‘অসম্ভব’ শব্দটি নেই নেত্রীর অভিধানে

সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

দেশের রাজনীতির অস্থিরতা ক্রমবর্ধমান। অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ আগ্রাসী ভূমিকা নিতে চলেছে। এই অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে দেশবাসী দ্বিধা বোধ করছে। সংহতি, সম্পীতি, ঐক্যের বাতাবরণ ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। নির্বিচারে সাম্প্রদায়িক প্রচার, গোরক্ষার নামে কোথাও কোথাও নৃশংস হত্যা, দলিতদের উপর নির্বিচারে অত্যাচারের কিছু ঘটনা জনমানসে তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণার সৃষ্টি করছে। এর প্রতিফলন কি আগামী ২০১৯-এ ঘটবে?

সারা দেশের পরিস্থিতিতে আজ দেশের লোকসভায় বিজেপির সংশয়হীন গরিষ্ঠতা আগামিদিনে যে থাকবে না, তা নিঃসঙ্কোচেই বলা যায়। প্রশ্ন হল তা কতদূর নামবে?

আমাদের দেশের লোকসভাতে আজকের দিনে বিজেপি ২৭৩, জাতীয় কংগ্রেস ৪৮, এআইডিএমকে ৩৭, তৃণমূল ৩৪, টিডিপি ১৬, শিবসেনা ১৮, বিজেডি ১৯, সিপিএমের ৯ সাংসদ আছেন। তেমনই ১৩ টি দল আছে যাদের সদস্য সংখ্যা ১। পাঁচটি দল আছে যাদের সদস্য সংখ্যা ২। তিনটি দল আছে যাদের সংখ্যা ৩। চারটি দল আছে যাদের সংখ্যা ৪। দেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এমন অদ্ভুতরকমের আসন বিন্যাসের চেহারা বিশ্বের কোনও দেশে দেখতে পাওয়া যাবে না। শতকরা ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে আজ বিজেপির সংসদ সদস্যের সংখ্যা ২৭৩। এই দল গত চার বছরে ৯ লোকসভার আসনে উপনির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। তারা ছিল ২৮২। এই অঙ্কের উপর ভিত্তি করেই আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের সব বিরোধী দল গুলোকেই এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, ২০১৯এর লড়াই যতদূর সংখ্যায় সম্ভব ১:১ হোক। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আসনে এই পদ্ধতি কার্যকর না হতে পারলেও অসুবিধা নেই। অন্তত ৭৫ শতাংশ আসনে হোক এক বনাম এক।

দেশের অধিকাংশ বিরোধী দলগুলোই জানে যে, জাতীয় কংগ্রেস দেশের প্রধান বিরোধী দল। কিন্তু গ্রহনযোগ্য নেতৃত্ব দেওয়ার কোনও ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্বকে দেশের অধিকাংশ বিরোধী দল এখনই মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। সকলেরই কথা আগে নির্বাচন সম্পন্ন হোক, তার পর আসবে পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ। আর এক্ষেত্রেও আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খোলামেলা বক্তব্য, “বর্তমান শাসকদলকে অপসারণ করাটাই প্রথম লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বিরোধী দলের ঐক্য দৃঢ় ভিতের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হোক।’’ আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক নেত্রী যাঁর অভিধানে ‘পারব না’, ‘হবে না’, ‘অসম্ভব’ বলে কোনও কথা নেই। তাঁর ভাবনা-চিন্তা, দূরদর্শিতা, অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়েই দেশের বর্তমান অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত হতে হবে।

এখন একদিকে বিমুদ্রাকরণের ভুল পদক্ষেপে সরকার দিশাহারা। লুঠ হয়ে যাচ্ছে ব্যাঙ্ক গুলো। যে ব্যাঙ্ক ছিল সাধারণ মানুষের অর্থ গচ্ছিত রাখার সর্বাধিক বিশ্বাসযোগ্য স্থান। বিমুদ্রাকরণের পর ১৫.৪৪ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্কে জমা পড়ে গেল। যেখানে দেশে মোট কালো টাকা তখন ধরা হয়ে থাকত ১৬ লক্ষ কোটি টাকা। কালো টাকা উদ্ধার হল একেবারে নামমাত্র সংখ্যায় (রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হিসাবে)। যাদের কালো টাকা ছিল, তারা এই সুযোগে সব টাকা সাদা করে ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রেখে দিল।

দেশে ৯৩টি বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক আছে। ২৭টি পাবলিক সেক্টর ব্যাঙ্ক, যার মধ্যে ১৯টি জাতীয়করণ করা হয়েছে, ৬টি স্টেট ব্যাঙ্ক ও তার সহযোগী, একটি আইডিবিআই, একটি ভারতীয় মহিলা ব্যাঙ্ক। এর থেকেই ৯ লক্ষ কোটি টাকা ‘ব্যাড লোন’ (Bad Loan), যাকে বলা হয় অফেরৎ অর্থ মূল্য (NPA নামে সুপরিচিত)। অর্থাৎ None Performing Assets। মুষ্টিমেয় কিছু ব্যাঙ্ক লুঠেরা বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছে। বহাল তবিয়তে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা, আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষার স্বার্থে গচ্ছিত টাকা এমনভাবে লুঠ হতে দেখা যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবা যায় না।

আর এ কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন বিমুদ্রাকরণ বা Demonitisation-এর আমরা বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু পদক্ষেপ নেওয়া হোক আর একটু ধীরে, আর পরিকল্পনামাফিক। সংসদীয় দলকে নির্দেশ দিলেন ২০১৬-র ডিসম্বরে শীতকালীন অধিবেশন এর প্রতিবাদে স্তব্ধ করে দিতে হবে। নিজের টাকা নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে তূলতে গিয়ে ১৫০ জনের মৃত্যুর জবাব চাইতে হবে। এরই প্রতিবাদ স্তব্ধ লোকসভায় সব বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় তোলা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কাছে দ্বিশতাধিক বিরোধী সংসদের অভিযোগ জানানোর সভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এবং তা দিয়েছিলেন ঐ ঘরে বসেই স্বয়ং সোনিয়া গান্ধী। প্রশংসিত হয়েছিল তৃণমূলের নেত্রীর ঠিক করে দেওয়া বক্তব্য সফলভাবে উপস্থাপিত করার জন্য।

কিন্তু কে বুঝবে? দেশে এখন চলছে হিন্দু-মুসলমান, ভারত-পাকিস্তান, শ্মশান-কবরস্থান। ভারতবর্ষের মূল মন্ত্র বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের সুর হারিয়ে যেতে বসেছে। ‘এক জাতি এক প্রাণ একতা, এই দেশ আমাদের বিধাতা’-এই সুরকে বেসুরো করে দেওয়া হচ্ছে। আর এসব করা হচ্ছে পরিকল্পনামাফিক। এক্ষেত্রে দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসাবে জাতীয় কংগ্রেসকে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। কিন্তু তা হচ্ছে না। সারা দেশের মানুষের কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা এই মুহূর্তে দেশের পরবর্তী কান্ডারী হিসাবে আলোচিত হচ্ছে তা কান পেতে শুনতে হবে। সহিষ্ণুতার সঙ্গে।

ক্ষমতায় যাওয়াটাই এই মুহূর্তের মূল লক্ষ্য নয়। কোনও বিরোধী দলই যেন আস্তিন গুটিয়ে তা নিয়ে আস্ফালন না করে। এই বার্তাই দিতে চাইছেন আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটিয়েছেন যিনি, পাঁচ বছরের সর্বগ্রাসী এক শাসনের অবসানও তিনিই ঘটাতে পারেন। কারণ আগেই বলেছি-‘পারব না’,’হবে না’, ‘অসম্ভব’ বলে কোনও কথা নেত্রীর অভিধানে নেই। ঠিক এই বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করেই নেত্রী ব্রিগেড সমাবেশ ডেকেছেন ২০১৯-এর ১৯ জানুয়ারি। যেখানে তাঁর ডাকে তাঁর নেতৃত্বেই তাঁকেই সমর্থন দিতেই সমবেত হতে চলেছেন দেশের সব বিরোধী দলের নেতৃত্ব। যা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক চেহারা নিতে চলেছে।

নেত্রী বিজয়ীনি হতেই জন্মেছেন। অত্যাচার, নীপিড়ন, শোষণের হাত থেকে দেশের সর্বধর্ম, জাতপাতের উর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষকে নিরাপত্তা দিতে তিনি সক্ষম। আর্থিক সুশৃঙ্খলায় দেশকে উন্নতশীল দেশে রূপায়ণ করার মূল দূরদর্শিতা তার মধ্যে বিদ্যমান। অতীত সংকটের মুখোমুখি হলেও তার থেকে মুক্ত হওয়ার পথ দেখানোর তিনি পথপ্রদর্শক।

সারা দেশে প্রতিধ্বনিত হোক মা-মাটি-মানুষের জয়ের প্রতিধ্বনি।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial