অস্বীকারের প্রতিযোগিতায় দেশের অর্থনীতি চরম সঙ্কটে, ৩৭০ ও এনআরসিতে ভুলিয়ে রাখতে ব্যস্ত মোদি সরকার

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

ডঃ দেবনারায়ণ সরকার

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “সত্য সর্বাংশে ব্যক্তি নিরপেক্ষ, শুভ্র নিরঞ্জন।” ভারতরত্ন সম্মানপ্রাপ্তি উপলক্ষে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় গত ১৯ ডিসেম্বর ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন,“অর্থনীতির ধীরগতি নিয়ে তিনি ততটা চিন্তিত নন। কিন্তু অর্থনীতিকে ঠিকভাবে বিশ্লেষণের জন্য তথ্যের বিশুদ্ধতা বা সত্যতা জরুরি। না হলে পরিণতি ধ্বংসাত্মক হতে পারে।” এই প্রসঙ্গে নিজে অর্থমন্ত্রী থাকার সময়ের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছেন প্রণববাবু। জানিয়েছেন, তাঁর সময়েও সরকারি সমীক্ষার রিপোর্ট তৈরি হত মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টার তত্ত্বাবধানে। কিন্তু সকলেই সেই তথ্য বিশ্বাস করতেন। বর্তমানে এই অবস্থা অত্যন্ত সংকটের মুখে। সরকারি রিপোর্ট-এ ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্যাল অর্গানাইজেশনের রিপোর্ট অথবা মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টার অধীনে রিপোর্ট মোদি সরকারের অপছন্দ হলে হয় সেটা চেপে রাখা হচ্ছে বেশ কিছুকাল অথবা সেই রিপোর্ট বাতিল করা হচ্ছে। লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রকাশিত দেশে ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ বেকারত্বের রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের পরে সেটার সত্যতা সরকার স্বীকার করেছে। কিন্তু সম্প্রতি সরকারি এনএসএসও-র ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে ভোগব্যয় সমীক্ষার রিপোর্টের সত্যতা মোদি সরকার বাতিল করে দিল। কেন বাতিল করল মোদি সরকার? কারণ এই রিপোর্টে ২০১১-১২-এর তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে বিশেষ করে গ্রামের প্রকৃত ভোগব্যয় যথেষ্ট কমার পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছিল যা গত ৪০ বছরেরও বেশি সময়ে এতমাত্রায় কমার ইঙ্গিত ঘটেনি। ২০১১-১২ অর্থবছরে দারিদ্রসীমার নিচে যেখানে বাস করত ভারতের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ, সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এটি কমার পরিবর্তে বরং এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ মোদির সময়ে বেকারত্ব ১০% বেড়েছে। যেহেতু এই রিপোর্ট মোদী সরকারের পছন্দ হয়নি, তাই এই রিপোর্ট বাতিল করা হল। অর্থাৎ মোদি সরকারের নিজের রিপোর্ট পছন্দ না হলে নিজেই এটাকে অস্বীকার করছেন। এর ফলে মোদির সামনে ভারতে তথ্যের বিশ্বস্ততা বা সত্যতা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিল। এর পরিণতি ধ্বংসাত্মক হতে পারে সেই ইঙ্গিতই দিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।

মোদি সরকার শুধু সরকারি প্রকাশিত রিপোর্টই বাতিল করে দেয়নি, যে সব সরকারি রিপোর্ট সরকার ইতিপূর্বে স্বীকার করেছে, তাও আবার অস্বীকার করতে শুরু করেছে। যেমন সরকারি তথ্যই বলেছিল এবং লোকসভা নির্বাচনের পরেই মোদি সরকার স্বীকার করেছিল যে নোট বাতিলের পর ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে ভারতের বেকারত্ব ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ। এছাড়াও বিভিন্ন উপদেষ্টা সংস্থার সমীক্ষাতেও ধরা পড়েছে কর্মসংস্থানের বিবর্ণ ছবি। চাহিদার অভাবে ঝিমিয়ে থাকা অর্থনীতিকেই যার জন্য দায়ী করেছে সংশ্লিষ্ট মহল। অথচ গত ৯ ডিসেম্বর লোকসভার মতো কিছুই ঘটেনি কোথাও” যা শুনে কার্যত অবাক গোটা দেশ। অনেকেরই প্রশ্ন, এই তথ্য কোথা থেকে পেলেন তিনি? তবে কী সরকারি তথ্যকে অস্বীকার করছেন? মোদি সরকারের অন্যান্য মন্ত্রীরা এই অস্বীকারের “নৌকায় পিছিয়ে নেই”। একই দিনে রাজ্যসভায় কেন্দ্রের ভারী শিল্প প্রতিমন্ত্রী অর্জুনরাম মেঘওয়াল দাবি করেন, গাড়ি শিল্পে চাকরি হারানো নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। কোনও চাকরিই সংকটে নেই। অথচ একের পর এক পরিসংখ্যানে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে, দীর্ঘ এক বছর ধরে নাগাড়ে গাড়ি বিক্রি কমেছে। শোরুম বন্ধ করেছে বহু ডিলার। গাড়ি তৈরি কমিয়েছে বেশিরভাগ সংস্থাও। ধাক্কা খেয়েছে যন্ত্রাংশ তৈরির শিল্পও। যার জেরে সব মিলিয়ে প্রায় ৩.৫ লক্ষ চাকরি গিয়েছে। অস্বীকারের পালায় অন্যান্য মন্ত্রীরাও পিছিয়ে নেই। খোদ অর্থমন্ত্রীও পিছিয়ে নেই। কার্যত যেখানে সর্বক্ষেত্রে চাহিদার অভাবে বেসরকারি লগ্নি গত ১৬ বছরের তলানিতে, অর্থনীতির ঝিমুনি নিয়ে শিল্প থেকে অর্থনীতিবিদ প্রায় সবাই যেখানে চরম উদ্বিগ্ন, সেখানে অর্থমন্ত্রী অবিচ্ছিন্নভাবে দাবি করে বলেছেন, অর্থনীতি ঠিকঠাক চলছে। নগদের অভাব কোথাও নেই। বাজারে কেনাকাটা হচ্ছে। প্রত্যন্ত এলাকায় চাহিদা যথেষ্ট। ব্যাঙ্ক গুলি দরাজ হাতে ঋণ বিলি করছে। গাড়ি বিক্রি কমার দায় চাপিয়েছেন নতুন প্রজন্মের পরিবর্তিত পছন্দের উপর। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের খারাপ অবস্থার দায় ঝেড়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও প্রাক্তন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের উপর। অর্থাৎ বাস্তবকে স্বীকার করছেন না মোদির মন্ত্রীরা।

এদিকে অর্থনীতি নিয়ে আশঙ্কা যতই বাড়ছে, জল্পনা ততই ছড়াচ্ছে। তবুও আলোচনায় যেতে নারাজ কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী সীতারামন। গত ১২ ডিসেম্বর খোদ সরকারি পরিসংখ্যান জানিয়েছে নভেম্বরে দেশে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ৫.৫৪%। গত ৩ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবথেকে বেশি খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি ১০ শতাংশের। আনাজের মূল্যবৃদ্ধি ৩৬%। একই দিনে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে আরও জানিয়েছে, অক্টোবরে শিল্পোৎপাদন এত কমেছে যা গত ৮ বছরে সর্বনিম্ন। এদিকে বর্তমান অর্থবছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার মাত্র ৪.৫% যা গত ৬ বছরের সর্বনিম্ন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা হল একদিকে আর্থিক বৃদ্ধি সর্বনিম্ন, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি চড়তে থাকা যাকে কার্যত স্টাগফ্লেশনের জাঁতাকল বলা হয়। অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসন এই অবস্থাকে স্ট্যাগফ্লেশনই বলেছেন। কয়েকদিন আগে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও এই বিষয়ে কেন্দ্রকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রী এ সম্পর্কে কোনও আলোচনায় যেতে নারাজ। আলোচনায় যেতে নারাজ অর্থমন্ত্রী। অস্বীকারের প্রতিযোগিতায় দেশের অর্থনীতি চরম সংকটে। ৩৭০,ক্যাব, এনআরসি রাজনীতির বৃত্তে জনগণকে ভুলিয়ে রাখতে ব্যস্ত মোদি সরকার।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial