অর্থনীতির ঝিমুনি ক্রমশ বাড়ায় জিএসটি আদায় কমেছেঃ দিশাহারা কেন্দ্র

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

ডঃ দেবনারায়ণ সরকার

ভারতের অর্থনীতি কখনও যে বিপদের সম্মুখীন হয়নি, আগামী বাজেট করতে গিলে দেশের অর্থমন্ত্রী দাঁড়িয়ে তার সামনে। যার নাম স্টাগশ্লেসনের ছায়া। একদিকে আর্থিক বৃদ্ধি সর্বনিম্ন শিল্পোপৎপাদন বৃদ্ধি ৮ বছরের তলানিতে, পরিকাঠামো শিল্পে বৃদ্ধি ১৪ বছরের তলানিতে। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ১৬ বছরে তলানিতে, বেকারত্ব বৃদ্ধি ৪৫ বছরের তলানিতে। অন্যদিকে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ক্রমাগত বেড়ে প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি। দেশের অর্থনীতির এই চরম ঝিমুনি রাজকোষেও মারাত্মকভাবে পড়েছে। একদিকে প্রত্যক্ষ আয়ে ১.৪৫ লক্ষ কোটি টাকা কর্পোরেটদের ছাড় দেওয়ায় বর্তমান বছরে প্রত্যক্ষ আয় অন্তত দেড় লক্ষ কোটি টাকা কমতে চলেছে।অন্যদিকে দেশে জিএসটি আদায়ও অর্থনীতির ঝিমুনির ফলে বাজারে কেনাকাটা কমে যাওয়ায় যথেষ্ট কমতে চলেছে বর্তমান বছরে। এক্ষেত্রেও দিশাহারা অবস্থা কেন্দ্রের। বর্তমান অর্থ বছরে (২০১৯-২০) জিএসটি আদায় ধরা হয়েছে ১৩.৭১ লক্ষ কোটি টাকা। প্রতি মাসে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১,১৪,২৫০ কোটি টাকা। গত ৮ মাসের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, দেশের জিএসটি আদায় হয়েছে ৮,০৫,১৬৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে আদায় হয়েছে ১,০০,৬৪৫ কোটি টাকা।

গত ৮ মাসের জন্য আদায়ের নতুন লক্ষ্যমাত্রা রেখেছে প্রতি মাসে গড়ে ১.১০ লক্ষ কোটি টাকা। যদিও বাকি চার মাসে এই অর্থ আদায় কার্যত দুরূহ, তবুও এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও বর্তমান বছরের শেষে দেশের জিএসটি আদায় বাজেটের পূর্ণাঙ্গ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অন্তত ১ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা কম হতে বাধ্য।

এটা ঘটনা যে জিএসটি আদায় কম হওয়ায় গত আগস্ট মাস থেকে রাজগুলির ক্ষতিপূরণের অর্থ কেন্দ্র বাকি রেখেছিল। এ জন্য বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলির অর্থমন্ত্রীরা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর জিএসটি পরিষদের বৈঠকের আগেই কেন্দ্র রাজ্যগুলির আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য ৩৫,২৯৮ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছে। কিন্তু আগামীতে কীভাবে জিএসটির ক্ষতিপূরণ কেন্দ্র রাজ্যগুলিকে দেবে তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কিত কেন্দ্র। শর্তানুযায়ী জিএসটি চালুর প্রথম ৫ বছর পর্যন্ত প্রতি বছর ১৪% জিএসটি বৃদ্ধি ধরে নিয়েই রাজ্যগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেবে কেন্দ্র কিন্তু জিএসটি থেকে আর কম হওয়ায় কেন্দ্র আরও কিছু নতুন পণ্যের উপর জিএসটি চাপাতে চায় এবং বেশ কিছু পণ্যে জিএসটির হারও বাড়াতে চায়।

কেন্দ্র চায় চাল-গমের মতো খাদ্যশস্য, মাছ, মাংস, ফল, শাক-সবজির মতো পণ্যের উপর নতুন করে জিএসটি চাপাতে। তাছাড়াও ডাল, আটা, তেল, চা, কফি, পাউরুটি, কয়লা, কেরোসিন, জীবনদায়ী ওষুধ ইত্যাদির উপর বর্তমান ৫ শতাংশ জিএসটির হার বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করতে চায় কেন্দ্র। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্যান্যদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনন্ত্রী অমিত মিত্র কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে চিঠি লিখে এ বিষয়ে আপত্তিতুলেছেন। তাঁর যুক্তি, গরিব ও প্রান্তিক মানুষের কথা ভেবেই চাল-গমের মতো খাদ্যশস্য, মাছ, মাংস ইত্যাদি অত্যাবশ্যক পণ্যে জিএসটি চাপানো হয়নি। এসব থেকে আয়ের সুযোগও খুব কম। এমনকী, যে দ্রব্যগুলিকে জিএসটির হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শঅংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, সেক্ষেত্রেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন অমিতবাবু। এক্ষেত্রেও জিএসটির হার বাড়ালে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের গরিব ও প্রান্তিক মানুষগুলো। তাহলে জিএসটি আদায় বাড়বে কীভাবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, করফাঁকি রোধ করা গেলে এবং তথ্যপ্রযুক্তির গলদ দূর করা গেলে জিএসটি থেকে আদায় যথেষ্ট বাড়ানো সম্ভব, তবে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছনো, সম্ভব কিনা সেক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। গত ৩০ জুলাই ক্যাগ রিপোর্টে জিএসটির গলদ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার গলদের ক্ষেত্রেও কাঁচামালে মেটানো করের টাকা (ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট) ফেরত চাওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি হয়ে চলেছে বলে চিহ্নিত করল তারা। ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের ক্ষেত্রে এই জালিয়াতির পরিমাণ বিপুল। একাংশ কর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই জালিয়াতির পরিমাণ এক থেকে দেড় লক্ষ কোটি টাকা। এছাড়াও ইনভয়েস ম্যাচিং প্রক্রিয়ারও গলদ তুলে ধরেছে সিএজি। ক্যাগের মতে, যে তথ্য প্রযুক্তির মেরুদণ্ডের উপর পুরো জিএসটি আদায় ও রিটার্ন প্রক্রিয়া দাঁড়িয়ে (জিএসটিএস), তার সমস্ত ক্রটি দ্রুত মেরামত জরুরি। মোদ্দা কথা, ক্রটিপূর্ণ জিএসটি যে আদায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধক তা কেন্দ্রীয় জিএসটি কর্তারা এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

কেন্দ্রীয় জিএসটি কর্তাদের দাবি, ভুয়া রিটার্ন ও রসিদ দেখিয়ে সরকারের থেকে টাকা আদায়ের বড় চক্র তৈরি হয়েছে। এখন ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীর মাসিক পণ্য পরিষেবা যাচাই করে আইটিসি দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হল, এতে কি জিএসটি আদায় লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছনো সম্ভব? কার্যত অর্থনীতির ঝিমুনি না কাটলে কখনও এটা সম্ভব নয়। বাজারে চাহিদা না বাড়লে, বাজারে কেনাকাটা বাড়বে না। আর কেনাকাটা না বাড়লে, জিএসটি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছনো অসম্ভব। এই সঙ্গে সত্যটাকে কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করে দাওয়াই দিতে হবে। অন্যথায় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial