সংশোধন করে সেই বাধা তুলে দেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় কেন্দ্র রাজ্যকে না জানিয়ে যে কোনও লোককে গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে পারবে। ইউএপিএ আইনকে কার্যত আরও দানবীয় করে তোলা হল। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর এটা একটা মারাত্মক আক্রমণ। গণতন্ত্রে বিরোধিতা বা ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিরোধিতা ও ভিন্ন কণ্ঠস্বর হল গণতন্ত্রের প্রাণবায়ু। স্বৈরাচারীরা বিরুদ্ধাচরণ সহ্য করতে পারে না। তারা তাদের মতো জোর করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়।

অমিত শাহ যা বলেছেন, তার মর্মার্থ হল, বিরোধিতার সব কণ্ঠকে “দেশদ্রোহী” বা “সন্ত্রাসবাদী” অথবা “শহুরে মাওবাদী” তকমা দিয়ে গ্রেফতার করা হবে। এই বিলে ব্যক্তির অধিকার ব্যাপকভাবে লাঞ্ছিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতোদিন জাতীয়তা বিরোধী বলে চিহ্নিত কোনও গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ থাকলে তবেই তাকে দেশদ্রোহী বলা হত। এবার থেকে সেটা আমূল পাল্টে গেল। ব্যক্তিকেই এখন থেকে ‘আ্যান্টিন্যাশনাল’ বা “টেররিস্ট’ বলে চিহিত করা যাবে। জাতীয়তাবিরোধী ভাবনাচিন্তার জন্যই এই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে যে কোনও প্রতিবাদী কণ্ঠকেই ‘আন্টিন্যাশানাল বলে জেলে পোরার বন্দোবস্ত করা হল। তাই এই বিল জনবিরোধী, সংবিধান বিরোধী ও যুক্তরাষ্ট্রীয়তা বিরোধী।

তথ্যের অধিকার (সংশোধনী) বিল

তথ্যের অধিকার (সংশোধনী) বিলও একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার সঙ্কোচন এবং রাজ্য সরকারকে অতিক্রম করে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাবৃদ্ধির উপায় হিসাবে বিজেপি সরকারের স্বৈরাচারী হাতিয়ার হয়ে উঠবে। বাস্তবত, তথ্যের অধিকার আইনটি এদেশের নাগরিককে একটা বিরাট ক্ষমতা দিয়েছিল। যে দেশে সরকার নিয়ম করেই কর্তাব্যক্তিরা যেখানে দুর্নীতি ও নিয়মভঙ্গের মধ্য বিরোধীপক্ষ কিংবা সাধারণ নাগরিককে ক্রমাগত বঞ্চিত করে চলেন, সে দেশে নাগরিকের সাধারণ অধিকারটুকু রক্ষার জন্য লড়াই করতে হয়, সেই দেশে তথ্যের অধিকার আইন ২০০৫ সালে নাগরিকের হাতে এক অতি গুরত্বপূর্ণ হাতিয়ার তুলে দিয়েছিল। এই হাতিয়ারের মাধ্যমে একজন সাধারণ নাগরিকও সরকারের কাছে তথ্য জানতে চেয়ে অন্যায়ের প্রতিকার করতে পারতেন। এই সুযোগটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল আরটিআই আইনের সংশোধনী বিলটি পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।

নতুন আইন তৈরি হলে কেন্দ্রের চিফ ইনফর্মেশন অফিসার (সিআইসি) এবং অন্যান্য ইনফর্মেশন কমিশনাররা (আইস) তাদের নিয়োগ ও কাজের শর্তের জন্য আগের মতো আর প্রধানমন্ত্রীসহ তিন সদস্যের কমিটির অধীনে থাকবেন না। তারা সকলে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন হয়ে যাবেন। কত দিন তারা কাজ করতে পারবেন, প্রমোশন পাবেন কি না, এই সবই এখন থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঠিক করবেন। সরকারের কথামতো কাজ না করলে তাদের সরে যেতে হবে।

একইভাবে রাজ্যের ইনফর্মেশন কমিশনাররাও কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চলে গেলেন। এতদিন তাদের নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল মুখ্যমন্ত্রীসহ তিন সদস্যের কমিটির মাধ্যমে । নতুন আইন অনুসারে তথ্যের অধিকার সংক্রান্ত কোনও দায়দায়িত্বই রাজ্যের হাতে থাকবে না। এর ফলে, তথ্যের অধিকার আইনের মাধ্যমে নাগরিকের কাছে সরকারের যে দায়বদ্ধতা ছিল, সেটা সমূলে ধ্বংস করা হল।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, যখন সারা দেশে দাবি উঠছে যে, সরকারের হস্তক্ষেপের বদলে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ হোক একটা স্বাধীন কলেজিয়াম ব্যবস্থায়, যখন বিজেপি নির্বাচনী বন্ড, তথ্য কমিশনারদের নিয়োগে অসম্মতি–ইত্যাদি একের পর এক অভিযোগ উঠছে–তখন তথ্য অধিকার আইনটি পাস করানোর জন্য শাসকের এত তাড়া কীসের? প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আরটিআই করা আশিরও বেশি নাগরিককে ইতিমধ্যে খুন করা হয়েছে। স্বৈরাচারী শাসকদের লক্ষ্য হবে, তাতে আর সন্দেহ কী?

রাষ্ট্র ও সরকারের যথেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে নাগরিককে এতখানি দুর্বল করে দেওয়ার এমন দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। কারসাজি যতই থাকুক না কেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট পেয়ে বিল পাস হয়েছে। দুর্ভাগ্য আমাদের যে, যে প্রক্রিয়ায় পাস হল সেই প্রক্রিয়াটিকে অগণতান্ত্রিক প্রমাণ করাটা তো যথেষ্ট কঠিন হয়ে দাঁড়াল। অথচ আমরা বুঝতে পারছি সংসদীয় ব্যবস্থার সাহায্য নিয়ে কেমন করে সংসদীয় গণতন্ত্রকেই হত্যা করা হচ্ছে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি নাগরিকের অধিকার ও ক্ষমতা সঙ্কোচিত করার বিলগুলি সংসদে পাস হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে সংসদ বহির্ভূত সার্বিক ও সর্বাত্মক লড়াই গড়ে তোলা জরুরি। সেই লড়াই গড়ে তোলার জন্য বিজেপি-বিরোধী সমস্ত শক্তিকে এক সংগ্রামী মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দাবি তুলতে হবে নাগরিকের গণতন্ত্র হত্যাকারী এই বিলগুলি বাতিল করতে হবে।

এই লড়াইয়ে মানুষই ভরসা। তাই সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তিকে মাথা উঁচু করে মানুষের কাছেই যেতে হবে। তা না হলে গোটা দেশটাই জেলখানায় পরিণত হবে। যে কেউ সরকারের বিরোধিতা করলে সরকার তাকে ‘আ্যান্টি ন্যাশনাল’ বলে দেগে দেবে। বিরোধী নেতারা, অধিকার আন্দোলনের লোকেরা, সংখ্যালঘুরা, যারাই সরকারের কথায় সায় দেবেন না, তাদের সকলকেই “দেশদ্রোহী” বলে দেগে দেওয়া হবে। এটা চলতে পারে না। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers