অর্থনীতির বেহাল অবস্থা, হাত গুটিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার, দৃষ্টি অন্যদিকে 

পূর্ণেন্দু বসু

মোদী সরকারের দ্বিতীয় জমানায় ‘নতুন’ ভারতে অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। ক্রমশ আমরা এক ভয়ঙকর বিপর্যয়ের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছি। এর দায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিপর্যয়কর আর্থিক নীতি। অথচ হাত গুটিয়ে বসে আছে সরকার। মোদী জমানার দৃষ্টি অন্যদিকে।

জাতীয় আয়ের অঙ্ক পাঁচ লক্ষ কোটিতে পৌঁছে দেওয়ার ফানুস উড়িয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তার জন্য বছরে অন্তত ৮ শতাংশ আয় বৃদ্ধি চাই। অথচ চলতি বছরে ৬ শতাংশ হারে আয় বৃদ্ধিও ক্রমশ সাধ্যাতীত মনে হচ্ছে। সরকারের পক্ষে বলা হচ্ছে, অর্থনীতির জোয়ার-ভাঁটা চলতেই থাকে। এই কথায় প্রধানমন্ত্রী এবং তার সঙ্গী-সাথীরা বাস্তবে কতটা ভরসা পাচ্ছেন তা বলা শক্ত। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বর্তমান কর্ণধার শশীকান্ত দাস মোদী সরকারের বিশেষ ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। তিনিও কিন্তু চলতি বছরের আনুমানিক আয়বৃদ্ধির হারকে ৬.৯ শতাংশের উপরে রাখতে পারেননি।

অর্থনীতির ছাত্রমাত্রই জানেন, ভবিষ্যৎ আয়বৃদ্ধি নির্ভর করে প্রধানত বর্তমান বিনিয়োগের উপর। বেসরকারি বিনিয়োগ এখনও বৃদ্ধি পাওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। এর অর্থ শিল্পোদ্যোগী ও ব্যবসায়ীরা বাজার উঠবে বলে মনে করতে পারছেন না। তাই তারা উৎপাদন বাড়ানোর বা নতুন বিনিয়োগ করার জন্য উৎসাহী নন। মোটরগাড়ি থেকে গৃহস্থালির সরঞ্জাম–বহু পণ্যেরই বাজারে চাহিদা নেই। কোম্পানির গুদামে মাল জমছে। জমি-বাড়ির বাজারে জোয়ারের ক্ষীণ লক্ষণ দেখা দিয়েও মিলিয়ে যেতে বসেছে। রেলে মালপত্র পরিবহণের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। এমনকী মূল্যবৃদ্ধির হার চার শতাংশে সীমিত বলেও যথেষ্ট নিশ্চিন্ত বোধ করা যাচ্ছে না। কারণ চাহিদায় ভাঁটার টান বেশি হলে বাজারদর অস্বাভাবিক কম থাকে। যে শিল্প পরিচালক বা ব্যবসায়ীরা মোদিজির মহিমায় আপ্লুত ছিলেন, তারাও একের পর এক মুখ খুলছেন। যাঁরা মুখ খোলেননি, তাঁদেরও মনের কথা বোঝা যাচ্ছে। শিল্পের উৎপাদন যে প্রায় স্তব্ধ, বাজারে যে চাহিদা নেই সম্প্রতি কেন্দ্রের পরিসংখ্যান মন্ত্রক প্রকাশিত শিল্পসূচকে সেই তথ্য স্পষ্ট হয়েছে। জুন মাসে শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি কমে মাত্র ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বহু শিল্পের উৎপাদনে কোনও বৃদ্ধি নেই। পাকাপাকি বন্ধ উৎপাদন। শিল্পের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার ফলে কারখানায় কর্মী ছাঁটাই এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কদিন আগেই শিল্পের সংকটে ত্রাণের দাবি জানিয়ে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণের কাছে দরবার করেছেন শিল্পপতিরা। তাঁরা অর্থমন্ত্রীর কাছে শিল্পের মন্দার মোকাবিলায় ১ লক্ষ কোটি টাকা ত্রাণ প্যাকেজের দাবি জানিয়েছেন।

কেন্দ্রের পরিসংখ্যান মন্ত্রক সেন্ট্রাল স্ট্যাটিসটিক্যাল অর্গানাইজেশনের জুন মাসের শিল্প উৎপাদনের হার নিয়ে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে পরিষ্কার বোঝা গিয়েছে চরম মন্দায় বিধ্বস্ত প্রায় সব শিল্প। জুন মাসে দেশে শিল্প উৎপাদন সূচকের বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ২ শতাংশ। গতবছর জুন মাসে এই হার ছিল ৭ শতাংশ। পরিসংখ্যান সংস্থা জানাচ্ছে, উৎপাদন হার প্রতি মাসে কমছে। বৃদ্ধির কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গত মার্চে এই বৃদ্ধির হার ছিল ২.৭ শতাংশ। মে মাসে তা ৩.১ শতাংশ। জুনে তা কমে ২ শতাংশ। তথ্যে দেখা যাচ্ছে, শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন কমেছে ম্যানুফ্যাকচারিং ও খনিশিল্প । সবথেকে বেশি কর্মসংস্থান হয়ে থাকে এই দুই শিল্প ক্ষেত্রে। ফলে এতে কাজ হারিয়েছেন বেশি শ্রমিক। জুনে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির হার হল মাত্র ১.২ শতাংশ। যা গতবছরে এই সময়ে ছিল ৬.৯ শতাংশ। একই অবস্থা খনিশিল্পে। বর্তমানে এই শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির হার দাড়িয়েছে ১.৬ শতাংশ। যা গতবছর ছিল ৬.৫ শতাংশ। শিল্পে বৃদ্ধি শ্লথ হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সেভাবে বাড়েনি। বরং সামান্য হলেও কমেছে। উৎপাদন বৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ায় মূলধনী পণ্য, পরিকাঠামো নির্মাণ, ভোগ্যপণ্য উৎপাদন বিপুল হারে কমেছে। দেশের অর্থনীতিতে তীব্র মন্দার পরিবেশ। কেন্দ্রীয় সরকার নীতি পঙ্গুত্ব নিয়ে চলছে। সম্প্রতি রাজ্যের অর্থমন্ত্রী এই ভাষাতেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কেন্দ্রের মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছেন। এরই বিপরীতে এই গভীর মন্দার পরিবেশের মধ্যেই এ রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থার ছবিটা যথেষ্টই উজ্জ্বল। কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্টেই একথা জানানো হয়েছে বলে জানান রাজ্যের অর্থমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা গভীর মন্দার মধ্যে। ৪৫ বছরে বেকারত্বের হার শীর্ষে। জিডিপির হার সবচেয়ে কম। কেন্দ্রীয় সরকার সম্পূর্ণ পঙ্গু। সরকারের নেতৃত্ব নেই, দিশা নেই। বাস্তব চিত্র থেকে মানুষের নজর ঘুরিয়ে রাখতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। হেনস্তার কারণে বহু শিল্পপতি দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছেন। দেশে কোনও নতুন শিল্প আসছে না। অথচ কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৫০টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণ হচ্ছে এমনকী লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকেও বিক্রি করে দিতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। এর ফলে মানুষ কাজ হারাচ্ছেন। মানুষের জীবন বিপন্ন। অথচ তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও হেলদোল নেই।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, দেশের এই চরম অর্থনৈতিক মন্দার পরিবেশের মধ্যেও রাজ্যের জিডিপি হার অন্য রাজ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা রূপায়ণ মন্ত্রকের রিপোর্টে এই তথ্য উঠে এসেছে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও বাকি রাজ্যগুলির থেকে এগিয়ে রয়েছে বাংলা। ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের জিডিপি বাড়ার হার ১২.৫৮ শতাংশ। কেন্দ্রের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এই রাজ্য। রাজ্যের পরিকল্পনা খাতে ও মূলধনী খাতে খরচের পরিমাণ কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। স্পষ্ট নীতি ও দিশার কারণে এগিয়ে চলেছে বাংলা। কেন্দ্রীয় সরকার এটা স্বীকার করে নিয়েছে। অর্থনীতির এই বেহাল অবস্থায় দেশে অটোমোবাইল শিল্পের অবস্থা খুবই উদ্বেগজনক। জিডিপির মধ্যে ৮ শতাংশ এই অটোমোবাইল শিল্প থেকে আসে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পে তিন কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়। বর্তমানে সবকটি অটোমোবাইল সংস্থার গাড়ি বিক্রির হার হু হু করে কমে যাচ্ছে। যার ফলে বহু মানুষ কাজ হারাচ্ছেন। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনুসারি শিল্পগুলিরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিসংখ্যানে অর্থনীতি

২০১৮-১৯ অর্থবর্ষের চতুর্থ ত্রেমাসিকে বৃদ্ধির হার নেমে গিয়েছে ৫.৮ শতাংশে । পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিন্ন।

এনএসএসও-র রিপোর্টে বেকারত্বের হার ৬.১%। গত সাড়ে চার দশকে যা সর্বোচ্চ। রফতানি বাড়ন্ত। চাহিদায় টান দেশের বাজারেও। চাহিদা এতটাই তলানিতে যে, উৎপাদন কমাচ্ছে বিভিন্ন গাড়ি সংস্থা। খবর পাওয়া যাচ্ছে বিপুল কর্মী ছাঁটাইয়েরও।

  লগ্নি কমছে

আজ ২০১৯-২০ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে নতুন প্রকল্পে লগ্নির অঙ্ক ১৫ বছরে সর্বনিন্ন।আজ গত জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ঘোষিত প্রকল্পের তুলনায় এপ্রিল-জুনে নতুন প্রকল্পের ঘোষণা কমেছে ৮১%। ২০১৮ সালের এপ্রিল-জুনের সাপেক্ষে ৮৭% কম।

১৩ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রকল্পের বাস্তবায়ন আটকে । ১৯৯৫ সালের পরে যা সর্বোচ্চ।

২০১৭-১৮ সালের তুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে বিদেশি বিনিয়োগের অঙ্ক কমেছে ১.০৯%।

বৃদ্ধির হার : সারাদেশে রাজ্য কিন্তু ১নম্বরে। রাজ্য বৃদ্ধির হার (শতাংশে)

পশ্চিমবঙ্গ ১২.৫৮

অন্ধ্র প্রদেশ ১১.০২

বিহার ১০.৫৩

তেলেঙ্গানা ৯.৫০

কর্নাটক ৯.৫৩

পুদুচেরি ৮.৬৮

দিল্লি ৮.৬১

ওড়িশা ৮.২৬

হরিয়ানা ৮.১৯

তামিলনাড়ু ৮.১৭

হিমাচলপ্রদেশ ৭.৩৪

রাজ স্থান ৭.৩৩

সিকিম ৭.০৫

মধ্যপ্রদেশ ৭.০৪

ঝাড়খণ্ড ৬.৯৯

উত্তরাখণ্ড ৬.৮৭

উত্তরপ্রদেশ ৬.৪৬

ছত্তিশগড় ৬.০৮

উপরের কেন্দ্রীয় তথ্য বলে দিচ্ছে, বৃদ্ধির হারের নিরিখে দেশে পয়লা নম্বরে অবস্থান করছে পশ্চিমবঙ্গ। এর অর্থ কেন্দ্রের মতো এরাজ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নীতিপঙ্গুত্ব নেই।

এরপর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি বেচে দেওয়ার যে সর্বনাশা পথ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার তা আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিপর্যস্ত হবে জনজীবন, বিঘ্নিত হবে কর্মী-নিরাপত্তা। মনে রাখতে হবে ব্যক্তির ইচ্ছায় অর্থনীতি চলে না। অর্থনীতির নিজস্ব নিয়ম আছে। সেই নিয়মে আঘাত দিলে তার ফল ভুগতে হবে দেশ ও মানুষকে ।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial