অক্ষয় হোক দেশের ঐক্য ও সম্প্রীতি

রাজ চক্রবর্তী

ফিরে এল আগস্ট মাস। ফিরে এল স্বাধীনতা দিবস। আর এরই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি উৎসব রাখিবন্ধন। এবারের স্বাধীনতা দিবস যদিও প্রকৃতিগতভাবে একটু অন্যরকম। কেননা ঘোর বর্ষার এই দিনটি এবছর কেমন যেন অচেনা। ভারতের অন্যত্র কিছুটা বৃষ্টি, কোথাও বানভাসি অবস্থা হলেও বঙ্গে, বিশেষত দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি খুবই কম। তবে আরেকটি দিক দিয়ে এবারের স্বাধীনতা দিবসের একটা অন্য তাৎপর্য আছে। কেননা, এবারই হয়তো প্রথম, স্বাধীনতা দিবস ও রাখিবন্ধন উৎসব একই দিনে। ইতিহাসে যদিও প্রথম রাখিবন্ধন উৎসব পালিত হয়েছিল স্বাধীনতা লাভের অনেক আগেই।

আজ দেশের ৭৩তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাককালে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাল লাগে প্রথম স্বাধীনতা দিবসটি । সেদিনের যাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামী বা স্বাধীনতা লাভের সেই শুভ দিনটির সাক্ষী থাকতে পেরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে খুব কম মানুষই আজ বেঁচে আছেন। আমরা, বর্তমান দেশবাসীর সিংহভাগই জন্মেছি স্বাধীনতা লাভের পর স্বাধীন ভারতে । ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দিনটিতে দেশের মানুষের আবেগ-আনন্দ বা উন্মাদনার কথা আমরা শুধুই পড়েছি বা শুনেছি। কিন্তু যতবার এই বিশেষ দিনটি ফেরত আসে বুকের ভিতরে কেমন একটা অজানা দোলা লাগে। হয়তো একেই বলে দেশপ্রেম। যাঁরা ব্রিটিশ ভারত দেখেছেন তারা হয়তো স্বাধীনতার প্রাক এবং উত্তরকালের তুলনা করতে পারেন, কিন্তু আমাদের পক্ষে তা করা কঠিন। ভারতের স্বাধীনতা লাভের ঘটনা যেমন ইতিহাসে ঢুকে গিয়েছে তেমনই এই ঘটনা প্রেজেন্ট পারফেক্ট টেন্সের মতো অতীতের হয়েও বর্তমানের উপর এবং/এমনকি অনাগত ভবিষ্যতের উপরেও একটা অনিবার্য রেশ রেখে যাবে।

তবু সময়ের সঙ্গে আজ হয়তো সেদিনের চেয়ে স্বাধীনতা, দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবোধের বিষয়টা একটু হলেও ফিকে হয়ে এসেছে। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে সকল দেশবাসী সেদিন যে ভাবনার শরিক ছিল আজ তার প্রয়োজনই নেই। স্বাধীনতার জন্য একটা বিশেষ আকুতি জেগে উঠেছিল ভারতীয়, বিশেষত বাঙালিদের মনে। হাজার হাজার বাঙালি স্বার্থ ভুলে প্রাণ দিতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। কেউ স্কুল ছেড়েছেন, কেউবা চাকরি। স্বদেশী মন্ত্র সেদিন যেন একটা মিরাকেল সৃষ্টি করে ছেড়েছিল। লেখকরা লিখছেন, গায়করা গাইছেন, বক্তা বক্তৃতা দিচ্ছেন–কিন্তু সবারই প্রেরণা ছিল দেশাত্মবোধ। কত যে পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল তখন শুধু জাতীয়তাবোধের প্রচারের উদ্দেশ্যে।

আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমাদের দেশ চন্দ্রযান পাঠাচ্ছে। নানা দিকে দেশের ছেলেরা দেশের গৌরব বৃদ্ধি করছেন। কিন্তু কই, দারিদ্রের অভিশাপ তো ঘুচল না। সত্তরোর্ধ্ব স্বাধীনতা দিবসেও দেশে দারিদ্র আর ক্ষুধার জ্বালা যে কতখানি রয়ে গিয়েছে তা তো খুবই স্পষ্ট হয় যখন লাখো মানুষের কী বিপুল উন্মাদনা! দু’মুঠো অন্নের পেয়ে রাজ্যের অগুন্তি মানুষ যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। স্বাধীনতার গৌরব পেয়েও উপযুক্ত ও বাস্তবসম্মত সরকারি পরিকল্পনার অভাবই দেশটাকে আলোকিত হতে দিল না। এইসব অন্ধকার জায়গাগুলোয় আলো ফেলার জন্যই হয়তো স্বদেশমন্ত্র আজও প্রাসঙ্গিক। আর তাই জাতীয়তাবোধের প্রেরণা প্রয়োজন। স্বাধীনতা দিবস আজও আমাদের সেই প্রেরণাস্থল। তাই আজকের স্বাধীনতা দিবস পালনের উদ্দেশ্য শুধুই অতীতের স্বাধীনতালাভের ঘটনার স্মৃতিচারণা নয়, সেইসঙ্গে আগামীতে এই স্বাধীন দেশকে আরও স্বপ্নময়, গর্বময়, প্রাণময় করে তোলার অঙ্গীকারের দিন। এই স্বাধীন দেশের যাত্রাপথ যেন রুদ্ধ না হয়। ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল ঐক্য ও সম্প্রীতির হাত ধরে। রাখিবন্ধন উৎসবের মাধ্যমে সেই দিকটিকে উজ্জ্বলতর করে তুলতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দূরদর্শী কবির স্বপ্ন সফল হয়েছিল। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতালাভের পর আজও ঐক্য ও সম্প্রীতির চেতনা জাগরণের জন্য রাখিবন্ধন উৎসবকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আজও দেশে সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ বর্তমান। অনৈক্যের বাতাবরণ বারবার প্রকট হচ্ছে। তাই রাখিবন্ধনের মাধ্যমে ঐক্যের চেতনা গড়ে তোলার চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের আর সেইসঙ্গে নিজের লেখা গান গেয়েছিলেন- “বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল/পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান।” যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-নির্ধন, হিন্দু-মুসলমান , কৃষক-মজুর নির্বিশেষে সকলেই সেদিন কবির সঙ্গে গলা মিলিয়েছিলেন। আজও সকলকে এক সুরে গলা মেলাতে হবে। সকলকে পরস্পরের হাতে রাখি পরিয়ে সংহতির এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। সেদিন বাঙালির এই কড়া দাওয়াইয়ের সামনে মাথা নত করে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল ইংরেজ। আজও সেই বাংলা ও বাঙালিকে আর একবার দায়িত্ব নিতে হবে দেশের সামনে ঐক্যের নজির স্থাপন করার। আজও বাংলাকেই নিতে হবে। তাই স্বাধীনতা দিবস ও রাখিবন্ধন উৎসবের দিন বাংলা মেতে উঠবে ঐক্য ও সম্প্রীতির জয়গানে ।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers